বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স
বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স

বিচার বিভাগের ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশ: দলীয় দুর্বৃত্তায়নকে ‘মূল শত্রু’ বলছে বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিচার বিভাগের ওপর একটি বিস্তৃত শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স। গত ২১ মার্চ রাত ১১টায় সংগঠনটি এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। ২০২৫ সালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে প্রেক্ষাপট হিসেবে ধরে মোট ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর এতে আলোকপাত করা হয়েছে।

শ্বেতপত্রে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগকে একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে, এই পদটি কি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য পুরস্কার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের নিরপেক্ষতা যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা জাতির জন্য মারাত্মক সংকট ডেকে আনতে পারে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৬-এর প্রয়োগ নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে শ্বেতপত্রে। এ ধরনের প্রয়োগকে শহীদদের রক্তের সাথে ‘মশকরা’ বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি। প্রধান বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাপ ছাড়াই বিচারকরা দলীয় রাজনীতির প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, বিচারকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ বিচার বিভাগের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গত বছরে আইনজীবীদের দ্বারা বিচারকদের প্রতি একাধিক অসৌজন্যমূলক ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

বিচার বিভাগের দুর্নীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে প্রতিবেদনে। এতে কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রকেও দায়ী করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে বিচারকদের অপসারণ করা হলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন : জনপ্রত্যাশা ও ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এছাড়া, বার কাউন্সিল ও বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে পরিচালনাকে আইনজীবীদের জন্য অসম্মানজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রয়োজনে আইন পরিবর্তনের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে শ্বেতপত্রে।

প্রতিবেদনে ‘বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার, ১৯৭২’-এর বিভিন্ন অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কোনো কারণ ছাড়াই একজন আইন কর্মকর্তার চাকরি কেন বাতিল করা যাবে। একই সঙ্গে বাছবিচারহীন জামিন প্রদান ও ‘জামিন বাণিজ্য’-এর মতো বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ক্রমাগত মামলা বৃদ্ধিকেও একটি অশনি সংকেত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্বেতপত্রে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ এবং অদৃশ্য শক্তির প্রভাবের কথাও বলা হয়েছে। দলীয় রাজনীতির বিষাক্ত প্রভাব আইনজীবীদের মধ্যকার সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক-এর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগ ধ্বংসে তার দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে কারাদণ্ডাদেশ দেবার বরাত দিয়ে ভিত্তিহীন মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে শ্বেতপত্রে।

একটি ঘটনায় প্রধান বিচারপতির দ্বারা জামিন সংক্রান্ত নথি তলবের উদাহরণ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়সংগত ও যৌক্তিকতার ঘাটতির কথাও বলা হয়েছে।

সবশেষে, দলীয় দুর্বৃত্তায়নকে বিচার বিভাগের জন্য ‘মূল শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স। সংগঠনটির মতে, দলীয় অপরাজনীতির প্রভাব দেশের বিচারব্যবস্থার অর্জনগুলোকে গ্রাস করছে।

এই শ্বেতপত্রের খসড়া প্রণয়ন করেন মহিউদ্দিন সরকার অভি, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, জীবন ইবনে হাবিব এবং রুহান রাব্বি। পর্যালোচনায় ছিলেন অ্যাডভোকেট জায়েদ বিন নাসের এবং অ্যাডভোকেট জারিফ কবির।