চট্টগ্রাম আদালত চত্বরের অদূরে বান্ডেল রোডের পিচঢালা পথে এক বছর আগে যে রক্ত ঝরেছিল, বৃষ্টির জল কিংবা সময়ের ধুলো হয়তো তা ধুয়ে দিয়েছে; কিন্তু বিচারহীনতার যে দগদগে ক্ষত আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে, তা শুকায়নি। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর এক উত্তাল দিনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন তরুণ আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ।
কিছুদিন আগেই তার এক বছর পূর্ণ হলো। ৩৬৫ দিন পার হওয়ার পরেও যখন দেখি মামলার বিচারকাজ এখনো প্রাথমিক স্তরেই ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন প্রশ্ন জাগে—আদালতের কালো কোট যদি বিচারপ্রার্থীর রক্ষাকবচ হয়, তবে সেই কোট পরিহিত মানুষটিরই যখন নিরাপত্তা নেই, তখন সাধারণ মানুষের দাঁড়ানোর জায়গা কোথায়?
একজন আইনজীবীকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা কোনো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত। অথচ এই এক বছরে আমরা যা দেখেছি, তা হলো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ‘স্পর্শকাতর’ অজুহাতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মন্থর গতি। অভিযোগপত্র জমা পড়েছে, আসামিদের নাম এসেছে, কিন্তু কাঠগড়ায় বিচার শুরু হওয়ার যে দৃশ্য দেখার কথা ছিল, তা এখনো দৃশ্যপটের বাইরেই রয়ে গেছে।
আইনি চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো মামলাটি ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে চিহ্নিত করার সংস্কৃতি। চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অরাজকতার বলি হয়েছিলেন আলিফ। এই মামলার সঙ্গে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা জড়িত থাকায় তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন উভয়ই এক ধরণের ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করেছে বলে মনে হয়। জুলাই ২০২৫–এ পুলিশ অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দিলেও, আইনি প্যাঁচ এবং বিভিন্ন অজুহাতে বিচারিক আদালতের কার্যক্রম থমকে আছে।
আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে ই-পারিবারিক আদালত
আমার পর্যবেক্ষণ বলে, এই ‘ধীরে চলো’ নীতি আদতে বিচারহীনতাকে উৎসাহিত করার একটি কৌশল। যখন কোনো মামলাকে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হিসেবে ট্যাগ করা হয়, তখন তার বিচারিক গতি কমে যায়, সাক্ষীরা ভয়ের সংস্কৃতিতে কুঁকড়ে যায় এবং সময়ের স্রোতে জনদাবি স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু আলিফ হত্যার মতো ঘটনা, যা দিবালোকে এবং শত শত মানুষের সামনে ঘটেছে, সেখানে প্রমাণের অভাব থাকার কথা নয়।
সমস্যাটি প্রমাণের নয়, সমস্যাটি সদিচ্ছার। চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশন মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের যে দাবি তুলেছে, তা কেবল আবেগপ্রসূত নয়, বরং আইনি বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত যৌক্তিক। ২০০২ সালের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী এবং আইনশৃখলা বিঘ্নকারী হত্যাকাণ্ডের বিচার এই ট্রাইব্যুনালে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অথচ আমরা দেখছি সাধারণ আদালতের দীর্ঘ মামলার জটে এই ফাইলটিতে ধুলো জমছে।
এই মামলা নিয়ে এত আলোচনার কারণ কেবল আলিফ একজন আইনজীবী ছিলেন বলে নয়, বরং এই হত্যার ধরণ এবং প্রেক্ষাপট আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার একটি ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরেছে। আদালত প্রাঙ্গণ হলো ন্যায়বিচারের অভয়ারণ্য। সেখানে যদি উগ্রবাদী গোষ্ঠী বা কোনো উত্তেজিত জনতা একজন ‘অফিসার অব দ্য কোর্ট’কে নৃশংসভাবে হত্যা করার সাহস পায় এবং এক বছরেও তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার শুরু না হয়, তবে তা অপরাধীদের কাছে একটি ভয়ংকর বার্তা পৌঁছে দেয়।
বার্তাটি হলো—দলবদ্ধ সহিংসতা বা ‘মব ভায়োলেন্স’ করে পার পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বারবার বলছেন যে, আলিফ হত্যা মামলাটি যদি গতানুগতিক ধারায় চলে, তবে তা শেষ হতে এক দশকও লেগে যেতে পারে। আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতা একটি মহামারী। এই মহামারীর সুযোগ নিয়ে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আসে, সাক্ষীদের প্রভাবিত করে এবং একসময় মামলার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। আলিফের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষের উচিত ছিল এই মামলাটিকে একটি ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে আদালত চত্বরে বা আশেপাশে এমন অরাজকতা তৈরির সাহস কেউ না পায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, রাষ্ট্র এখানে বাদী এবং অভিভাবকের ভূমিকা পালনে যে দৃঢ়তা দেখানোর কথা ছিল, তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরও পড়ুন : ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নির্ভর করে বিচারকদের ব্যক্তিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতায়: বিচারপতি মইনুল
সমাধানের পথ খুঁজতে গেলে আমাদের আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা ভাবতে হবে। প্রথমত এবং অবিলম্বে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করতে হবে। ১৩৫ দিনের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন করার যে আইনি বাধ্যবাধকতা দ্রুত বিচার আইনে রয়েছে, তা প্রয়োগ করার এখনই সময়। দ্বিতীয়ত, একটি ‘জুডিশিয়াল মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে যা সরাসরি উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নজরদারিতে থাকবে।
এই সেল নিশ্চিত করবে যে, কোনো অজুহাতেই যেন শুনানির তারিখ পেছানো না হয়। তৃতীয়ত, সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। যেহেতু এই মামলার আসামিরা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, তাই সাক্ষীরা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রাষ্ট্রকে সাক্ষীদের আদালতে আসা এবং জবানবন্দি দেওয়ার পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রসিকিউশনের দলে দক্ষ এবং আপোষহীন আইনজীবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যারা আইনি তর্কে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মোকাবিলা করতে সক্ষম।
পরিশেষে বলতে চাই, সাইফুল ইসলাম আলিফের হত্যা কোনো ব্যক্তিগত বিবাদ ছিল না, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত অরাজকতার অংশ। এক বছর অনেক দীর্ঘ সময়। একটি স্বাধীন দেশে বিচারের জন্য এক বছর অপেক্ষা করা মানে হলো বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন যখন আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিচার চান, তখন সেই আর্তনাদ কেবল একজন সন্তানের পিতার নয়, তা এই জনপদের প্রতিটি বিচারপ্রার্থীর আর্তনাদ।
রাষ্ট্র যদি এই আর্তনাদ শুনতে ব্যর্থ হয়, তবে আমরা এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব যেখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। সময় ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। আমরা চাই, আগামী এক মাসের মধ্যে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হোক এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি জনসমক্ষে আসুক। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এটাই সুযোগ। আলিফের রক্ত যেন বৃথা না যায়, তার বিচার যেন কেবল ফাইলের স্তূপে চাপা না পড়ে—এটাই আমাদের একমাত্র দাবি এবং প্রত্যাশা।
লেখকঃ মোঃ ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ্, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স (বিএলএ)। ইমেইলঃ ibrahimkhalilullah010@gmail.com

