বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জনসাধারণের আচরণগত মানের ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটছে। সমাজে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্নীতি, ঘুষ, নারী নির্যাতন, যৌতুক, ব্যাভিচার, পর্নোগ্রাফি, জুয়া, মাদক এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ। অথচ ইসলাম ধর্মের মূল ধারক-বাহক হিসেবে মসজিদ এবং মসজিদের ইমামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের বহু ইমাম এসব ধর্মবিরোধী ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁদের খুতবায় কোনো প্রকার সতর্কবাণী বা সচেতনতা সৃষ্টি করছেন না।
বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা এসব গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আলোচনার চেয়ে দান-সদকার ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করছেন, যার ফলে সমাজে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে যে অবৈধ অর্থ দান করলেই ব্যক্তির পাপ মোচন হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এই ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় এবং অপরাধ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আজ রোববার (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোঃ মাহমুদুল হাসান ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের নিকট রেজিস্ট্রি ডাক ও ইমেইলের মাধ্যমে একটি আইনি নোটিশ প্রদান করেছেন।
নোটিশে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার নিশ্চিত থাকলেও বাস্তবে ইমামরা তাঁদের নৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না, ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, ইসলামে ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক, পর্নোগ্রাফি, জুয়া, যৌতুক, নারী নির্যাতন এবং ব্যাভিচারীতার স্থান নেই, কিন্তু ইমামদের নীরবতা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে এবং তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে।
আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে ই-পারিবারিক আদালত
নোটিশে আরও বলা হয়েছে যে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন ১৯৭৫ এর ১১(ক) ধারার অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব হলো মসজিদ পরিচালনা, তদারকি ও ব্যবস্থাপনা করা । এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইমামদের যোগ্যতা, নৈতিকতা, শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড, চরিত্র এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা। কিন্তু দেশে কোনো কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা না থাকায় অদক্ষ বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অনেক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন যে দেশের বহু মসজিদ কমিটিতে এমন ব্যক্তিরা রয়েছেন যারা ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচার, জুয়া, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধী ব্যক্তিরা মসজিদ পরিচালনায় যুক্ত থাকলে মসজিদের পবিত্রতা মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয় এবং মুসলিম সমাজে নৈতিক অবক্ষয় আরও বৃদ্ধি পায়।
নোটিশে বলা হয়েছে, ইমামদের নীরবতা এবং মসজিদ কমিটির অনিয়ম শুধু ধর্মীয় অবক্ষয় নয় বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা, পারিবারিক কাঠামো এবং জাতীয় মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এই নীরবতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং জনকল্যাণের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে যে, দেশের সকল মসজিদের ইমামদের যোগ্যতা, নৈতিক চরিত্র, ধর্মীয় জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে । পাশাপাশি ইমামদের নির্দেশনা দিতে হবে যাতে তাঁরা খুতবায় ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি, ঘুষ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, ব্যাভিচারীতা, মাদক, জুয়া, পর্নোগ্রাফি এবং অন্যান্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন । এছাড়া দেশের প্রতিটি মসজিদ কমিটির সদস্যদের কার্যক্রম যাচাই করতে হবে এবং যারা অপরাধে জড়িত তাদের অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে । পাশাপাশি ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন ১৯৭৫ অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
উক্ত আইনি নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি ০৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে বিবাদীরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে একটি জনস্বার্থে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।

