জিয়াবুল আলম : সাতকানিয়া–লোহাগড়া আদালত নিজ এলাকায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক বা অবকাঠামোগত বলে যত সহজভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তবে বিষয়টি ততটা সরল নয়। কারণ আদালতের অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন সরাসরি বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ, সংবিধানিক ক্ষমতার বিভাজন এবং হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত, যা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত।
সংবিধান ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নীতি
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২ বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার নীতিগত নির্দেশ দেয়। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ ঘটে ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলায় (Secretary, Ministry of Finance v. Masdar Hossain, 52 DLR (AD) 82)।
আপিল বিভাগ এই রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, জেলা ও অধস্তন আদালতসমূহের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতে ন্যস্ত থাকা সংবিধানসম্মত নয়; বরং সেই নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের।
অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬ক এবং হাইকোর্টের তত্ত্বাবধান
এই রায়ের পর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬ক কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে অধস্তন আদালতের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক করা হয়। আদালতের অবস্থান পরিবর্তন বা এখতিয়ার পুনর্বিন্যাস এই প্রশাসনিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা: সহায়ক, সিদ্ধান্তমূলক নয়
হাইকোর্ট বিভাগ Judicial Service Association বনাম বাংলাদেশ সরকার (62 DLR) মামলায় আরও বলেন, বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা সহায়ক মাত্র; চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কর্তৃত্ব বিচার বিভাগের কাছেই থাকবে।
এই নীতির আলোকে আদালত স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত হাইকোর্ট বিভাগের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাতকানিয়া–লোহাগড়া কোর্ট স্থানান্তর: মূল প্রশ্ন
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে, সাতকানিয়া–লোহাগড়া কোর্ট স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত কি হাইকোর্ট বিভাগের প্রশাসনিক কমিটির সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়মতান্ত্রিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে? নাকি এটি স্থানীয় প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবিত একটি উদ্যোগ?
ভারতের বিচারিক অভিজ্ঞতা
ভারতের বিচারিক অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নকে আরও স্পষ্ট করে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Supreme Court Advocates-on-Record Association v. Union of India (Second Judges Case) এবং In Re: Presidential Reference (Third Judges Case) মামলায় ঘোষণা করেন, বিচার বিভাগের কাঠামো, আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অবস্থান সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের মতামতই প্রাধান্য পাবে।
রাজ্য সরকারগুলো সেখানে জেলা আদালতের স্থানান্তর বা পুনর্গঠনে একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টও Al-Jehad Trust v. Federation of Pakistan (PLD 1996 SC 324) মামলায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
পরবর্তীকালে Sindh High Court Bar Association Case-এ আদালত বলেন, বিচার প্রশাসনে নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুধু অনুচিত নয়, বরং তা ন্যায়বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক উদ্বেগ
বাংলাদেশে বর্তমানে আলাদা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় কাঠামো বিদ্যমান থাকার পরও যদি আদালতের অবস্থান নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্তে আইনি প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থাকে, তবে তা মাসদার হোসেন রায়ের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
উপসংহার
অতএব প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সুবিধা বা অসুবিধার নয়; প্রশ্নটি হলো, হাইকোর্টের রায়ে নির্ধারিত বিচার প্রশাসনিক সীমারেখা মানা হচ্ছে কি না। আদালতের অবস্থান যদি আইনি প্রক্রিয়া ও উচ্চ আদালতের তত্ত্বাবধান উপেক্ষা করে নির্ধারিত হয়, তবে তা সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সরাসরি ব্যত্যয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

