মোঃ জুয়েল আজাদ : মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির বন্টনের কথা বিভিন্ন পার্সোনাল ল তে বলা থাকলেও, গুম বা নিখোঁজ এর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভাবে কোন বিধান নাই। গুম হওয়া ব্যক্তির বা নিখোঁজ ব্যক্তি ওয়ারিশগণ অর্থাৎ পিতা-মাতা স্ত্রী সন্তান, কিছু ক্ষেত্রে ভাই-বোন তারা, ঠিক কতদিন পর্যন্ত কিংবা কোন তারিখ থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিকে বা গুমের শিকার ব্যক্তি কে মৃত ঘোষণা করে সম্পত্তি বন্টন ব্যবস্থা করতে পারবে! এমন আইনি প্রশ্ন এবং সমাধান পেতে বিভিন্ন আইনের সমন্বয়ে প্রতিকারের পথ খুঁজতে হয়, একজন বিচারপ্রার্থীকে।
এমন বাস্তবতায়, গুমের শিকার কিংবা নিখোঁজের পরিবারের কথা চিন্তা করে, সম্প্রতি আপনার জানেন “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫” সালে আইন হয়েছে, যেখানে গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার, ৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার পর স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে গুমের শিকার, সে ব্যক্তির স্ত্রী কিংবা তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি গুম হওয়া ব্যক্তির স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ব্যবহার এবং হস্তান্তর একটা অধিকার দেওয়া হয়েছে ঠিক ততটুকু যতটুকু তাদের যৌক্তিক জীবন ধারন এবং ব্যয়ের জন্য প্রযোজ্য।
এক্ষেত্রে অবশ্যই তাদেরকে সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে একটি আবেদন করতে হবে সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মহোদয় একটি গুম সনদ ইস্যু করবে, সেই সনদের প্রেক্ষিতে গুম হওয়া ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল এমন পারিবারিক সদস্যগণ সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির উপর একটি ব্যবহার সত্ত্ব, পাশাপাশি কিছু হস্তান্তরের অনুমতির বিধান আছে, যা আবেদনকারী পেয়ে থাকে। এখানে সম্পত্তির বন্টনের কিংবা ওয়ারিশগণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্পত্তির মালিক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ নেই।
আরও পড়ুন : পারিবারিক আপিল আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে বিশেষ আদালত ঘোষণা সরকারের
বাংলাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে কোন আইন না থাকলেও, আপনি যদি সাক্ষ্য আইনের ধারা ১০৮ বিবেচনায় আনেন, তখন আপনি দেখবেন যে একজন ব্যক্তিকে তখন মৃত ঘোষণা করা যেতে পারে যখন সে নিখোঁজের তারিখ থেকে সাত বছর ধরে তার কোন খোঁজ খবর নেই কিংবা তার বেঁচে থাকার কোন অস্তিত্ব প্রমাণ কারো কাছে নেই। আন্তর্জাতিক আইনে জাতিসংঘের কনভেনশন, ১৯৫৬ যেটাকে বলা যেতে পারে, নিখোঁজ ব্যক্তির মৃত ঘোষণার আইন।
সেই আইনে আপনি দেখবেন যে, নিখোঁজের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত যদি তার কোন খোঁজ খবর পাওয়া না যায় বা জীবিত থাকার কোন অস্তিত্ব না থাকে তখন নিখোঁজের দিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত অতিবাহিত হলে সমস্ত ভুক্তভোগী পরিবার নির্ধারিত আদালতে আবেদন করে মৃত ঘোষণা করে তৎপরবর্তী সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত বন্দোবস্ত করতে পারবে। এই আইনটি বাংলাদেশ গ্রহন করেছে। আইনের তুলনামূলক নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্লেষণের স্বার্থে, মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে দৃষ্টিপাথ করলে দেখবেন, একজন স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারবে যদি স্বামী চার বছর ধরে নিখোঁজ অর্থাৎ এই আইনে আপনি নিখোঁজের সাথে সময়সীমা পেয়েছেন চার বছর।
আরও পড়ুন : রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সৌজন্য সাক্ষাৎ
সুতরাং আপনি দেখলেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালে সেখানে গুমের বিবেচনা প্রশ্নে সময়সীমার কথা বলা আছে পাঁচ বছর জীবিত অথবা মৃত উভয় ক্ষেত্রে, ওই দিক থেকে আবার সাক্ষ্য আইন ধারা ১০৮ এ মৃত্যু ঘোষণা করার অপেক্ষার সময় বলা আছে সাত বছর। আবার আন্তর্জাতিক কনভেনশন আইন অনুযায়ী নিখোঁজের পাঁচ বছর সময়সীমার কথা বলা আছে। মুসলিম আইনে বিশেষ করে হানাফি মাজহাবে এর নিখোঁজ বা গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তির মালিকানা বা বিলি বন্দোবস্তের বিধান নাই। যতদূর পর্যন্ত সম্ভব নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলা আছে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি ভরণপোষণ কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে।
আলোচনার শেষঅন্তে, সম্পত্তি ওয়ারিশ হিসেবে বন্টনের ক্ষেত্রে যার সম্পত্তি বন্টিত হবে তাকে অবশ্যই মৃত হতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তিকে বা গুম ব্যক্তিকে মৃত ধরার সময়সীমা এই আলোচনায় বিভিন্ন দৃশ্যমান হওয়ায়, বাংলাদেশ একটি আইন করা যেতে পারে যেখানে নিখোঁজ হোক কিংবা গুম হোক, চার বছর অতিবাহিত হলে উক্ত ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বন্দোবস্তের ব্যবস্থা থাকবে।
তবে আপাতত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ,২০২৫ সাময়িক সমাধান হিসেবে আইনটি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশা করছি। একটি নতুন আইন কিংবা বিদ্যমান আইনের সংশোধন এনে নিখোঁজ হোক কিংবা গুম হোক, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার পর, তাকে মৃত ঘোষণা তারিখ এবং তৎপরবর্তী ওয়ারিশদের সম্পত্তির মালিকানা এবং ভোগদখল জটিলতার পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার সম্ভব।।
লেখকঃ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ইমেইল- lawyerjuwel@gmail.com.

