ইমরান হোসাইন রুমেল
ইমরান হোসাইন রুমেল

একটি শিশুর কান্না ও আমাদের বিবেক

মোঃ ইমরান হোসাইন রুমেল : নয়াপল্টনের সরু গলিতে অবস্থিত শারমিন একাডেমী। বাইরে থেকে দেখতে এটি সাধারণ এক পাঠশালা মনে হলেও, ভেতরের চার দেয়াল আজ সাক্ষী হয়ে আছে এক লোমহর্ষক অধ্যায়ের। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল—গোলাপী শাড়ি পরা প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং ম্যানেজার পবিত্র কুমার একটি ৪-৫ বছরের শিশুকে যমদূতের মতো ঘিরে ধরেছেন।

শিশুটির অপরাধ ছিল অতি তুচ্ছ, কিন্তু শাস্তি ছিল অকল্পনীয়। ফুটেজে দেখা যায়, সেই শিক্ষক শিশুটিকে চড় মারছেন, আর ম্যানেজার তার গলা টিপে ধরছেন। এমনকি হাতে স্ট্যাপলার নিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে—কথা বললে মুখ সেলাই করে দেওয়া হবে। শিশুটির আর্তচিৎকার আর বাঁচার আকুতি যেন ওই পাথুরে দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ছিল, কিন্তু পাষণ্ড শিক্ষকদের হৃদয়ে দয়া জাগেনি। উল্টো শিশুটি যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, তখন শিক্ষিকার মুখে ছিল ক্রুর হাসি।

এই দৃশ্য যখন ভাইরাল হলো, তখন জেগে উঠল সাধারণ মানুষ। আইনজীবী সালেহ উদ্দিনের মতো সচেতন নাগরিকরা রুখে দাঁড়ালেন। তারা মামলা ঠুকলেন, আওয়াজ তুললেন—“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর কোনো শিশুকে এভাবে কাঁদতে দেব না।” শিশুটি আজ ট্রমার মধ্যে আছে, ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে বলে ওঠে, “আমার মুখ সেলাই করে দিও না।” এই আর্তনাদ শুধু ওই শিশুর নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর এক চপেটাঘাত। এই প্রতিবাদ কেবল একটি স্কুলের বিরুদ্ধে নয়, এটি শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার শপথ।

শিশু নির্যাতন ও সুরক্ষা আইন (বাংলাদেশ)

বাংলাদেশে শিশুদের সুরক্ষা এবং নির্যাতন রোধে কঠোর আইন রয়েছে। শারমিন একাডেমীর এই ঘটনার ক্ষেত্রে মূলত নিচের আইনগুলো কার্যকর:

১. শিশু আইন, ২০১৩:

  • নিষ্ঠুরতার দণ্ড (ধারা ৭০): কোনো ব্যক্তির হেফাজতে থাকা শিশুর প্রতি আঘাত, অবহেলা বা নিষ্ঠুর আচরণ করলে যাতে শিশুর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হয়, তার জন্য অভিযুক্তের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

  • ট্রমা ও সুরক্ষা: এই আইনে শিশুদের শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক ট্রমাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

২. দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860):

  • ধারা ৩২৩: স্বেচ্ছায় কাউকে আঘাত করার জন্য শাস্তির বিধান। শারমিন একাডেমীর ঘটনায় এই ধারাতেও মামলা করা হয়েছে।

৩. উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা (২০১১):

  • ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি (Corporal Punishment) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি শিশুদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।

আমাদের করণীয়

  • সচেতনতা: আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফেরার পর তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন। শিশু যদি স্কুল যেতে ভয় পায় বা অস্বাভাবিক আচরণ করে, তবে গুরুত্ব দিয়ে কারণ খুঁজুন।

  • আইনি পদক্ষেপ: নির্যাতন দেখলে ভয় না পেয়ে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ কল করুন।

  • সিসিটিভি নজরদারি: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাসরুম এবং কমন স্পেসগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা নিশ্চিত করার দাবি জানান।


লেখক : অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট, বাংলাদেশ।