শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা রক্ষায় একটি অ্যান্টি-র্যাগিং টোল-ফ্রি হেল্পলাইন স্থাপন করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন হাইকোর্ট।
র্যাগিং প্রতিরোধে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের রায়ের পর্যবেক্ষণে এই মন্তব্য করেন আদালত। ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট দেওয়া হাইকোর্টের ১১ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
জনস্বার্থে ২০২০ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তীতে চূড়ান্ত শুনানি শেষে পর্যবেক্ষণ প্রদান করে রুলটি নিষ্পত্তি করা হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণের বরাতে ইশরাত হাসান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র্যাগিং ও বুলিং শিক্ষার্থীদের জীবন, মর্যাদা, মানসিক সুস্থতা এবং মৌলিক অধিকারগুলোর ওপর মারাত্মক আঘাত হানে। অনেক ক্ষেত্রে এটি শারীরিক নির্যাতন, গভীর মানসিক ট্রমা, যৌন হয়রানি এমনকি আত্মহত্যার কারণ পর্যন্ত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সরাসরি লঙ্ঘন।
রায়ে বাংলাদেশ সরকার বনাম অধ্যাপক নুরুল ইসলাম মামলার রেফারেন্স দিয়ে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবিধানের বাঁচার অধিকার কেবল জীবন রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্য, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং শিক্ষা লাভের সুযোগ নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য।
আরও পড়ুন : চট্টগ্রামে দুটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্থানান্তরের বৈধতা প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে এখনো র্যাগিংকে আলাদা অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকলেও দণ্ডবিধি ও অন্যান্য প্রচলিত আইনের আওতায় র্যাগিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু কার্যকলাপ ইতোমধ্যেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
ইশরাত হাসান বলেন, আদালত ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের র্যাগিংবিরোধী আইন ও নীতিমালার উদাহরণ টেনে উল্লেখ করেছে যে, এসব দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশেও একটি কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
আদালত বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে বলেন, র্যাগিং প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের জন্য একটি অ্যান্টি-র্যাগিং টোল-ফ্রি হেল্পলাইন স্থাপন করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি আদালত একটি কেন্দ্রীয় অ্যান্টি-র্যাগিং ওয়েবসাইট চালুর ওপর জোর দেন, যেখানে র্যাগিং সংক্রান্ত অভিযোগ দাখিল করা যাবে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। আদালত মনে করেন, এই ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ভুক্তভোগীদের ভয় কাটিয়ে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করবে।
এ ছাড়া আদালত সরকার প্রণীত “পলিসি ফর প্রিভেনশান অব বুলিং অ্যান্ড র্যাগিং ইন এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস, ২০২৩” কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী ডিসিপ্লিনারি ও অ্যান্টি-র্যাগিং কমিটি গঠন, জরুরি অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেন আদালত, যাতে শিক্ষার্থীদের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপদ শিক্ষার অধিকার বাস্তবভাবে সুরক্ষিত হয়।

