নাজিয়া আমিন : মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না – এ নিয়ে ফেসবুক সহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ মুসলিম ধর্মের বহু বিবাহ সংক্রান্ত একটি রায় প্রদান করেছেযেখানে বলা হয়েছে যে, মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বা একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে বর্তমান স্ত্রীর অনুমতির প্রয়োজন নেই।
অনেকেই মনে করছেন যে, মহামান্য হাইকোর্ট এ রায় প্রদানের মাধ্যমে বিবাহ আইনের একটি পরিবর্তন করেছে, যা প্রকৃতপক্ষে ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া কিছুই নয়। অন্য ভাষায় বলা যায় যে, বহু বিবাহ নিয়ে বর্তমান সমাজে এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। মহামান্য হাইকোর্টের যে রায়কে কেন্দ্র করে এধরনের ধারণা হয়েছেতার আইনী ব্যাখ্যা সঠিকভাবে আত্মস্থ করার মাধ্যমেই এর অবসান সম্ভব।
রিট পিটিশনে (Writ Petition) যে রায় প্রদান করা হয়েছে
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের হয়। সেই রিটপিটিশনে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় তা হচ্ছে যে, উল্লেখিত আইনের ৬ ধারায় মুসলিম পুরুষের দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর সরাসরি অনুমতি নেয়ার বিষয়টি উল্লেখ নেই, শুধুমাত্র সালিশী কাউন্সিলের অনুমতির কথা বলা আছে। এ ধরনের বিধান নারীর জন্য বৈষম্যমূলক।
সুতরাং দাবি করা হয় যে, এক্ষেত্রে শুধুমাত্র সালিশী কাউন্সিলের নয়, বরং প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। মহামান্য আদালত এ মর্মে রায় প্রদান করেন যে, এ ধরনের বিবাহের ক্ষেত্রে সালিশী কাউন্সিলের লিখিত অনুমতিই যথেষ্ট। সরাসরি প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। অর্থ্যাৎ, সংশ্লিষ্ট আইনের ৬ ধারা বহাল রাখা হয়।
মহামান্য আদালত এখানে আরও উল্লেখ করেন যে, ৬ ধারা নারীর জন্য বৈষম্যমূলক নয় এবং তা সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী নয়। সুতরাং, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এর ৬ ধারা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রায় দ্বারা এ ধারাকে সংশোধন বা সংযোজন করা হয়নি। বহু বিবাহের বিষয়টি আগে যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল এখনও ঠিক সেভাবেই চলবে।
মুসলিম পুরুষ কোন রকম অনুমতি ব্যতিত একাধিক বিয়ে করতে পারে কি না
মুসলিম ধর্মের অন্তর্ভুক্ত কোন পুরুষ স্বাধীনভাবে একের অধিক বিয়ে করতে পারে কি না তা জানতে হলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারায় Polygamy বা বহুবিবাহ সম্পর্কে কি বলা হয়েছে তা জানা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।
উক্ত ধারায় প্রথমত বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি বিবাহ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় পুনরায় বিয়ে করতে চান তাহলে অবশ্যই সালিশী কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। এ অনুমতি নেয়ার জন্য কিছু বিধান আছে যা অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। সালিশী কাউন্সিলের অনুমতির জন্য বিবাহের কারণ এবং উক্ত বিবাহে বিদ্যমান স্ত্রীদের সম্মতি আছে কিনা তা উল্লেখপূর্বক একটি আবেদনপত্র উক্ত কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের নিকট দাখিল করতে হবে।
আবেদন প্রাপ্তির পর চেয়ারম্যান আবেদনকারী এবং তার বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের একজন করে প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য আহ্বান জানাবেন। অর্থ্যাৎ, স্বামী এবং স্ত্রী উভয় পক্ষ থেকেই একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। এরপর সালিশী কাউন্সিল যদি মনে করেন যে, বিবাহটি সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সঙ্গত তাহলে আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।
সুতরাং, কোন ব্যক্তি ইচ্ছা অনুযায়ী বহু বিবাহে জড়িত হতে পারে এমনটা মনে করা পুরোপুরি অযৌক্তিক। তার পেছনে অবশ্যই উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে এবং বিদ্যমান স্ত্রীদের সম্মতি থাকতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সালিশী কাউন্সিল অনুমতি দিলেই কেবল আইনগতভাবে বিবাহ গ্রহণযোগ্য হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, বিদ্যমান স্ত্রীর লিখিত অনুমতির বিষয়টি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তবে সালিশী কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যমান স্ত্রীর সম্মতি থাকতে হবে।
সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে তার পরিণাম
সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি ব্যতীত কোন ব্যক্তি বহুবিবাহ করলে তা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য অপরাধী ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
এ মর্মে দিলরুবা আক্তার বনাম এ এইচ এম মোহসিন ৫৫ ডি এল আর ৫৬৮ মামলায় বলা হয়েছে যে, বাদী তার প্রথম স্ত্রীকে যথাযথভাবে তালাক প্রদান করেননি। এ অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬(৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।আয়েশা সুলতানা বনাম শাহজাহান আলী ৩৮ ডিএল আর ১৪০ মামলায়ও এ ধরনের মতামত প্রদান করা হয়েছে।
যদি কোন ব্যক্তি সালিশী কাউন্সিলের বিনা অনুমতিতে বহুবিবাহ করেন তাহলে উক্ত সালিশী কাউন্সিল বিদ্যমান স্ত্রীদেরকে সম্পূর্ণ মোহরানা পরিশোধের আদেশ দিবেন এবং তা পালন করা সেই ব্যক্তির জন্য বাধ্যতামূলক।
বিয়ের রেজিস্ট্রেশন
বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। কাবিননামা সঠিকভাবে নিবন্ধন না করলে সেই বিয়ের কোন আইনগত ভিত্তি থাকে না। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা অনুসারে, সালিশী কাউন্সিলের বিনা অনুমতিতে বহু বিবাহ করলে তা রেজিস্ট্রেশন করা যায় না। রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাজীর নিকট গেলে তিনি যাচাই করবেন যে, বিবাহটি সেই ব্যক্তির বহুবিবাহ কি না এবং সেখানে সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি আছে কি না।
উপসংহার
সবশেষে এই বলা যায় যে, একজন মুসলিম পুরুষের বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সালিশী কাউন্সিলের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক। বর্তমান সমাজে বহুবিবাহ নিয়ে যে অপব্যাখ্যা চলছে তা থেকে বের হয়ে আসা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ বহুবিবাহের ক্ষেত্রে চলমান আইনটিকেই বহাল রেখেছে। এখানে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রীর লিখিত অনুমতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি, তবে স্ত্রীর সম্মতির বিষয়টি রাখা হয়েছে।
লেখক : ব্যারিস্টার-এট-ল; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

