ঢাকা || শুক্রবার , ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং || ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ || ৭ই জমাদিউস-সানি, ১৪৩৯ হিজরী

মাদক নিয়ন্ত্রণে এবার উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হবে তো?

ড. বদরুল হাসান কচি: 

সারাদেশে ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদকের প্রবেশ, নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য অনুসন্ধানে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশের আইজিকে প্রত্যেক জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে বলা হয়েছে।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সোমবার (২৯ জানুয়ারি) বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নির্দেশনাসহ রুল জারি করেন।

তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই নির্দেশনা পালনে জোর দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সে বিষয়ে পিবিআইকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

প্রায় সকলের জানা কথা, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত গলিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, আফিম থেকে শুরু করে সব ধরনের নেশাজাত সামগ্রী অবাধে পাচার হয়ে আসে। সেসব স্থানে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী আর প্রশাসনিক শক্তির মিলিত সহায়তায় মাদক ব্যবসায়ীরা অসম্ভব ক্ষমতায় বলীয়ান। সীমান্ত ডিঙিয়ে আনা মাদকদ্রব্য নিরাপদে গুদামজাত করা হয় প্রায় প্রকাশ্যেই। তারপর সেসবের চালান পাঠানো হয় রাজধানীসহ জেলায় জেলায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন জেলায় অপ্রতিরোধ্য রয়েছে এ মাদক সাম্রাজ্য।

চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সংবাদ সূত্রে অবগত হওয়া গেছে- দেশের ৭০ লাখ মাদকাসক্তকে ঘিরে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের বহুমুখী ধান্দা-বাণিজ্য চলছে! আইসিডিডিআরবির এক সমীক্ষায় বলা হয়, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির মাদক ব্যবহারজনিত ব্যয় বছরে ৫৬ হাজার ৫৬০ টাকা থেকে ৯০ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। সে হিসাবে ৭৫ লাখ মাদকসেবী বছরে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। এর সঙ্গে মাদক নিরাময় কেন্দ্র, এনজিও কার্যক্রম ও সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে জানা গেছে। তবে গোয়েন্দা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির বার্ষিক গড় ব্যয় আড়াই লাখ টাকা।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মাদকাসক্তের যে গতিধারা তাতে ২০২০ সালে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা গিয়ে ঠেকবে এক কোটিতে! দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যখন এভাবে অন্ধকার জগতে রয়েছে সেটা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা বলতেই হবে। তাছাড়া মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তি কেবল একা নয়, তাকে নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয় পুরো পরিবারকে।

ভয়াবহ এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এই মুহূর্ত থেকেই পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে এবং দেশের উচ্চ আদালতের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়নকল্পে দেশজুড়ে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা অতীব জরুরী। অন্যথায় দেশের যাবতীয় অগ্রগতি নেশার আগ্রাসনের কাছে ম্লান হতে বাধ্য।

লেখক- অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সম্পাদক, ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম।