চট্টগ্রামে আদালতের সঙ্গে চাঞ্চল্যকর প্রতারণা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৪ আগস্ট, ২০১৮ ২:৪৫ অপরাহ্ণ

আদালতের সঙ্গে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। একটি শ্রমিক পরিবারের চার সদস্যকে শিল্পকারখানার মালিক সাজিয়ে ১০টি চেক প্রতারণার মামলা করেন এক ব্যক্তি। আটটি মামলায় ওই চারজনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। অন্য দুটি মামলা এখনো বিচারাধীন।

আদালতের রায় ঘোষণার পর ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে আসামির ইপিজেড থানাধীন নিউমুরিং এলাকার বাড়িতে যায়। তখন থেকে চারজনই পালিয়ে আছেন। কথিত আসামিরা হলেন রেজিয়া বেগম এবং তাঁর তিন সন্তান ফারহানা সুলতানা, সাবরিনা সুলতানা ও সৈয়দ আবদুল দায়ান।

আদালত সূত্র জানায়, জনৈক মো. মোরশেদ ২০১৫ সালের ১৫, ১৭ ও ২৩ সেপ্টেম্বর ১০টি চেক প্রত্যাখ্যাত (ডিজঅনার) হওয়ার মামলা করেন। এর মধ্যে ৯টি চেক ৩০ লাখ টাকা করে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং অন্যটি ৫০ লাখ টাকার চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মামলা। অথচ আসামিরা একটি শ্রমিক পরিবারের সদস্য। রেজিয়া বেগমের স্বামী আবদুল হাই চট্টগ্রাম বন্দরের মজুরিভিত্তিক শ্রমিক। তাঁর দৈনিক মজুরি ৩০০-৪০০ টাকা। রেজিয়ার এক মেয়ে স্নাতক পাস করেছেন। আরেক মেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। ছেলেটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি ছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলাগুলো করার সময় মোরশেদ চারজনকে সানরাইজ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের মালিক দেখিয়েছেন। বাস্তবে এই কারখানার সঙ্গে আসামিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

মামলায় বাদী মোরশেদের ঠিকানা দেওয়া আছে চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাটের চেয়ারম্যানঘাটার রাফি ভিলা। আরেকটি মামলায় নগরের মতিয়ারপুলের কুমারী লেনের কদমতলী স্কুল গলি ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম আদালতে এ-সংক্রান্ত মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে পাঁচটি মামলার রায় দেন তৎকালীন চট্টগ্রামের যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ সপ্তম আদালতের বিচারক বেগম সালমা খাতুন। রায়ে প্রত্যেক আসামির আট মাস করে কারাদণ্ড হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের চতুর্থ মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ ফায়জুন্নেছা একই বছর একটি এবং ২০১৭ সালে দুটি মামলার রায় দেন। রায়ে প্রত্যেকের ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত রেজিয়া বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, ১০টি চেকের মামলার ব্যাপারে তাঁরা অন্ধকারে ছিলেন। তাঁরা দিনে এনে দিনে খান। তাঁদের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। শ্রমিক পরিবারের সদস্য হয়ে শিল্পকারখানার মালিক হওয়ার খবরে তিনি বিস্মিত। বাদী মোরশেদ তাঁর ননদের ছেলে। পারিবারিক বিরোধ থেকে মোরশেদ এই প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারেন বলে তাঁর ধারণা।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, এসব মামলা ভুয়া। কথিত আসামির সঙ্গে চেকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করে চারজনকে ফাঁসানো হয়েছে। বাদীর আইনজীবীদের খোঁজা হচ্ছে। এই আইনজীবীরাও ভুয়া বলে তাঁর ধারণা।

আসামিদের আইনজীবী মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাদী এমনভাবে কাগজপত্র বানিয়ে মামলাগুলো উপস্থাপন করেছেন, যা আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু একটি শ্রমিক পরিবার কীভাবে শিল্পকারখানার মালিক হলেন! পুরো বিষয়টি আদালতের কাছে আমরা তুলে ধরব।’

ব্যবহার হয় ব্র্যাক ব্যাংকের চেক
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাদী মোরশেদ ব্র্যাক ব্যাংক মোমিন রোড শাখার একটি হিসাবের ১০টি চেক ব্যবহার করেন। চেকগুলো সিবিএল-৪৬৯২১৬ থেকে সিবিএল-৪৬৯২২৫ ক্রমিক নম্বরের। চেকগুলো আসামি চারজনের নামে কি না, তা যাচাই করে জবাব দিতে ব্র্যাক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ চিঠি পাঠান আসামিদের আইনজীবী মো. আলী হাসান ফারুক। ব্যবস্থাপক চিঠির জবাব দিয়ে বলেন, ‘উল্লেখিত ব্যাংক হিসাব আপনার মক্কেলের (চার আসামি) নয়।’

আইনজীবী আলী হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, চেক প্রত্যাখ্যাত মামলার বাদী মোরশেদ প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ১০টি মামলা করেছিলেন। কিন্তু চেকগুলো আরেক ব্যক্তির নামে। ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে জানিয়েছে যে চার আসামির সঙ্গে ১০টি চেক বা ব্র্যাক ব্যাংকের ওই হিসাবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে মোমিন রোড শাখার ব্র্যাক ব্যাংকে আবার যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে উল্লেখিত চেক চার আসামির নয় বলে নিশ্চিত করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, কীভাবে চেকগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহার হয়েছে তা আদালত অনুসন্ধানের নির্দেশ দিলে ব্যাংক থেকে সব ধরনের তথ্য সরবরাহ করা হবে।

আসামিদের প্রক্সি
একে একে ১০ মামলা হওয়ার পর কথিত চার আসামি ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট আদালতে মহানগর হাকিম আদালতে হাজির ছিলেন বলে আদালতের নথি থেকে জানা গেছে। কিন্তু রেজিয়া বেগম ও তাঁর তিন সন্তান এ বিষয়ে তখন কিছুই জানতেন না। অর্থাৎ আসামির কাঠগড়ায় রেজিয়া বেগম ও তাঁর তিন সন্তান হয়ে যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা বাদীর পরিচিত কেউ হতে পারেন। তাঁরাও প্রতারক চক্রের সদস্য বলে আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইফতেখার সাইমুলের ধারণা।

রেজিয়া বেগম বলেন, কথিত মামলাগুলোয় সাজা হওয়ার পর পুলিশ পরোয়ানা নিয়ে তাঁদের বাড়িতে যায়। এখন দুই মেয়েসহ তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানান। বিচারাধীন দুটি মামলার আসামি তাঁর ছেলে দায়ান। তিনি জামিনে আছেন। কিন্তু অন্য আট মামলায় দায়ানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।

রেজিয়া বেগমের স্বামী আবদুল হাই বাকপ্রতিবন্ধী। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের অস্থায়ী শ্রমিক। তাঁর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারটি।

বাদী যা বলেন
বাদী মো. মোরশেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে লেনদেন ছিল। তাঁরা (চারজন) আমাকে চেক দিয়েছেন। চেক প্রত্যাখ্যান হওয়ায় মামলা করেছি। আদালত সাজা দিয়েছেন। আসামিরা যদি মনে করেন তাঁরা ন্যায়বিচার পাননি তাহলে উচ্চ আদালতে যেতে পারেন।’

রেজিয়া বেগমের ভাই কামাল উদ্দিন বলেন, ‘মোরশেদের জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি আপসের প্রস্তাব দেন। একপর্যায়ে পাঁচ মামলার ভুয়া জামিননামা বের করেন বাদী। আদালতে গিয়ে জানা যায়, ওই জামিননামা ভুয়া। তিনি আদালতের সঙ্গে যেভাবে প্রতারণা করেছেন, তাঁর কঠিন শাস্তি আমরা দেখতে চাই।’ প্রথম আলো