মিশ্র-ধর্মীয় বিবাহের সামাজিক ও আইনগত সমস্যা এবং প্রতিকার

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ৩:৪৬ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান

কামরুল হাসান :

বিবাহ মানব জীবনের অতিগুরুত্বপূর্ণ অংশ যা মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেI এই বিবাহের মাধ্যমে একটি পরিবার সামাজিক প্রতিষ্ঠান রূপে সমাজে আবির্ভূত হয়I বিবাহ শুধুমাত্র সামাজিক বন্ধনই নয় বরং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইহা খুবই তাৎপর্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণI স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেI কোন কোন ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা আইনি সমস্যায় প্রধান কারণ বলে ধরে নেওয়া হয়I কেননা, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধ অমান্য করে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ালে দাম্পত্য জীবনে সুখের চেয়ে দুঃখের পাল্লাই ভারী হয়I যেকোনো সম্পর্কের বৈধতার ক্ষেত্রে আইনগত স্বীকৃতির পাশাপাশি সামাজিক স্বীকৃতি অর্জন করা অপরিহার্যI কেননা আইনসিদ্ধ বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেই সন্তানের বৈধতা নিশ্চিত করা হয়I এছাড়াও, সামাজিকভাবে বসবাস করতে গিয়ে অতিমাত্রায় আবেগের বশবর্তি হয়ে দুই ধর্মের মতাদর্শী নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বিবাহের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়I এতে করে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় বিধি-নিষেধই প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়ায়I শুধুমাত্র তাই নয় ধর্মীয় নিগ্রহের সাথে সাথে সামাজিক জীবনে নানান বৈষম্যের শিকার হতে হয়I

পৃথিবীর সকল ধর্মেই মিশ্র-ধর্মীয় বিবাহের বৈধতার ক্ষেত্রে কম বেশি বিধি-নিষেধ আছেI যদিও, ইসলাম ধর্মে একজন মুসলিম পুরুষের সহিত একজন খ্রিস্টান বা ইহুদী নারীর বিবাহের রীতি থাকলেও, নারীর ক্ষেত্রে খ্রিস্টান বা ইহুদি পুরুষের সহিত বিবাহ সম্পূর্ণ নিষেধI এছাড়াও, ইসলামে মুসলিম নারী বা পুরুষের সহিত অমুসলিম আগুন-পূজারী বা মূর্তি-পূজারী নারী বা পুরুষের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছেI অন্যদিকে, খ্রিস্টান ধর্মে ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্ভব হলেও, অন্য ধর্মালম্বীদের সহিত বিবাহের ক্ষেত্রে কিছুটা বিধিনিষেধ আছেI হিন্দুধর্মে যেকোনো বিবাহের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি-নিষেধই সবচেয়ে বড় বাধাI যদি কোন হিন্দু নারী বা পুরুষ অন্য যেকোনো ধর্মালম্বী নারী বা পুরুষের সহিত মিশ্র-ধর্মীয় বৈবাহিক সম্পর্কে জড়ালে তাদের নিজ নিজ পারিবারিক সম্পর্ক থেকে ত্যাজ্য করা হয়I বৌদ্ধ ও অন্যান্য উপজাতিরা মিশ্র-ধর্মীয় বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো বেশি রক্ষণশীলI বাংলাদেশের প্রচলিত বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ মিশ্র-ধর্মীয় বিবাহ বৈধ করণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেI এই আইনের অধীন বৈবাহিক সম্পর্কের বৈধতা সম্ভবপর হলেও, পরবর্তিতে, নানা প্রতিকূলতার কারণে সম্পর্ক দীর্ঘায়িত হয়নাI কেননা, পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় বৈষম্যের সাথে টিকে থাকাই কষ্ট সাধ্যI

বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এর বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেকটা আইনি জটিলতায় পরিপূর্ণI সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্বামী স্ত্রীকে বিভিন্ন প্রকার পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়I ক্ষেত্রবিশেষে এ সকল সমস্যার পারিবারিকভাবে সমাধান করা অসম্ভব হয়ে পড়েI এই পরিস্থিতিতে বিবাহিত পক্ষদ্বয়কে বাধ্য হয়ে আইনি সমাধানের লক্ষ্যে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়I তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এর প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে , এই আইন অধীনে এমন কিছু বিয়ের বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিবাহপ্রার্থীরা নিজেদেরকে খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, শিখ অথবা জৈন বলে দাবি বা স্বীকার করেন নাI অথবা বিবাহপ্রার্থীদের মধ্যে কেউ হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ অথবা জৈন ধর্মালম্বী বলে স্বীকার করেন এবং যেসকল বিবাহের বৈধতা সন্দেহজনকI বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এর প্রস্তাবনা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে বিবেচনা করা যায়I একইসঙ্গে, এই আইনের ১০ ধারায় বলা হয়েছে, বিবাহ সম্পন্ন বা বৈধ হওয়ার পূর্বে, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ বিবাহ রেজিস্ট্রারের উপস্থিতিতে একটি ঘোষণাপত্র দলিলে তিনজন সাক্ষী, বিবাহ প্রার্থীগণ এবং রেজিস্ট্রার স্বয়ং স্বাক্ষর ও প্রতিস্বাক্ষর করিবেনI উল্লেখ্য যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও মেয়ে উভয়ের বয়স যদি ২১ বছরের নিচে হয়, সেক্ষেত্রে তাদের পিতা অথবা অভিভাবকগণ স্বাক্ষর করিবেনI এছাড়া, বিবাহের শর্ত অনুযায়ী ধারা ২(২) এ উল্লেখ করা আছে যে, ছেলের ক্ষেত্রে ১৮ বছর এবং মেয়ের ক্ষেত্রে ১৪বছর হইতে হবেI যাহা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর পরিপন্থীI যেখানে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর ধারা ২(১) বলা হয়েছে যে “অপ্রাপ্তবয়স্ক” অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো নারীকে বোঝাবেI এছাড়া, বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এর ধারা ১৭ তে বলা হয়েছে, এই আইনের আওতাধীন যেকোন বিয়ের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৮৬৯ প্রযোজ্য হইবেI যদিও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৮৬৯, শুধুমাত্র খ্রিস্টান দম্পতিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্যI উপরন্তু, ইহা থেকে বুঝা যায়, বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২, এর প্রস্তাবনায় ধর্মকে অস্বীকার, বাল্যবিবাহে উৎসাহিত করা এবং বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য অন্য আইনের উপর নির্ভরশীল তাই ত্যাদিমিলে কিছুটা হলেও সন্দেহপূর্ণ, দুর্বল, প্রশ্নবিদ্ধ এবং অসম্পূর্ণ আইন বলে বিবেচনা করা যায়I উল্লেখিত সমস্যাগুলো ছাড়াও এ আইনে স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য, স্ত্রীর ভরণপোষণ, বাচ্চার লালনপালন এবং তত্ত্বাবধান, সম্পত্তির অধিকারসহ অন্যান্য বিষয়গুলো সু-স্পষ্ট করে কিছুই বলা হয়নিI তাছাড়া, আদালতের এখতিয়ারের ক্ষেত্রেও নানারকম সমস্যা দৃশ্যমানI উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এ মামলা পরিচালনা কিংবা আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কে কোন কিছুই উল্লেখ করা হয়নিI কিন্তু পরোক্ষভাবে বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলায় বিচারপ্রার্থীরা বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৮৬৯ এর অধীনস্থ বিজ্ঞ জেলা আদালত অথবা হাইকোর্ট বিভাগে মামলা রুজু করতে পারবেনI তবে এই সকল আদালতে মামলার যাবতীয় খরচ গরীব কিংবা অসহায় বিচার প্রার্থীদের সামর্থের বাইরেI এছাড়াও আইনি জটিলতায় মামলার রায় পেতে অনেক সময় লেগে যায়I

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, বিশেষ বিবাহ একটি মানবাধিকারI জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ৩ এ বলা হয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার সহিত বসবাস করার অধিকার আছেI এ সকল অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকারI তাছাড়া, অনুচ্ছেদ ১৬ অনুযায়ী বলা যায় প্রত্যেক নারী ও পুরুষের বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠন করার যেমন অধিকার আছে, তেমনি বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও সমান অধিকার বিদ্যমান থাকবেI একইসঙ্গে, অনুচ্ছেদ ৭ এ বলা হয়েছে আইন সবার জন্য সমান, এই ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী বলা যায় মানবাধিকার সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাবে নাI তদ্ব্যতীত, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ১২ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ১৭তে বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা পারিবারিক বিষয়ে কেউ হস্তক্ষেপ করলে সেক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবেI

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(২) প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্যকোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে৷পাশাপাশি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২ তে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছেI যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা এবং বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা নিপীড়ন বিলোপ করাকে বুঝাবেI এছাড়াও, অনুচ্ছেদে ৪১(১)(ক) এ আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা-সাপেক্ষে,  প্রত্যেক নাগরিকের যেকোন ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার আছেI অনুচ্ছেদে২৮(১) ও (২) অনুযায়ী ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না। এমনকি, রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার লাভের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বৈষম্য করা যাইবে নাI সংবিধানের অনুচ্ছেদে ৩২ এ বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোন ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবেনা। সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এবং সর্বপ্রকার নিশ্চয়তা প্রদানে কোন প্রকার বৈষম্য করবেনাI এছাড়াও, বাংলাদেশের সংবিধানে উল্লেখ আছে যে, সংবিধানের পরিপন্থী যেকোনো আইন বা আইনের অংশ বিশেষ বাতিলযোগ্য বলে বিবেচিত হইবেI

ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই বাংলাদেশের আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়I নতুন আইন কিংবা পুরনো আইন সংশোধিত হওয়ার পরেও আমরা ব্রিটিশ আইন ব্যবস্থার উপর অদ্যাবধি পুরোপুরি নির্ভরশীলI এমনকি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৪৭ বছর পরেও বিচারিক আদালতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নানা বৈষম্যের শিকারI পারিবারিক আদালতে, বিশেষ বিবাহ সম্পর্কিত মামলা রুজু করার অধিকার না থাকায়, ন্যায়বিচারের জন্য বিচারপ্রার্থীদের বিভিন্ন প্রকার সমস্যায় পড়তে হয় I বাস্তবতার নিরিখে, বিশেষ বিবাহ সম্পর্কিত মামলায় বিচারপ্রার্থীদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিকূল পরিবেশ, আইনি জটিলতা, বিলম্বিত মামলা পরিচালনা ইত্যাদি কারনে মামলার রায় পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়I এছাড়াও, আইনি দুর্বলতার কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসহায় বিচারপ্রার্থীদের আপোষ মীমাংসার জন্য নানা প্রকার চাপ সৃষ্টি যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থীI

বিচারক ও আইনজীবী সমাজ মনে করেন, বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের মধ্যে বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ একটি অতি পুরাতন এবং সনাতন আইনI উপরন্তু, আইনগত দূর্বলতার কারণে অনেক মামলায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়I এছাড়াও,  অপর্যাপ্ত আইন এবং আইনের দুর্বলতার কারণে বিচারিক আদালত এবং আইনজীবীরা বিভিন্ন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হনI বিচারক ও আইনজীবীরা মনে করেন নতুন ধারা সংযোজন এবং আদালতের এখতিয়ার এ কিছুটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে, বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ এর মাধ্যমে আদালতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা যাবেI যদিও অতীতে পারিবারিক আদালতের মামলা করার এখতিয়ার নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিলI পরবর্তীতে, উচ্চ আদালতের এক রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় যে, বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক পারিবারিক আদালতে মামলা করার অধিকার রাখেনI তবে ইহা সত্য যে, পারিবারিক আদালতই উপযুক্ত স্থান, যেখানে পারিবারিক মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আদালত যথাযথ দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা রাখেনI তাছাড়া, পারিবারিক আদালতে মামলার খরচ আনুপাতিক হারে কমI বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ সম্পর্কিত যেকোনো মামলা পরিচালনায় পারিবারিক আদালতের হস্তক্ষেপ হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপI সমাজকর্মীরা মনে করেন, মিশ্র-ধর্মীয় বিবাহ নিয়ে সমাজে নানা রকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়I এক্ষেত্রে, বর্তমান প্রচলিত অন্যান্য বৈবাহিক আইন এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন করা উচিতI আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সংবিধানের আলোকে বর্তমানে প্রচলিত পারিবারিক আইনের সাথে মিল রেখে বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ সংশোধন করা উচিতI তাছাড়া, সরকার চাইলে এই ক্ষেত্রে সমন্বিত পারিবারিক আইন নামেও নতুন আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে পারেI ইসলামধর্ম, হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টানধর্ম, বৌদ্ধধর্মসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ধর্মের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টিকারী আইন সমাজে নানা রকম সামাজিক এবং ধর্মীয় বিশৃংখলার জন্ম দেয়I এমনকি, ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ধর্মকে অসম্মান বা অস্বীকারকরে এরূপ সংবিধান পরিপন্থী কাজে কোন প্রকার উৎসাহ কিংবা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্তকতা অবলম্বন করা উচিতI তাই, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ সংশোধন করা অনস্বীকার্যI

এমতাবস্তায়, সরকারের হস্তক্ষেপ অতীব জরুরী, কেননা রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রদান, সুরক্ষা এবং নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্যI যথাযথ আইনি গবেষণা ও বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২ সংশোধন করা সম্ভবI অনতিবিলম্বে, এই আইন সংশোধন করা প্রয়োজন, পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক অংশ বাতিল, পরস্পরবিরোধী আইনের অংশ বিশেষ সংশোধন এবং আদালতের এখতিয়ার সংশোধন ও নতুন বিধান সংযোজন করতে পারলেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা সম্ভবI সুতরাং, বিশেষ বিবাহ আইন সংশোধিত হলে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবেI

লেখক : পিএইচডি গবেষক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী