সরকারি চাকরিতে অন্যায্য শাস্তির সম্মুখীন হলে করণীয়

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ ৪:১৩ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মশিউর রহমান

অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মশিউর রহমান :

চাকুরী করতে গিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন অভিযোগে বিভাগীয় অন্যায্য শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। এমনি একজন জনাব আমজাদ হোসেন চৌধুরী শারীরিক অসুস্থতার কারনে ছুটির দরখাস্ত অফিস সহকারীর হাতে দিয়ে ছুটি মঞ্জুর না করে কর্মস্থল ত্যাগ করে গ্রামের বাড়ি চলে যান। অননুমোদিতভাবে কাজে অনুপস্থিতির অভিযোগে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রসিডিং শুরু করেন। অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে মিথ্যা নোটিশ জারী দেখিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা একতরফভাবে অভিযোগ প্রমানিত মর্মে প্রতিবেদন পেশ এবং সেমতে কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে আমজাদ হোসেনকে তার চাকুরী হতে অপসারণের আদেশ প্রদান করেন। আবার জনাব আঃ রশিদ একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক পদে যোগদানের ২ বছর পর পত্র মারফত জানতে পারেন তিনিসহ মোট ২২ জন শিক্ষকের চাকুরী প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাতিল ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় তাদের করণীয় কি?

চাকুরী ক্ষেত্রে এছাড়াও বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর, অপসারণ, টাইম স্কেল নিম্নস্তরে নামিয়ে দেয়া, দুর্নীতির অভিযোগ, ছুটি সম্পর্কিত ঘটনায় বিভিন্ন বিভাগীয় আদেশে সরকারী কর্মচারীকে ক্ষুব্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়। আবার নিয়মিত কোন আদালতের ফৌজদারি মামলার রায়ে অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত হলে সরকারী চাকুরীর বেতন ভাতা বা পেনশনের সুবিধা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে হরেক রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। সরকারী কর্মচারীদের এরূপ চাকুরী সংক্রান্ত আদেশে বা সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কর্মচারী সুনির্দিষ্ট কারনে বিভাগীয় কার্যাদি শেষে অথবা সরাসরি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। সরকারী বা বিধিবদ্ধ সংস্থায় নিয়োজিত কর্মচারীদের চাকুরী সংক্রান্ত এ সমস্যা সমাধানে ১৯৮০ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন পাশ হয়। এ আইন ছাড়াও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আরও কিছু প্রতিকার রয়েছে অন্যান্য আইনে।

কারা মোকদ্দমা করতে পারবেন
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী ও বিজিবি এ নিয়োজিত কর্মচারী ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত সকল কর্মচারী এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারী সংস্থার চাকুরীতে নিয়োজিত কোন ব্যাক্তি অভিযোগ দায়ের করতে পারবে। এখানে সংবিধিবদ্ধ সরকারী সংস্থা বলতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রুপালী ব্যাংক, বিডিবিএল, গৃহ ঋণদান সংস্থা, কৃষি ব্যাংক, বিনিয়োগ কর্পোরেশন ও গ্রামীণ ব্যাংককে বুঝাবে।

কি বিচার করবে
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ৩টি বিষয়ের আবেদনের শুনানি এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখে। যেমন- ক) পেনশনের অধিকারের ক্ষেত্রে, খ) চাকুরীর শর্তাবলী সংক্রান্ত কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে এবং গ) চাকুরীতে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে তার বিরুদ্ধে কোন কার্যব্যাবস্থা গৃহীত হলে তার ক্ষেত্রে।

এখানে চাকুরীতে নিয়োজিত ব্যক্তি বলতে যিনি ইতিমধ্যে অবসর প্রাপ্ত হয়েছেন বা চাকুরী হতে বরখাস্ত, অপসারিত, অব্যাহতি প্রাপ্ত হয়েছেন। তবে চাকুরীর শর্তাবলী বা শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে কোন আইনের আওতায় ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের যে সিদ্ধান্ত, আদেশ বা কার্যব্যাবস্থা স্থগিত, পরিবর্তিত বা সংশোধিত হতে পারে সে ব্যাপারে উক্ত কর্তৃপক্ষের কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ের কোন অভিযোগ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে করা যাবে না। কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়ে থাকলে তা থেকে ৬ মাসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে।

আদালতের পরিচিতি
বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন- ১৯৮০ পাশ হয়। ১৯৮২ সালে কার্যকরী হওয়া এ আইনের অধিনে বর্তমানে ২টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। একটি ট্রাইব্যুনাল বগুড়ায় ও অপর ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল ঢাকায় রয়েছে। মোট ২৩টি জেলার মোকদ্দমা নিয়ে বগুড়া ট্রাইব্যুনালের অধিক্ষেত্র। যেমন- বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্দা, নীলফামারী, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও মাগুরা ইত্যাদি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা, যথা- বান্দরবন, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা কোন ট্রাইব্যুনালের অন্তর্ভুক্ত নয়। এক্ষেত্রে উল্লেখিত কর্মচারীদেরকে দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ২০ ধারা মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া বাকি ৩৮টি জেলার মোকদ্দমা ঢাকার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করতে হবে।

প্রতিটি ট্রাইব্যুনাল ১জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। তিনি জেলা জজ সমমর্যাদার হবেন। এ আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে আপীল দায়ের করতে হবে। প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালে ১ জন চেয়ারম্যান এবং ২ জন সদস্য নিয়ে মোট ৩ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে। চেয়ারম্যান হবেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বা বিচারক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতাস¤পন্ন ব্যাক্তি এবং সদস্যগন যুগ্মসচিব বা জেলা জজের নিম্নে নন এমন ব্যক্তি হবেন। আপীল আবেদনের ভিত্তিতে প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনাল ট্রাইব্যুনালের কোন সিদ্ধান্ত বা আদেশ-নির্দেশ, স্থগিত, পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারেন এবং এরূপ আপীল নিষ্পত্তিতে প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

কখন সুপ্রিম কোর্টে যাবেন
সরকারী কর্মচারীগণ তাদের চাকুরী সংক্রান্ত মোকদ্দমার শুধুমাত্র ২টি ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টে যেতে পারেন।

প্রথমত, যদি বিভাগীয় কোন আদেশের ফলে উক্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত কোন মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়ে থাকে এবং এ কারনে তিনি ক্ষুব্ধ হন। মনে রাখতে হবে, সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লংঘিত হলেই কেবল তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধিনে হাইকোর্ট বিভাগে প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে এক্ষেত্রেও বর্তমানে পরিসর ছোট করা হয়েছে। অন্যথায় তাকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে প্রতিকার চাইতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রচারিত রায় যদিও চূড়ান্ত তবুও এক্ষেত্রে যদি কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে থাকেন তবে তিনি সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের আপীল বিভাগে উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের অনুমতি (লিভ টুআপীল) প্রার্থনা করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ যদি আপীলের অনুমতি প্রদান করেন কেবল সেক্ষেত্রেই প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল চলবে, অন্যথায় নয়।

পাদটীকা
পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলাকে এ সকল ট্রাইব্যুনালের অন্তর্ভুক্ত না করা এ আইনের একটি দুর্বলতা। এক্ষেত্রে এ সকল এলাকার এবং ট্রাইব্যুনালের অন্তর্ভুক্ত এলাকার মোকদ্দমার ক্ষেত্রে বিচারকার্য, আপীল কার্য, পদ্ধতিগত কার্যক্রমের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কাম্য নয়। সরকার নতুন প্রজ্ঞাপন জারীর মাধ্যমে এ ত্রুটি দূর করতে পারেন।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট