বার কাউন্সিল পরীক্ষার জন্য তামাদি আইন আয়ত্তের সহজ কৌশল (পর্ব-১)

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১:৪৬ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট প্রিয়াঙ্কা মজুমদার

বাংলাদেশ  বার কাউন্সিলের অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে তামাদি আইন অন্যতম। কম সময়ে সহজ ভাষায় তামাদি আইন আয়ত্ত্ব করার কৌশল নিয়ে লিখেছেন অ্যাডভোকেট প্রিয়াঙ্কা মজুমদার। লেখাটির প্রথম পর্ব পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল।

তামাদি অর্থ:

তামাদি অর্থ বিলুপ্ত বা অচল। তামাদি শব্দটি আরবি ভাষা হতে উদ্ভূত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইনগত দাবী আদায় না করলে উক্ত দাবী নষ্ট হয়েছে বলে গণ্য হবে এটাই তামাদি।

তামাদি আইনে মোকদ্দমা বলতে আপীল বা দরখাস্তকে বোঝাবে না। তামাদি বিধি বিধান দেওয়ানী মূল মোকদ্দমা ও আপীল, রিভিউ, রিভিশন এবং বিভিন্ন দরখাস্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তামাদি আইন সাধারণ ফৌজদারি মূল মামলায় প্রযোজ্য হয়না, তবে আপীল, রিভিশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

তামাদি মেয়াদ গণনা শুরু হয় নালিশের কারন উদ্ভবের দিন থেকে এবং ইংরেজি সাল অনুসারে গণনা করা হয়।

ধারা ভিত্তিক বিশ্লেষণ:

ধারা-৩ : তামাদি আইনের ৪-২৫ ধারা সাপেক্ষে প্রথম তফসিলে বর্ণিত মেয়াদ শেষে দায়েরকৃত দেওয়ানী মামলা খারিজ। অর্থাৎ তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর মামলা, আপীল, দরখাস্ত দায়ের করলে বিবাদী পক্ষ যদি তামাদির প্রশ্ন উত্থাপন নাও করে,  তবু উক্ত মামলা, আপীল বা দরখাস্ত খারিজ বলে বিবেচিত হবে।

ধারা-৪: তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সময় আদালত বন্ধ থাকলে পুনরায় খোলার দিন দায়ের করা যাবে।

ধারা-৫: তামাদি আইনে একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেওয়ানী মূল মামলা, আপীল, রিভিউ, রিভিশন দরখাস্ত দায়ের করতে হয় কিন্তু সময় পার হয়ে গেলে তা বাতিল বলে গণ্য হয়। কিন্তু ৫-১৪ ধারা এ নিয়মের ব্যাতিক্রম। সময় অতিক্রান্ত হলে ৫ ধারার বিধানমতে বিলম্ব মওকুফের আবেদন করতে পারে। তবে আদালতকে সন্তুষ্ট করাতে হবে যে বিলম্ব হওয়ার যথেষ্ট কারন ( মনে রাখুন যথেষ্ট কারন তথ্যের প্রশ্ন) ছিল। যেমন- সরল বিশ্বাসে ভুল, অসুস্থতা, কারাবাস, আদালতের সিদ্ধান্ত, কৌসুলির ভুল, দারিদ্রতা ইত্যাদি।

যে সকল বিচারিক কার্যক্রমে ৫ ধারার বিধান প্রযোজ্যঃ

১) আপীল মামলায়

২) আপীল করার অনুমতি প্রার্থনার দরখাস্তে

৩) রায় পুনঃবিবেচনা বা রিভিউ

৪) রিভিশন

৫) অন্যকোন আইনে কোন দরখাস্ত যেখানে তামাদি আইনের ৫ ধারা প্রযোজ্য করা হয়েছে।

জেনে রাখা ভাল ৫ ধারা কোন মূল মামলা যেমনঃ স্বত্বঘোষণা, চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন, স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি দায়ের করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অত্র ধারায় তামাদি মওকুফের জন্য আবেদন করা আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা।তামাদি মওকুফ করতে আদালত বাধ্য নয়।

মনে রাখুন, তামাদি আইনের ৫ ধারা প্রযোজ্য হয় যেখানে সুনির্দিষ্ট আইন আছে।

ধারা-৬ : তিনটি বিষয়কে আইনগত অপারগতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে,

ক) নাবালকত্ব

খ) উন্মাদ বা মস্তিষ্ক বিকৃতি

গ) জড় বুদ্ধি বা নির্বুদ্ধিতা

উদাহরণ স্বরুপ কেউ নাবালক অবস্থায় উন্মাদ হয়ে পরলে নাবালকত্ব এবং উন্মাদ অবস্থা অবসানের তারিখ হতে তার বিরুদ্ধে তামাদির গণনা আরম্ভ হবে। ৬ ধারা কেবলমাত্র মামলা এবং আবেদনপত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং আবেদনপত্র হতে হবে কেবলমাত্র ডিক্রি কার্যকর করার জন্য।

ধারা-৭ : যৌথদায়

যৌথভাবে অধিকারী কতিপয় ব্যক্তির একজন যদি অক্ষম হয় এবং ঐ একজনকে বাদ দিয়ে যদি দায়িত্ব সম্পাদনের সুযোগ থাকে তাহলে তামাদির মেয়াদ চলতে থাকবে। দায়িত্ব সম্পাদনের কেউ না থাকলে তামাদির মেয়াদ স্থগিত থাকবে।

ধারা-৮ : বিশেষ ব্যতিক্রম

অগ্রক্রয়ের মামলার ক্ষেত্রে ৬ ও ৭ ধারার বিধান প্রযোজ্য হবেনা। আইনগত অক্ষমতা শেষ হওয়ার পর ৩ বছর এর বেশী সময় তামাদি থাকবে না। Legal disability  শেষ হবার ৩বছর পর মামলা দায়ের করলে উক্ত মামলা খারিজ হবে।

ধারা-৯ : তামাদি গণনা একবার আরম্ভ হলে কোন অক্ষমতা বা অপারগতা এই গণনা বন্ধ করতে পারবে না। মনে রাখুন ৯ ধারার ব্যতিক্রম ১২-১৭ ধারা।

ধারা-১২ : আইনগত কার্য ধারায় যে পরিমাণ সময় গণনা থেকে বাদ দিতে হবে,

১) কোন মামলার আপীল বা দরখাস্ত দাখিলে সময়সীমা গণনা কালে যেইদিন থেকে সময় গণনা আরম্ভ হবে সেদিনটি বাদ যাবে।

২) রায় ঘোষণার দিন

৩) ডিক্রি বা রায়ের নকল নিতে যে সময় লাগে সে সময় বাদ

৪) কোন রোয়েদাদ নাকচ করার দরখাস্তের জন্য রোয়েদাদের নকল পেতে যে সময় লাগে তা বাদ।

ধারা-১৩ : বিবাদীর অনুপস্থিতকালীন সময় গণনা থেকে বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ বিবাদী যত দিন বাংলাদেশের বাইরে থাকবে ততদিন তামাদি কাল স্থগিত থাকবে।

ধারা-১৪ : এখতিয়ার বিহীন আদালতে সৎ উদ্দেশ্যে মামলা দায়েরের কারনে বাদীর যে সময় নস্ট হয় উক্ত সময় মামলা দাখিলের তারিখ থেকে মামলা ফেরতের তারিখ পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হবে তা পুনরায় উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়েরের সময় তামাদি মেয়াদ থেকে বাদ যাবে। এক্ষেত্রে ২টি শর্ত পূরণ করতে হবে,

ক) এখতিয়ার বিহীন আদালতে মূল বা আপীল মামলা দায়ের করেছে

খ) উক্ত মামলা সৎ উদ্দেশ্যে দায়ের করেছে।

জেনে রাখুন তামাদি আইনের ১৪ধারা প্রযোজ্য হয় স্যুট/মূল মামলা বা আপীলের ক্ষেত্রে।

ধারা-১৫ : অত্র ধারায় মামলার স্থগিতকালীন সময় বাদ যাবে,

ক) মামলা বা ডিক্রিজারীর দরখাস্তে কার্যক্রম স্থগিতের সময়

খ) নোটিশের সময় বাদ

ধারা-১৬ : ডিক্রিজারীর নিলামে ক্রয়কৃত সম্পদ দখল পাবার জন্য নিলাম ক্রেতার মামলা দায়ের করার সময় নিলাম রদের জন্য দায়েরকৃত কার্যধারা যতদিন চলেছে, তা উক্ত সময়/মেয়াদ গণনা থেকে বাদ দিতে হবে।

ধারা-১৭ : যে ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি জীবিত থাকলে একটি মামলা দায়ের করার অধিকারী হত সেক্ষেত্রে মামলা করার উক্ত অধিকার অর্জনের পূর্বে মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির আইনানুগ প্রতিনিধি তার প্রতিনিধিত্ব করবে।

যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে তার মৃত্যু হলেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যোগ্যতা অর্জন করার সময় হতে তামাদির মেয়াদ গণনা শুরুহবে। (এখানে যোগ্যতা বলতে মামলা পেশ করার ক্ষেত্রে আইনগত ক্ষমতা থাকা বোঝায়।)

এরুপ বৈধ প্রতিনিধির যদি আইনগত অক্ষমতা থাকে তবে তার আইনগত যোগ্যতা অর্জন না করা পর্যন্ত তামাদি স্থগিত থাকবে।

উপরোক্ত কোন কিছুই অগ্রক্রয়ের মামলা বা স্থাবর সম্পত্তি দখল বা বংশগত কোন পদ লাভ সম্পর্কিত মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবেনা।

জেনে রাখুন, সময় বাদ দেয়া আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক।

ধারা-১৮ : প্রতারণা

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রথম যেদিন প্রতারণার কথা জানতে পারবেন, সেদিন থেকে মামলা দায়ের করার জন্য নির্ধারিত তামাদি মেয়াদ আরম্ভ হবে। অর্থাৎ একটি মামলায় প্রতারণা মূলক দলিল প্রণয়নের অভিযোগ করা হলে উক্ত মামলায় তামাদির মেয়াদ গণনা শুরু হবে বাদীর প্রতারণার বিষয়ে অবগত হওয়ার দিন থেকে।

ধারা-১৯ : দায় স্বীকারের ফলাফল

কোন সম্পত্তি বা অধিকার বিষয়ে তামাদির সময় শেষ হওয়ার আগেই লিখিত ও স্বাক্ষরিত ভাবে দায় স্বীকার করলে স্বাক্ষরিত হবার তারিখ থেকে নতুন করে তামাদি গণনা শুরু হয়। তারিখ না থাকলে স্বাক্ষর করার সময় সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়া যেতে পারে কিন্তু বিষয় বস্তু সম্পর্কে মৌখিক সাক্ষ্য দেয়া যাবে না। স্বীকৃতির উপাদান হলঃ

১) যে ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পত্তি বা অধিকার দাবী করা হয় সে ব্যক্তি অথবা তারপক্ষে ক্ষমতা প্রাপ্ত প্রতিনিধি দ্বারা স্বীকৃতিটি স্বাক্ষরিত হতে হবে।

২) মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পূর্বে হতে হবে।

৩) দায় স্বীকার থাকতে হবে

৪) স্বীকৃতিটি সংশ্লিষ্ট অধিকারীর নিকট না করে অন্যকারো কাছে করলেও হবে।

ধারা-২০ : তামাদি সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে কোন ঋণ, দেনা বা দায়ের সুদ আংশিক পরিশোধ করলে সেদিন থেকে তামাদি গণনা শুরু হবে। বন্ধককৃত জমি বন্ধক গ্রহীতার দখলে থাকলে খাজনা বা ফসল প্রাপ্তির রসিদকেও অর্থপরিশোধ বলে ধরা হবে।

ধারা-২২ : যে ক্ষেত্রে মামলা দায়েরের পর কোন বাদী বা বিবাদীকে পক্ষভুক্ত করা হয় , সেই তারিখে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।

ধারা-২৩ : যেক্ষেত্রে অবিরাম চুক্তিভঙ্গ করা হয় সেক্ষেত্রে চুক্তিভঙ্গ বা অন্যায় চলাকালীন সময়ের প্রতি মূহুর্তে নতুন করে তামাদি মেয়াদ অতিবাহিত আরম্ভ হবে।

ধারা-২৬ : সুখাধিকার অর্জন (Acquisition of right to easement)

যেক্ষেত্রে কোন দালানের আলো বা বাতাসের প্রবেশ ও ব্যবহার, কোন পথ, পানি বা জলস্রোতের ব্যবহার কোন ব্যক্তি সুখাধিকার ও অধিকার হিসেবে তাতে স্বত্ত্ব দাবী নিরবিচ্ছিন্নভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে ও অধিকার হিসেবে প্রকাশ্যে ২০ বছর ভোগ করেছে সেক্ষেত্রে উক্ত সুখাধিকার নিরঙ্কুশ ও অলঙ্ঘনীয় অধিকারে পরিণত হবে।

যদি কোন মামলার উক্ত অধিকারের দাবির বিরোধিতা করা হয়, তাহলে সেই মামলার ২০ বছর বলতে মামলা দায়েরের তারিখের অব্যবহিত পূর্ববর্তী ২ বছরের মধ্যে সমাপ্ত ২০ বছর হবে।

সরকারের সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৬০ বছর প্রযোজ্য হবে।

জেনে রাখুন বিবাদীর ব্যবহার জনিত কারনে এ অধিকার সৃষ্টি হয় তাই একে Acquisitive prescription বা অর্জনকারী প্রেসক্রিপশন বলা হয়।

ধারা-২৮: জবরদখল ( Extinguishment of right to property)

অব্যাহতভাবে কোন ব্যক্তি ১২ বছর সময় কাল জমির প্রকৃত মালিকের জ্ঞাতসারে প্রকাশ্যভাবে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জমির বাস্তব ভোগ দখলে থাকলে,  প্রকৃত মালিকের অধিকার বিলুপ্ত হবে এবং দখলদার অধিকার অর্জন করবে।

জেনে রাখুন ২৮ ধারায় প্রতিকার ও অধিকার বিনষ্ট হয়। তাই একে  Extinctive prescription বা বিলোপকারী প্রেসক্রিপশন বলা হয়।

লেখক : আইনজীবী, ফেনী জজ কোর্ট।