খাদ্যে ভেজাল : অপরাধীদের শাস্তির নামে ‘গায়ে হাত বুলানো’ হচ্ছে

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০১৯ ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট কাজী হেলাল উদ্দিন

বাংলাদেশে অন্যান্য বিভিন্ন ভেজাল-নকলের পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। এই বেগতিক অবস্থার মধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে হাইকোর্ট। সরকারের মন্ত্রী- আমলারা খাদ্যে ভেজাল কারীদের মৃত্যুদণ্ড চান। খাদ্যে ভেজালকারীদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট ব্যক্তি বিবৃতি দিয়েছেন। অনেক সামাজিক সংগঠন মানববন্ধন করেছেন। ভেজাল বিরোধী অভিযান চলছে সারাদেশে, প্রতিদিন। কিন্তু ভেজালকারীদের বেপরোয়া মনে হচ্ছে।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছেন। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর অধীনে খাদ্যে ভেজাল ও ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজের বিরুদ্ধে সারাদেশে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর অধীনে অভিযান পরিচালনা করছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯ অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের তফসিল ভুক্ত বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করছে ভেজাল বিরোধী অভিযানে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন আইনের আওতায় এই সকল অভিযান পরিচালনা করায় ও আইনে একই অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদ ও পরিমাণে শাস্তির বিধান থাকায় তাৎক্ষণিক বিচারে একই ধরণের অপরাধের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ বা মেয়াদের সাজা দেওয়া হচ্ছে। যেমন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪১ ধারায় ভেজাল পণ্য বা ঔষধ বিক্রয়ের দণ্ড অনুর্ধ্ব ৩ বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ম্যাজিস্ট্রেট যখন এই আওনের অধীনে শাস্তি দিচ্ছেন তখন এই আইনের সম্পূর্ণ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারছেন। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৭০ ধারায় একটি ব্যাবস্থা রাখা হয়েছে ‘প্রশাসনিক ব্যবস্থা’, ঐ ব্যবস্থায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের “ক্ষমতা প্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা দণ্ড আরোপ না করিয়া শুধু মাত্র জরিমানা আরোপ করিতে পারিবেন”। এতে একই অপরাধের জন্য সাজার পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর তফসিলের ৩ ক্রমিকে ঐ আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী কোন ভেজাল খাদ্য বা খাদ্যপকরণ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন অথবা আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয়ের সাজা অনুর্ধ্ব তিন বৎসর কিন্তু ন্যূনতম এক বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ছয় লক্ষ টাকা কিন্তু অন্যুন তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড বিধান করা হয়েছে। ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫সি ধারায় কেউ যদি ভেজাল খাদ্য বা পানীয় প্রস্তুত করে বা বিক্রয় করে তবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা চৌদ্দ বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড বিধান করা হয়েছে।

তবে গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে যে খবর পাওয়া যায় তাতে ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ সি ধারায় খাদ্য ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর পাওয়া যায় না। সাধারণত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ারের মধ্যে যে শাস্তির বিধান আছে, সেই অনুযায়ী সাজা দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধের জন্য লঘু সাজা দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবন-মরণ নিয়ে যারা খেলছে, সেই খাদ্য ভেজালের মত গুরুতর অপরাধের বিপরীতে অপরাধীদের শাস্তির নামে ‘গায়ে হাত বুলানো’ হচ্ছে। খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে টেকসই ও স্থায়ী অবস্থান নিতে হলে অন্যান্য সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি, খাদ্য ভেজাল বিরোধী আইনগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। খাদ্যের ভেজালের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন গুলিকে সংশোধন করে সমতা ও ন্যায়পর করে তুলতে হবে। পরিশেষে বলি বিচ্যুতি-ত্রুটি থাকলেও ভেজাল বিরোধী অভিযান থামানো যাবেনা। আর একটা বিষয়, আমরা যারা ভেজাল খাচ্ছি, আমাদের সচেতন হতে হবে। ভেজাল বিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। কাউকে ভেজাল করতে দেখলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে হবে। নিজে ঠকলে ভেজালকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সবাই সচেষ্ট হলে আমার আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ত একটা ভেজাল মুক্ত দেশ রেখে যেতে পারবো।

লেখক: কাজী হেলাল উদ্দিন; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।