অন্যায়ভাবে আটক কোন ব্যক্তি বা বস্তু উদ্ধারে সার্চ ওয়ারেন্ট বনাম বাস্তবতা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১ জুন, ২০১৯ ১২:২০ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক: 

কেউ যদি আপনার চোরাই বা অবৈধ মালামাল আটক রাখে কিংবা জাল দলিল করে, বায়নাপত্র নকল করে, ষ্ট্যাম্পে জাল স্বাক্ষর করে কিংবা জোর করে স্বাক্ষর করিয়ে নেয় বা নকল করা যন্ত্রপাতি, সীল মোহর, মুদ্রা, টিকিট, অশ্লীল ছবি বা চিত্র উদ্ধারের প্রয়োজন হয় কিংবা শিশু বাচ্চাকে আটকে রাখে, তাহলে আপনি ফৌজদারী কার্যবিধির ৯৮ ও ক্ষেত্রমতে ১০০ ধারানুসারে তল্লাসী পরোয়ানা জারি করে উপরে বর্ণিত মালামাল উদ্ধার করতে পারেন।

তবে এ মামলাটি করতে হবে জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে, উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলি কারও নিকট মজুদ আছে কিংবা কেউ আটকে রেখেছে, তাহলে তিনি ফৌজদারী কার্যবিধির ৯৮ ও ক্ষেত্রমতে ১০০ ধারানুসারে তল্লাশী পরোয়ানা জারি করে তা উদ্ধারের আদেশ দিতে পারেন। তবে কাউকে না কাউকে অবশ্যই ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পিটিশন আবেদন দিতে হবে।

উদাহরণ : আলম সাহেব তার ব্যবসায়ী পার্টনার রহিম সাহেবকে আটক করো জোর পূর্বক তিনশত টাকার নন জুডিসিয়াল ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। আলম সাহেব উক্ত ষ্ট্যাম্পের উপর যে কোন ধরনের দাবী-দাওয়া লিখে নিয়ে রহিম সাহেবকে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এক্ষেত্রে রহিম সাহেব নিজের ক্ষতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য উক্ত ষ্ট্যাম্প উদ্ধারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পিটিশন মামলা দায়ের করে তর্কিত বস্তু উদ্ধার করতে পারে।

সন্তানের তত্ত্বাবধান নিয়ে বিরোধ হলে সার্চ ওয়ারেন্ট এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়া বা তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণে নাবালক সন্তান তাদের কোনো একজনের তত্ত্বাবধানে থাকলে, ওই শিশুকে অপরজনের তত্ত্বাবধানে নেওয়ার বা কথিত উদ্ধারের দাবিতে বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০০ ধারার বিধান মতে পিটিশন ফাইল করা যায়। ওই পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে নাবালক-নাবালিকার পিতা বা ক্ষেত্রমতো মায়ের তত্ত্বাবধান থেকে নাবালক-নাবালিকাকে উদ্ধারের জন্য বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে পারেন এবং ক্ষেত্রমতো নাবালক-নাবালিকাকে দরখাস্তকারী মা বা ক্ষেত্রমতো পিতার তত্ত্বাবধানে অর্পণ করার আদেশ দিয়ে থাকেন।

এই ধারাটি ইমার্জেন্সির বিধান রেখেছে; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিচারিক মন প্রয়োগ না করেই শুধু দরখাস্তের ভিত্তিতে সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করা যাবে। কাউকে উদ্ধারের জন্য ফৌজদারী কার্যবিধির ১০০ ধারার অধীনে সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে ওই ব্যক্তি অন্যায় রয়েছেন কি-না। ফৌজদারী কার্যবিধির ১০০ ধারা তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন প্রতিপক্ষের অধীনে শিশুর তত্ত্বাবধান থাকাটা অবৈধ হয়। যদি এমন হয় যে, ওই পরিস্থিতিতে শিশুটি প্রতিপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকাটাই অপরাধ, তখনই কেবল ১০০ ধারা আকৃষ্ট হবে। শিশু যদি তার বাবা-মা-দাদা-দাদির তত্ত্বাবধানে থাকে, সেটাকে কোনোভাবেই অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে ১০০ ধারা প্রয়োগ করা যায় না। স্বামীর ঘর ছাড়া স্ত্রী অন্যত্র অবস্থান করলে বা মায়ের সঙ্গে শিশু না থেকে পিতার সঙ্গে অবস্থান করার কারণেই আইনি কোনো অনুমান সৃষ্টি হয় না যে, ওই স্ত্রী বা শিশু অন্যায় আটক রয়েছে।

২ বি সি আর, পৃষ্টা নং ২৩৯ এর একটি সিদ্ধান্ত থেকে জানা যায়, বালিকাটি নাবালিকা কিন্তু সে তার পিতার হেফাজতে যেতে চায় না। সে নাবালিকা হওয়ায় তার কল্যাণ সম্পর্কে সে সামন্যই বোঝে। সুতরাং তার কল্যানের জন্য তাকে তার পিতার হেফাজতে দেয়া উচিৎ। তবে কারও হেফাজতে দেয়ার সময় নাবালিকার কল্যানের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

Ramesh v. Smt Laxmi Bai 1999, Cri LJ 5023 মামলায় ৯ বছরের ছেলে বাবার সঙ্গে বসবাস করাকালীন সময়ে ওই শিশুর মা আদালতে সার্চ ওয়ারেন্ট মামলা আনয়ন করেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, বাবার কাস্টডি হতে মায়ের কাস্টডিতে শিশুকে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সার্চ ওয়ারেন্ট আকৃষ্ট করে না বিধায় ওই মামলা চলতেই পারে না।

Shri Atanu Chakraborty vs The State Of West Bengal & Anr (C.R.R. No. 3870 of 2009) মামলায় ৪ বছরের ছেলে-সন্তানকে বাবার কাছ থেকে উদ্ধারের জন্য মা কর্তৃক সার্চ ওয়ারেন্টের আবেদনের ভিত্তিতে ভারতের বিধাননগরের বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু করে পুলিশকে নির্দেশ দেন ওই নাবালককে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করতে এবং বাবাকেও হাজির থাকতে। সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যু সংক্রান্ত ওই আদেশের বিরুদ্ধে নাবালকের বাবা কলকাতা হাইকোর্টে ক্রিমিনাল রিভিশন দায়ের করেন। ক্রিমিনাল রিভিশন মামলার রায়ে বাবার কাস্টডি থেকে নাবালক ছেলেকে উদ্ধারের জন্য দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সার্চ ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত আদেশ আইনসম্মত নয় বিধায় বাতিল করা হয়। হাইকোর্ট বলেন, বাবার বিরুদ্ধে অন্যায় আটক অভিযোগ আনয়ন করা হয়েছে, যেখানে Hindu Minority and Guardianship Act, ১৯৫৬-এর ৬ ধারা মতে ছেলেসন্তানের ক্ষেত্রে বাবা এবং বাবার পরে মা হলো স্বাভাবিক অভিভাবক। নাবালক ছেলের বয়স ৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে মায়ের কাস্টডিতে থাকার কথা। আদালতের আদেশ লঙ্ঘন না করে থাকলে, ৫ বছরের কম বয়সী নাবালক ছেলে তার বাবার কাস্টডিতে থাকলে তাকে অন্যায় আটক বলা যাবে না। ওই মামলার ঘটনা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত বলেন, বাবার সঙ্গে নাবালক ছেলের বসবাস থাকায় সার্চ ওয়ারেন্ট ইস্যুর প্রশ্নই আসে না। পর্যবেক্ষণে আদালত আরও বলেন, Guardian & Wards Act, 1890 -এর বিধান মতে নাবালকের কাস্টডির জন্য পক্ষদ্বয় উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে যেতে পারেন। দেওয়ানি আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মা ৪ বছরের নাবালক ছেলের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকবেন কি-না, এই প্রশ্নের বিষয়ে উচ্চ আদালত তার সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে বলেন, উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে নাবালকের তত্ত্বাবধান বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নাবালক তার বাবার কাস্টডিতেই থাকবে।

বাংলাদেশে Family Courts Ordinance, ১৯৮৫-এর ৫ ধারা মতে সন্তানের কাস্টডির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের। আর কাস্টডি প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত কী কী বিবেচনা করবেন, সেগুলো Guardians and Wards Act, ১৮৯০-এর ১৭ ধারায় বিস্তারিত বলা রয়েছে। ওই ধারার বিধান মতে, নাবালক-নাবালিকা যে ধর্মীয় অনুশাসনের অধীন সেই অনুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে এবং তার সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনা করে আদালত অভিভাবক নিয়োগ করবেন। নাবালক-নাবালিকার কল্যাণ কী হবে, তা নির্ধারণ হবে নাবালক-নাবালিকার বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র, সামর্থ্য ও নাবালকের সঙ্গে নৈকট্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, মৃত মা-বাবার কোনো ইচ্ছা (যদি থাকে) এবং প্রস্তাবিত অভিভাবক নাবালক-নাবালিকার সম্পত্তির বিষয়ে সম্পর্কযুক্ত কি-না ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে। এতদবিষয়ে নাবালক-নাবালিকার কোনো বুদ্ধিদীপ্ত মতামত থাকলে আদালত সেই মতামতকে প্রাধান্য দেবেন।

যদি নাবালক-নাবালিকা তার বাবার কাস্টডিতে থাকে যিনি স্বাভাবিক অভিভাবকও বটে, সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ানি আদালত হিসেবে কাজ করতে পারে না এবং নাবালক-নাবালিকার কল্যাণ ও উন্নতির জন্য বাবা নাকি মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকা সমীচীন সেই সিদ্ধান্ত বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কোনো ম্যাজিস্ট্রেট দিতে পারেন না। ওই কার্যধারা অবলম্বন করার দায়িত্ব ও এখতিয়ার কেবল পারিবারিক আদালতকেই দেওয়া হয়েছে। শিশু যদি তার মা-বাবার মধ্যে কোনো একজনের সঙ্গে থাকে, আর একজন অন্যজনের কাছ থেকে শিশুকে তার তত্ত্বাবধানে নিতে চায়, তাহলে পারিবারিক আদালতে মোকদ্দমা আনয়ন করতে হবে। সিআরপিসির ১০০ ধারার মাধ্যমে Guardians and Wards Act, ১৮৯০-এর বিধানকে অবলম্বন করা যায় না এবং পারিবারিক আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার বিষয়ে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বিচার করতে পারেন না। মা-বাবা তার সন্তানের তত্ত্বাবধান নিতে চাইলে তাকে ওই সংক্রান্ত আইনে পারিবারিক আদালতে আসতে হবে; কিন্তু নিশ্চয় ওই বিষয়ে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০০ ধারা কোনো প্রতিকার নয়।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইন গ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক দৈনিক ‘ইন্টারন্যাশনাল’। Email : seraj.pramanik@gmail.com