মেয়াদোওীর্ণ চেক দিয়ে ডিসঅনার মামলা করা যায় কিনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০১৯ ৩:৪২ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট এম. এ বাশার আহমেদ

ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে টাকা লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ব্যাংক চেক। অর্থ আদায়ে চেকের আদান প্রদান হয়ে থাকে এর মধ্যে চেকের মেয়াদ বা চেক ডিসঅনার বা অপর্যাপ্ত তহবিল একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ (The Negotiable Instrument Act,1881) এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিসঅনার মামলা সংক্রান্ত ব্যাপারে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন অ্যাডভোকেট এম এ বাশার

পাঠকের জিজ্ঞাসা : মেয়াদোওীর্ণ চেক দিয়ে ১৩৮ ধারার মামলা করা যায় কি না

আইনজীবীর উত্তর : মেয়াদোওীর্ণ চেক বা ‘Stale Cheque’ ব্যাংকিং পরিভাষায় কোনো চেক নয়। ইহা বাসি চেক নামেও পরিচিত। আইনের বিধান অনুযায়ী চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে উহা নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হয় কিন্তু ঐ মেয়াদ উওীর্ণ হয়ে গেলে ব্যাংক ঐ চেক অনার করতে আইনত বাধ্য নয়। তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হলে যেমন মামলা দায়ের করা যায় না ঠিক তেমনি ৬ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে ঐ চেক ব্যাংকে উপস্থাপনের পর ডিস্অনার হলে তার দিয়ে ১৩৮ ধারার মামলা দায়ের করা যায় না।

পাঠকের জিজ্ঞাসা : কতদিনের মধ্যে চেক নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করতে হবে

আইনজীবীর উত্তর : ১৩৮ ধারার (১) উপ ধারার Proviso তে বলা হয়েছে চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে বা এর কার্যকারিতা বিদ্যমান থাকাকালীন সময়ের মধ্যে যেটি আগে ঘটে ঐ সময়ের মধ্যে চেকটি ব্যাংকে দাখিল করতে হবে। আইন অনুযায়ী ৬ মাসের মধ্যে চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করা না হলে এই চেকটি আইনের সুরক্ষা পাওয়া যায় না। কিন্তু চেক গ্রহীতা তার ইচ্ছে মতো যতবার খুশী ততবার চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন বা দাখিল করতে পারবে কিন্তু উহা অবশ্যই ৬ (ছয়) মাস সময়ের মধ্যেই হতে হবে।

সুতরাং বলা যায় যথাযথভাবে স্বাক্ষরকৃত একটি চেক ৬ মাসের মধ্যে নগদায়নের জন্য ব্যাংকে অবশ্যই উপস্থাপন করতে হবে। ছয় মাসের মধ্যে চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন না হলে এর ব্যর্থতায় চেকের ধারক আদালত কোন আইনী সুরক্ষা পাবে না।

পাঠকের জিজ্ঞাসা : ৬ মাসের মধ্যে চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু চেক ডিসঅনার হলে

আইনজীবীর উত্তর : কোন ব্যক্তি যদি কাউকে চেক দেয় এবং চেক দাতার ব্যাংক এ্যাকাউন্টে সেই পরিমানের অর্থ না থাকে তাহলে ব্যাংক অপযার্প্ত তহবিল দেখাবে। মূলত দাতা যে পরিমান অর্থ চেকে উল্লেখ করে প্রদান করেছে সেই পরিমান অর্থ এ্যাকাউন্টে না থাকায় ব্যাংক কর্মকর্তা চেক গ্রহীতাকে সেই পরিমান অর্থ প্রদান করতে ব্যর্থ হয় তখনই মামলার কারণ উদ্ভব হয়।

ব্যাংক কর্তৃক চেকটি ডিসঅনার বা অপর্যাপ্ত তহবিল দেখানোর পর ৩০ দিনের মধ্যে চেক দাতাকে সেই পরিমান অর্থ পরিশোধের আল্টিমেটাম দিয়ে লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করতে হবে। লিগ্যাল নোটিশ প্রদানের দিন থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত চেক গ্রহীতাকে অপেক্ষা করতে হবে। চেক দাতা নোটিশ প্রাপ্তির পর ৩০ দিনের মধ্যে চেক গ্রহীতার বরাবরে চেকের টাকা প্রদানে ব্যর্থ হলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিট্রেট / জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

পাঠকের জিজ্ঞাসা : মামলা করতে বাদিকে কি কি কাগজপত্র সংগ্রহে রাখতে হবে

আইনজীবীর উত্তর : মামলা করতে বাদিকে যেসব কাগজপত্র অবশ্যই (সংগ্রহে রাখতে হবে) আরজির সাথে সংযুক্ত করতে হবে….

* চেক এর ফটোকপি
* চেক ডিসঅনার স্লিপ (ব্যাংক কর্তৃক)
* লিগ্যাল নোটিশ এর কপি
* লিগ্যাল নোটিশের পোস্টাল রশিদের কপি।

এ ধারায় শাস্তির বিধান ১ বছরের মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে।

কিছু সময় এমন হয় যে, কোন ব্যক্তি বলপ্রয়োগ বা চুরি বা প্রতারণার মাধ্যমে চেক গ্রহণ করে চেকের প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে চেক ডিসঅনার মামলা করে থাকে আর তাতে চেকের প্রকৃত মালিক বিভিন্ন রকম হয়রানির স্বীকার হয়ে থাকে, এমতাবস্থায় চেকের মালিক অবশ্যই নিকটস্থ থানায় সাধারন ডায়েরি (জিডি) বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর নিকট চেক উদ্ধারে মামলা করতে পারবে। কেননা হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ ( The Negotiable Instrument Act,1881) এর ৪৩ ধারা মতে, (Valued considerations) বা প্রতিদানবিহীন চেক এর আইনগত কোন ভিত্তি নাই তথা আইনে গ্রহণযোগ্য হবে না।

সাধারণত মামলার পক্ষ বা মামলা চালাবার কোন পদ্ধতিগত ভুল না হলে মামলা দায়েরের ৮ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই রায় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

লেখক : অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, ঢাকা।