আটকে গেছে মাদক আইনের ৫৬ হাজার মামলার কার্যক্রম

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০১৯ ৩:৫১ অপরাহ্ণ

সারাদেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া প্রায় ৫৬ হাজার মামলার কার্যক্রম আটকে গেছে। নতুন আইন পাস হওয়ার পর সাত মাস কেটে গেলেও সরকার আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠন করেনি। কাজ চালাচ্ছিল পুরোনো আইনে। এ বিষয়টি আদালতের নজরে এলে আটকে যায় মামলার কার্যক্রম।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ পাস হয় গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর। ওই আইনের ৪৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের উদ্দেশ্য পূরণে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করতে পারবে। অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ট্রাইব্যুনালের বিচারক হবেন। আর ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশ্লিষ্ট জেলার যেকোনো অতিরিক্ত জেলা জজ বা দায়রা জজকে তাঁর নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব দিতে পারবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এত দিনেও সরকার এই ট্রাইব্যুনাল গঠনে উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি আইনের ধারাটি সংশোধনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সুপারিশও গ্রাহ্য করেনি। সে কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৫ হাজার ৫৫টি, আর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ছিল ২০ হাজার ৭৮৮টি। মামলা সংখ্যার শীর্ষে আছে ঢাকা অঞ্চল, এরপর চট্টগ্রাম। ঢাকা অঞ্চলে (ময়মনসিংহ ছাড়া) স্থগিত হয়েছে ১৮ হাজার ১৯৬টি মামলা আর চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থগিত হয়েছে ৮ হাজার ৫১৮টি মামলা।

এই ধারাটি না মেনে বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ৮ জুলাই সম্প্রতি হাইকোর্টের দৃষ্টিগোচর হয়। ওই দিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮–তে দায়ের হওয়া মামলায় মাসুদুল হক মাসুদ আদালতে জামিন প্রার্থনা করেন। তাঁর কাছ থেকে গত ২২ জানুয়ারি ১২ গ্রাম হেরোইন ও ১০টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধারের অভিযোগে পুলিশ বংশাল থানায় মামলা করেছিল।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রগুলো বলছে, পুলিশ এ মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নেন। তিনি বিচারের জন্য মামলাটি যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত-৩–এ পাঠিয়ে দেন। মাসুদুল হকের জামিন আবেদন নিম্ন আদালতে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। তিনি আবদেন নিয়ে হাইকোর্টে যাওয়ার পরই ধরা পড়ে যে আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল গঠন না করেই বিচার চলছিল। আদালত বলেন, ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কিছু জানেন না। তাঁরা আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। তিনিও এ ব্যাপারে কিছু জানাননি। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমান জননিরাপত্তা বিভাগ এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮–এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে কি না কিংবা এ সময়ের জন্য অন্য কোনো আদালতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কি না, তা জানানোর নির্দেশ দেন।

সাত মাস পরও ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়ার বিষয়টি নজরে আসায় মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের জিরো টলারেন্সের ঘোষণা শুধু ঘোষণাই কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা দোষ দিচ্ছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে।

তবে কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, দেরিতে হলেও আইন পাসের সাড়ে তিন মাসের মাথায় এ বছরের ৩ মার্চ আইন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা থেকে ধারাটি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল সুরক্ষা সেবা বিভাগ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে। বলা হয়েছিল, এ ধারাটির কারণে আইনের প্রয়োগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি সংশোধন করা দরকার। যুক্তি হিসেবে মন্ত্রণালয় জানায়, সারা দেশে বিচারাধীন মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেশি। কিন্তু আইনে তাঁদের এসব মামলা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামালউদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধানে মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে। এর বেশি তিনি বলতে পারবেন না বলে জানান। সূত্র – প্রথম আলো