প্রসঙ্গ ভিআইপি, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বনাম উচ্চ আদালতের নির্দেশনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৪ আগস্ট, ২০১৯ ১২:৫১ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক:

যুগ্ম সচিবের অপেক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ফেরি ছাড়ায় স্কুলছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা রিটের শুনানিতে ভিআইপি প্রটোকল বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নয়, বাকিরা সবাই প্রাতন্ত্রের চাকর। বুধবার (৩১ জুলাই) বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন। এর আগে মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) স্কুলছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সচিব ও ফেরির ম্যানেজারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা চেয়ে একটি রিট দায়ের হয়। উল্লেখ্য, নড়াইল কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তাকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা ভাড়া করা একটি আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির উদ্দেশে রওনা দেন পরিবারের লোকজন। রাত ৮টার দিকে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌ-রুটের মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ভিআইপি ফেরিঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। তখন কুমিল্লা নামে ফেরিটি ঘাটে যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর ম-ল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাবেন বলে ওই ফেরিকে অপেক্ষা করতে ঘাট কর্তৃপক্ষকে বার্তা পাঠানো হয়। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু এর মধ্যে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস। এ ঘটনা তদন্তে সোমবার (২৯ জুলাই) তিনটি কমিটি গঠন করা হয়।

পাঠক এবার আসল কথায় আসি। আমরা সবাই জানি, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। এ কর্তব্যের অংশ হিসেবেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অর্পিত দায়িত্ব সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করতে হয়। এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অতিকথন বা বেফাঁস বক্তব্যের কোনো আইন বা বিধিগত সুযোগ নেই।

সংবিধানের প্রথম ভাগে ৭-এর (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’

১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন। আমাদের সংবিধানকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক সংবিধান বলে আখ্যায়িত করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একজন বাঙালি হিসেবে গর্ব করার মতো বিষয়। আমাদের সংবিধানের ছত্রে ছত্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব, সুপ্রিমেসি এবং অধিকার উচ্চকিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও এ দেশে জনগণের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরং পাবলিক সার্ভেন্টদের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কিছু মানুষের প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় সংবিধানের মূল চেতনা অব্যাহতভাবে লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে।

প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণ প্রদত্ত ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র চলে। আমরা যারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে বেতন, ভাতা, যানবাহন, আবাসনসহ অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্ত হই, তা জনগণের প্রদত্ত করের টাকায়। যে টাকা বেতন-ভাতা পাই, সেই টাকায় পতিতার সাবান কেনার সময় প্রদত্ত ভ্যাটের টাকাও মিশ্রিত আছে। সুইপার, রিকশাচালক, দিনমজুর, কাজের বুয়াসহ সবার প্রদত্ত ট্যাক্স-ভ্যাটের টাকায় প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রদানমন্ত্রী, বিচারপতি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সরকারি ভাতা-সহায়তাপ্রাপ্তরা বেতন-ভাতা ও সুবিধাদি পান। সংবিধান, আইন, নৈতিকতা কোনো দিক দিয়েই কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি কর্মকর্তা লাট বাহাদুর নন। বেতন নেব জনগণের টাকায়, শপথ নেব সংবিধান সমুন্নত রাখার, অঙ্গীকার করব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে কাজ করার; কিন্তু জনগণ স্যার না ডাকলে রুষ্ট হব, জনগণকে অবহেলা করব এটি হতে পারে না। এই অবস্থান স্ববিরোধী।

নব্বইয়ের দশকেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রকৃত দায়িত্বের প্রয়োজন ছাড়া সংবাদ মাধ্যমে বা জনসম্মুখে কোনো বক্তব্য রাখার নজির খুব একটা ছিল না। ওই সময়ে প্রকৃত দায়িত্বের প্রয়োজনে সংবাদমাধ্যম বা জনসম্মুখে বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রেও তাদের পরিমিতবোধ ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সংবাদমাধ্যমে বা জনসম্মুখে দায়িত্বের প্রয়োজন ছাড়াও বক্তব্য প্রদান শুরু হয়েছে। সে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিকথন ও বেফাঁস বক্তব্য। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আচরণবিধির প্রয়োগ তেমন একটা না থাকায় বর্তমানে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে জনসম্মুখে ও সংবাদমাধ্যমে অহরহ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক সময় অনেকে অতিকথন ও বেফাঁস মন্তব্য অর্থাৎ যে বক্তব্য কাম্য নয় এবং পেশার মানের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বক্তব্যও রাখছেন, যা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে এবং জনমনে আতংক বা বিভ্রান্তি বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যে জন্য প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী জনসম্মুখে বা সংবাদমাধ্যমে আদৌ কোনো বক্তব্য রাখতে পারে কি-না অথবা পারলেও কী ধরনের বক্তব্য রাখতে পারেন বা এরূপ বক্তব্যের পরিধি কতটুকু এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার।

সংবিধানের ৩৯ (২) বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক্্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য বাধানিষেধের অতিরিক্ত চাকরি সংক্রান্ত বিধিবিধানের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ সাপেক্ষেই প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী তার বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। সুতরাং দেখা যায়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাদের জন্য প্রযোজ্য সরকারি কার্যবিধি ও আচরণবিধির বিধান উপেক্ষা করে বাকস্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন না।

আচরণবিধি অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী রাজনৈতিক কোনো কর্মকা-ে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হতে পারেন না। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কর্তৃক কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান রাজনৈতিক কর্মকা-েরই অংশ হিসেবে বিবেচিত। কেননা সরকারের রাজনৈতিক মুখপাত্রের কাজ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর দায়িত্বের অংশ নয়। যার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর কোনো বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়ভূক্ত হলে তা আচরণবিধি পরিপন্থী। আচরণবিধির পরিপন্থী যে কোনো কাজ অসদাচরণ হিসেবে গণ্য এবং অসদাচরণের জন্য চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদ- প্রয়োগযোগ্য।

অথচ আমাদের সিস্টেম প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীকে পাবলিক সার্ভেন্টের পরিবর্তে ‘লর্ড অব পাবলিক’ বানিয়েছে। যোগদানের আগ মুহূর্তে তিনি দেশ, সংবিধান ও জনস্বার্থের প্রতি চির-আনুগত্যের অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু সিস্টেম তাঁকে জনসেবকের পরিবর্তে জনশাসকে পরিণত করেছে। এই মানসিকতা শুধু পাবলিক সার্ভিসে নয়, এই রোগ সর্বব্যাপী। আমরা যেকোনো সবল ব্যক্তি অপেক্ষাকৃত দুর্বলের ওপর প্রভুত্ব করা বা অযথা হয়রানি, অবজ্ঞা, অবহেলা করার মানসিক রোগাক্রান্ত। নিজের থেকে উঁচু স্তরে আপ্রান তৈলমর্দন এবং নিম্নে অবস্থানকারীদের প্রতি উল্টা আচরণ বাঙালির অস্থিমজ্জায় মিশে আছে। রক্তের উপাদানগুলোর সঙ্গে মিশে আছে যুগ-যুগান্তরব্যাপী।

আবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত অনেক জনপ্রতিনিধিকে নিয়োগকর্তা জনগণ স্যার না বললে বিরক্ত হতে দেখা যায়। শুধু নির্বাচিত বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, আমরা যারা জীবনে এক দিনের জন্য সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যা লাভ করেছি, আমরাও দায় এড়াতে পারি না। প্রতিটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পাবলিক মানি বিনিয়োগ হয়। আমাদের শিক্ষা লাভের পেছনে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ যেহেতু নিয়োজিত হয়, সেহেতু আমরা যত বড় বিদ্বানই হই, আমাদের জন্য অর্থ প্রদানকারী জনগণ কখনোই নগণ্য নয়।

রাষ্ট্রপতি থেকে ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য পর্যন্ত প্রত্যেক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদমর্যাদায় নিযুক্ত সবাইকে শপথ গ্রহণ করতে হয়। সিভিল সার্ভিসে যোগদানের আগ মুহূর্তে সবাইকে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে তা দাখিল করতে হয়। সামরিক বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অঙ্গীকারনামার বাইরেও পাসিং আউট প্যারেডে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ সামনে নিয়ে শপথ করেন।

প্রজাতন্ত্রের সুবিধাজনক পদে বসে জনগণের ওপর সুপ্রিমেসি করার প্রাাগৈতিহাসিক প্রভুত্ববাদী মানসিকতার অবসান হোক। প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক কর্মচারী সরকারের কার্যবিধিমালা ও আচরণবিধি অনুসরণ করবে এবং সরকারও আচরণবিধির যথাযথ প্রয়োগ করবে, এটাই হোক জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email: seraj.pramanik@gmail.com,