হটলাইন ৩৩৩, বন্ধ হচ্ছে বাল্যবিবাহ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
হটলাইন ৩৩৩

১২ জুলাই। বরপক্ষকে আপ্যায়ন করা শেষ। বিয়ে পড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন কাজি। বর চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ২০ বছর বয়সী এক তরুণ। আর কনে একই উপজেলার দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। তবে শিক্ষার্থীর এক শুভাকাঙ্ক্ষী ফোন করেন ৩৩৩ নম্বরে। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মমতা আফরিন ফরিদগঞ্জ থানা-পুলিশের কয়েকজন সদস্য নিয়ে কনের বাড়িতে উপস্থিত। ভ্রাম্যমাণ আদালত কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে কনের বাবাকে ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে দেবেন না, মর্মে মুচলেকা দেন বাবা।

গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরের হিমাইতপুর, মালঞ্চি ও মালিগাছা ইউনিয়নে তিনটি বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি চলছিল। ৩৩৩ নম্বরে তা জানানো হলে পাবনার জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের নির্দেশে সদর উপজেলার ইউএনও জয়নাল আবেদীনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাল্যবিবাহগুলো বন্ধ হয়। জয়নাল আবেদীন জানালেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তিনটি বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত সাতজনকে গ্রেপ্তার করে দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।

বাল্যবিবাহ বন্ধে গত বছরের ১২ এপ্রিল চালু হয়েছে সরকারি হটলাইন নম্বর ৩৩৩। এই নম্বরে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে বাল্যবিবাহের তথ্য জানানো যায়। তথ্য পাওয়ার পর হটলাইনটির সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি ওই তথ্য সংশ্লিষ্ট থানা বা জেলা প্রশাসনকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন। তারপর স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ত্বরিত ব্যবস্থা নেন।

হটলাইন ৩৩৩ ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের কাজ করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, ইউএসএইড, ইনএনডিপি পরিচালিত এটুআই প্রকল্প। এটুআই প্রকল্পের ই–সার্ভিস স্পেশালিস্ট মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বললেন, সারা দেশ থেকে বাল্যবিবাহ বন্ধে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩৩৩ নম্বরে ফোন বা খুদে বার্তা এসেছে ৩ হাজার ৪৫৬টি। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে ২ হাজার ৫৮২টি। বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে পাবনা, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে।

হটলাইনে অভিযোগ আসার পরও সব বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসকেরা জানালেন, অনেক সময় কর্মকর্তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হয়, ততক্ষণে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধার কারণেও বিয়ে ঠেকানো যায় না।

হটলাইন নম্বরটি চালু হওয়াতে বাল্যবিবাহ ঠেকানো অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাবনার সদর উপজেলার ইউএনও জয়নাল আবেদীন বললেন, আগে উপজেলায় দিনে ৮ থেকে ১০টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটত। ৩৩৩ নম্বর চালু হওয়ার পর থেকে বাল্যবিবাহের তথ্যগুলো জানা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমে এসেছে। বর্তমানে সপ্তাহে একটি বা দুটি বাল্যবিবাহের খবর আসে।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বললেন, হটলাইনটির মাধ্যমে গত এক বছরে তাঁর তত্ত্বাবধানে শতাধিক বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। বাল্যবিবাহের পেছনে অভিভাবকদের পাশাপাশি স্থানীয় নোটারি পাবলিক ও কাজিদের অসহযোগিতাকে দায়ী করেন সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী।

পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বললেন, ৩৩৩ হটলাইন চালু হওয়ার পর থেকে বাল্যবিবাহের শিকার হতে যাওয়া শিক্ষার্থীর সহপাঠী, আত্মীয় বা প্রতিবেশীরাই নিজ দায়িত্বে তথ্য জানিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি মধ্যরাতেও বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। মানুষ আরও সচেতন হলে বাল্যবিবাহ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। সূত্র – প্রথম আলো