কিশোরগঞ্জ আদালতে আইনজীবীর হাতে হাতকড়া, বিচারক অবরুদ্ধ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১১:১৭ অপরাহ্ণ

কিশোরগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার নথি দেখতে গিয়ে বিচারকের নির্দেশে সিনিয়র এক আইনজীবীকে চোর বলে হাতকড়া পরিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখাকে কেন্দ্র করে আজ বুধবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে পুরো জজ কোর্টে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ঘটনা জানাজানি হলে শত-শত আইনজীবী বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা এজলাসে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে বিচারককে আধাঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।

আইনজীবীদের শান্ত করতে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণসহ বিশৃংখল পরিস্থিতি এড়াতে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ শতাধিক পুলিশ জজ কোর্টে অবস্থান নেন। এরপরও জজ কোর্টে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এ অপ্রীতিকর ঘটনার প্রতিবাদে শত শত আইনজীবীর উপস্থিতিতে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ তাৎক্ষণিকভাবে এক সভায় মিলিত হয়ে বিচারকের চাকুরিচ্যুত করাসহ কয়েক দফা দাবি উত্থাপন ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আজ দুপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদালত চলাকালীন সিনিয়র আইনজীবী মো. ইকবাল হোসেন বিপ্লব একটি মামলার নথি দেখার জন্য বেঞ্চ সহকারীকে বললে বেঞ্চ সহকারী মামলার নথিটি আইনজীবী বিপ্লবকে প্রদান করেন। অ্যাডভোকেট বিপ্লব মামলার নথিটি নিয়ে আদালতের বারান্দায় নথিটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখার সময় মামলার ডাক পড়ে।

এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা জজ পদমর্যাদার) মোহাম্মদ সোলাইমান বারান্দা থেকে নথিটি আনতে দেখে ক্ষিপ্ত হন। ট্রাইব্যুালের বিচারক আইনজীবী বিপ্লবকে বলেন, আপনি কোর্ট থেকে নথি চুরি করে বারান্দায় নিয়ে গেছেন। তখন আইনজীবী তা অস্বীকার করলে বিচারক জোর দিয়ে বলেন, না আপনি নথিটি চুরি করেছেন। এ অবস্থায় বিচারক আইনজীবী বিপ্লবকে আটকের নির্দেশ দেন পুলিশকে। নির্দেশ পেয়ে পুলিশ আইনজীবী বিপ্লবকে তাৎক্ষণিক আটক করে তাঁর হাতে হাতকড়া পরিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখে।

এ ঘটনার পরপরই বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল আলমসহ উপস্থিত বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট বিপ্লবকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও বিচারক তাঁদের অনুরোধ রাখেননি।

এ খবর আইনজীবীদের মধ্যে মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে আইনজীবীরা আদালত বর্জন করে ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মিয়া মোহাম্মদ ফেরদৌসের নেতৃত্বে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারকের এজলাসে ছুটে গিয়ে আইনজীবী বিপ্লবকে ছাড়িয়ে নেয়।

এ সময় উত্তেজিত আইনজীবীরা এজলাসে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং বিচারক মো. সোলায়মানকে আধাঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন। আইনজীবীরা বিচারকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শ্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে আদালতের সকল পর্যায়ের কার্যক্রমে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ছুটে এসে ওই বিচারককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

এ ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সদস্যরা জেলা আইনজীবী সমিতিতে তাৎক্ষণিক এক প্রতিবাদ সভা করেন। সভায় আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তাদের শান্ত করতে সিনিয়র আইনজীবীরা অনুরোধ করেন।

পরে সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল আলম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ সোলাইমানকে অবিলম্বে চাকুরিচ্যুত করা, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করা, দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানির মামলা দায়ের করা, কিশোরগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর কোর্ট বর্জন করাসহ উক্ত কোর্টের দায়িত্ব ট্রাইব্যুনাল-১ এর কাছে হস্তান্তর করার দাবির ঘোষণা দেন। তাকে দ্রুত চাকুরিচ্যুত করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রীকে সার্বিক বিষয়টি অবহিত করারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে আইনজীবীরা কিছুটা শান্ত হন।

এ ঘোষণা পাওয়ার পরও কোর্ট এলাকায় বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও এক প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়ে দাবি বস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোর্টের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে বলে ঘোষণা দেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, আমার আইন পেশার ৩৭ বছরে এমন নজিরবিহীন ঘটনা দেখেনি। কোর্ট চলাকালে এজলাসে আইনজীবীকে হ্যান্ডকাপ পরানো দেশের সকল আইনজীবীর প্রতি চরম অবমাননা। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই এই জজকে অবিলম্বে চাকুরিচ্যুত করাসহ উত্থাপিত দাবিগুলো পুরণের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল আলম সহিদ জানান, এমন ঘটনা আমার পেশাগত জীবনে দেখিনি। পরিস্থিতি দেখে আমি বিচারককে অনুরোধ করেছি নিবৃত্ত হওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি কারও কথায় কর্ণপাত করেননি।

এ ব্যাপারে নারী ও শিশু নির্যাতন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ সোলাইমানের সাথে একাধিবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাথে কথা বলা যায়নি। জজ কোর্টের দুইদিকের কলাপসেবল গেইট লাগিয়ে দেওয়ায় ভিতরে ঢোকা যায়নি। তবে, জজ কোর্টের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারির সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা জজ কোর্টের নাজির মো. সেলিম খান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল আদালত-২ এ আইনজীবীর সাথে কোর্টের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সবাই তা দেখেছেন। আমার অবস্থান থেকে আমি কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য করতে পারছি না।