চেক ডিজঅনারের মামলায় আসামীপক্ষের আত্মরক্ষার অধিকার

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ২:০৪ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সাইমুল ইসলাম রাব্বি

সাইমুল ইসলাম রাব্বি:

বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন প্রয়োজনে দায় বা ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে চেকের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু অনেক সময় চেকে উল্লেখিত অংকের টাকা চেক প্রদানকারীর ব্যাংক একাউন্টে না থাকায় ব্যাংকের পক্ষে টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না তখন ব্যাংক আইন অনুযায়ী চেকটি ডিজঅনার করে থাকে। আর ডিজঅনারকৃত চেক থেকে এনআইঅ্যাক্ট এর মামলার উদ্ভব হয়। চেক ডিজঅনারের ক্ষেত্রে ধরেই নেয়া হয় চেক প্রদানকারী শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

দেশের আদালতসমূহে প্রচুর এনআইঅ্যাক্টের অধীনে মামলা চলমান আছে। এই আইনে প্রায় প্রতিদিনই নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। এসব দেখে সহজে অনুমান করা যায় দৈনন্দিন আর্থিক কর্মকান্ডে কি পরিমাণে চেক এর অপব্যবহার হচ্ছে। আর এই সুযোগে একটি শ্রেণী গড়ে উঠেছে যারা সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করে অর্থ উপার্জনের নেশায় মেতেছে। গ্রাম অঞ্চলে ও শহর গুলোতে এক শ্রেণীর মানুষ এনজিও এর নামে সমিতি খুলে বসেছে। কাগজে কলমে এরা সমবায় সমিতির অনুমোদন নিয়ে বেআইনি ভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, অধিক মুনফার আশায় অনেকে ব্যক্তি পর্যায়েও এ ব্যবসায় জড়িয়ে পরেছেন। এসব সমিতি বা ব্যক্তি থেকে সধারণত খেটে খাওয়া মধ্যবিত্ত মানুষ যাদের টাকার একান্তই প্রয়োজন ও খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষ চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছে আর ঋণের জামানত স্বরূপ এক বা একাধিক ব্ল্যাংক চেক দিচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেটি দেখা যায় গ্রাহক ঋণের টাকার সমমান বা তার বেশি টাকা পরিশোধ করে দিয়েছে কিন্তু আসল ঋণের টাকা অপরিশোধিত থেকে যাচ্ছে। ঋণ দাতারাও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও কাঙ্খিত মুনফা না পেয়ে তাদের কাছে গচ্ছিত ব্ল্যাংক চেকে নিজেদের ইচ্ছে মত টাকার অংক বসিয়ে ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনার করিয়ে মামলা করছে। একবার চেকের মামলা হলে আসামীর আর রক্ষা নেই, হয় টাকা পরিশোধ করতে হবে নতুবা জেল। আর এই অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে চেকের মামলায় সাধারণ মানুষ সর্বশান্ত হচ্ছে।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দুটি বাস্তব ঘটনার কথা বলা যাক-

ঘটনা-১: সেলিম মল্লিক (ছদ্মনাম ) ৬০ বছর বয়স্ক একজন বৃদ্ধ পেশায় দিনমজুর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পরলেও মাঝে মধ্যে দৈনিক মজুরীতে কাজ করে কোন রকম দু’বেলা নিজের পেট চালান, গ্রামীণ সাদাসিধে মানুষ বলতে যা বুঝায় সেলিম মল্লিক তেমনই একজন মানুষ। বছর পাঁচেক আগে টাকার প্রয়োজনে এলাকার এক মহাজনের থেকে চড়া সুদে ১০ হাজার টাকা কর্য (ধার) করেন। এই পাঁচ বছরে দশ হাজার টাকার কয়েক গুণ সুদ পরিশোধ করা হলেও এখনও মহাজনের আসল টাকা পরিশোধ করতে পারেননি বৃদ্ধ সেলিম। একদিকে এই বৃদ্ধ বয়সে পেটের জ্বালা অপরদিকে কর্যের টাকা পরিশোধের জন্য মাহাজনের নানা হুমকি ধমকি। এক পর্যায়ে ঋণদাতা মহাজন পরামর্শ দিলেন বরগুনা শহরে ব্যাংক আছে সেখানে একাউন্ট খুললে খুব সহজেই ঋণ পাওয়া যাবে আর ঋণের টাকা থেকে মহাজনের টাকা পরিশোধ করে দিতে পারবে আর নিজেরও কিছু থাকবে। কোন উপায়ন্ত না দেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন ব্যাংক একাউন্ট খুলতে। সেলিমকে যত্ন করে ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়ে মহাজন সুকৌশলে রেখে দিলেন বেশ ক’টি স্বাক্ষরিত ব্ল্যাংক চেক। এর বেশ কিছু দিন পর সেলিম মল্লিক এর বাড়িতে আদালত থেকে নোটিশ গেল, সেদিন আর টেনশনে সেলিমের ঘুম নেই শুধু একটিই চিন্তা এমন কি করেছেন যাতে আদালত থেকে নোটিশ এসেছে কিছুতেই কোন হিসাব মিলাতে পারছিলেন না! পরের দিন বরগুনা শহরে এসে অনেক ভেবেচিন্তে উকিল চেম্বারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন তার নামে ১০ লক্ষ টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা হয়েছে! অথচ তার মাথা গোঁজার ছাপড়া ঘরখানার দামই সর্বসাকুল্যে ১ লক্ষ টাকা হবে না। সেলিম মল্লিকের মামলা বর্তমানে আদালতে চলমান আছে, হয়তো এই মামলায় তার সাজাও হবে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালতেরও তেমন কিছু করার নেই তাদের হাতও যে আইনে বাঁধা, জজ সাহেবরা অনেক সময় প্রকৃত ঘটনা অনুধাবন করতে পারলেও আসামীর পক্ষে কোন ভাল ডিফেন্স না থাকায় তাঁরও কিছু করার থাকে না।

ঘটনা-২: তরুণ একজন উদ্যোক্তা মোঃ রুবেল (ছদ্ম নাম) অল্প পুঁজিতে ছোটখাট একটা ব্যবসা করে এক মেয়ে, স্ত্রী, পরিবার নিয়ে বেশ ভালোই আছেন। রুবেলের মাথায় সব সময়ই চিন্তা বাচ্চা বড় হচ্ছে কিভাবে ব্যবসার পরিধি আরেকটু বাড়িয়ে উপার্জন একটু বৃদ্ধি করা যায়। আর সেই পরিকল্পনা থেকেই দেশের একটি নামীদামি ব্যাংকে এসএমই লোনের জন্য আবেদন করলেন, আর সহজেই পেয়ে গেলেন ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার একটি ব্যাংক লোন। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকে লোনের জামানত স্বরূপ দিলেন বেশ কটি ব্ল্যাংক চেক। ব্যাংক লোণ নেওয়ার পর থেকে রুবেল নিয়মিতই লোণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করে আসছিলেন কিন্তু হঠাৎ দেখা দিল ব্যবসায় মন্দা ফলে যা হবার তাই হলো লোণের দু/তিনটি কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংক তাঁদের কাছে থাকা চেক ডিজঅনার করে আদালতে রুবেলের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ লক্ষ টাকার মামলা ঠুকে দিল। মামলায় বিচার শেষে রুবেলের ১ বছর কারাদন্ড ও চেক বর্ণিত প্রায় ৪ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডের রায় হলো। আর মামলার রায়ে সাজার আদেশ হওয়ার সাথে সাথেই সোজা জেলখানায় জায়গা হল রুবেলের। কোন উপায়য়ন্ত না দেখে রুবেলের পরিবার তাদের চাষাবাদের জমি বিক্রি করে আইন অনুযায়ী চেকে বর্ণিত টাকার অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করলেন। হাইকোর্টের উকিল সাহেব আবার মক্কেলের প্রতি খুব দরদী, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে আনলেন ব্যাংকের অনেক তথ্য, দেখা গেল ব্যাংক কর্তৃক মামলা দায়েরের আগেই সাজাপ্রাপ্ত আসামী রুবেল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার লোণের বিপরীতে মামলার আগেই ব্যাংককে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। সব হিসেব করে দেখা গেল লোণের কিস্তি বাবদ পরিশোধ ও আপীলের সময় চেকে বর্ণিত অর্থদন্ডের টাকার অর্ধেক টাকা পরিশোধ করেছেন অর্থাৎ ব্যাংকের দাবীর চেয়েও বেশি টাকা পরিশোধ হয়েছে রুবেলের। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ মামলাটি সার্বিক বিবেচনায় নতুন করে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ ও আসামীর লোণ হিসাবটি গননার জন্য নির্দেশনা দিয়ে বিচারিক আদালতে রিমান্ডে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারপরও ব্যাংক তাঁর চেকে দাবীকৃত টাকার বিষয়ে অনড়। বর্তমানেও মামলাটি বিচারিক আদালতে চলমান রয়েছে কিন্তু এখনও রুবেলকে ন্যায় বিচার পেতে অনেকটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

প্রচলিত আইনে চেক ডিজনারের মামলায় আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থন করে নির্দোষ প্রমানিত হওয়ার সুযোগ খুবই কম। বাংলাদেশে প্রচলিত ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি আইনে বলা হয়েছে, অপরাধ সংগঠনের ক্ষেত্রে অপরাধীর দোষী মন থাকতে হবে অর্থাৎ অপরাধ সংগঠনের অভিপ্রায় থাকতে হবে। উপরের ঘটনা দু’টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বৃদ্ধ সেলিম ও রুবেল উভয়ই তাদের লোণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করে আসছিলেন সুতরাং বলা যায় যে, তাদের উভয়েরই অপরাধ করার জন্য দোষী বা অপরাধী মন ছিল না। যদি অপরাধী মন থাকতো তবে তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতেন না, যেহেতু তাঁদের অপরাধী মন ছিল না তাই তারা কোন অপরাধও করেননি তবুও আইনের ম্যারপ্যাঁচে তারা দোষী সাব্যস্ত হয়ে হয়েছেন। তাই চেক ডিজঅনারের মামলায় শুরু থেকেই আসামী পক্ষের খুবই সতর্কতার সাথে মামলা পরিচালনা করতে হবে। আসামীর পক্ষে যদি কোন ডিফেন্স থাকে তবে তা আদালতে সাফাই সাক্ষ্য দিয়ে মামলার নথিতে নিয়ে আসতে হবে, আসামীকে মামলায় নিরাপরাধ প্রমানে সুবিধা দিবে সে সংক্রান্ত কোন কাগজপত্র থাকলে বিজ্ঞ আদালতে তা জমা দিতে হবে এছাড়াও আসামী যে অপরাধ করেনি সে সম্পর্কিত অন্য কোন প্রমান থাকলে আদালতের সামনে তুলে ধরতে হবে। আসামী তার পক্ষের সাক্ষ্য প্রমান আদালতে উপস্থাপন করে চেকডিজনারের মিথ্যা মামলায় খালাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর এক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের রেফারেন্সও রয়েছে। বিভিন্ন মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত মামলায় তাঁদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। মোঃ শফিকুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ মামলায় মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বলেছেন—“ হাইকোর্ট বিভাগ এই অভিমত পোষণ করেন যে, আসামী যাতে সব অবস্থায় বিচারে একটি অর্থবহ প্রতিরক্ষা পেতে পারে সে জন্য ঐ জাতীয় চেকটি ইস্যুকারী কর্তৃক চেকটি ইস্যু করার কারন বা হেতু সংক্রান্ত খুঁটিনাটি নালিসি আবেদনে থাকতে হবে। যা হোক নালিসি আবেদনের মধ্যে এই জাতীয় বিবরন না থাকলে এনআইঅ্যাক্ট অনুযায়ী তাহার আওতায় উহার ৪, ৬, ৮, ৯, ৪৩, ৫৮, ও ১১৮ ধারায় আসামী কর্তৃক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহনের ব্যাপারে তেমন কোন বাঁধা নিষেধ নেই এবং বিচারিক আদালত বিচার কাজ পরিচালনাকালে এ জাতীয় ডিফেন্স গ্রহনে আসামীকে সুযোগ দিবেন”। মহামান্য উচ্চ আদালতের এই রায়টি চেক ডিজঅনারের মামলায় আসামীর রক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

লেখক: আইনজীবী; জেলা জজ আদালত, বরগুনা। ই-মেইল: saimul.rabbi@gmail.com