প্রবেসন: মনে কত প্রশ্ন জাগে?- চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জিয়াউর রহমান

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১ এপ্রিল, ২০২০ ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

মোঃ জিয়াউর রহমান:

ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে ঘটনাটার সূত্রপাত- ছাগলে লাউ গাছ খেয়ে ফেলেছে, এই নিয়ে মায়ের সাথে চাচীর ঝগড়া, চাচীর মুখে খৈ ফোটার মত গালি! মায়ের এ অপমান কলেজ পড়ুয়া ছেলের সহ্য হলো না। হাতের কাছেই একটা লাঠিমত কিছু ছিল, তাই তুলে নিয়ে দিলো চাচীর মাথায় সজোরে একটা বাড়ি। তারপর হাসপাতাল, থানা পুলিশ, কোর্ট! চাচীও নাছোড়বান্দা, উচিত শিক্ষা দেওয়ার এটাই সুযোগ, আপোষ না করে মামলা চালাতে থাকলো। দু’পক্ষই কোর্টে আসতে থাকলো এবং একসময় মামলা শেষ হলো। কোর্ট রায় ঘোষণার দিন বললো, ছেলেটি তার চাচীকে আঘাত করেছে, এই অভিযোগ প্রমানিত, তবে ছেলেটির বয়স, মানসিক অবস্থা ও ভবিষ্যত বিবেচনায় শাস্তি না দিয়ে প্রবেসন আদেশ দিচ্ছে। শর্ত হলো আর এমন অপরাধ করা যাবে না, আর প্রবেসন সময়ে পড়তে হবে মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা ২টি বই, দেখতে হবে ২ টি সিনেমা ও লাগাতে হবে ৪টি গাছ। জেলে যেতে হবে না, বই পড়তে হবে, গাছ লাগাতে হবে- এ আবার কেমন আদেশ? এমন রায় অনেককে অবাক করলো।

হুম, অপরাধ প্রমান হলে প্রথাগত জেল জরিমানার বাইরে বিকল্প সংশোধনমূলক পন্থা হলো প্রবেসন। আসুন, প্রবেসন বিষয়ে জানার চেষ্টা করি।

Correctional Method এ অপরাধীকে সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতে ফেরানোর সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে প্রবেসন সারা বিশ্বে সমাদৃত। প্রবেসন সংক্রান্তে আমাদের দেশের আইনটির বয়স ৬০ বছর, অথচ পড়লে মনে হয় কত আধুনিক একটি আইন। সমৃদ্ধ ও সুন্দর আইন থাকলেও প্রবেসন আমাদের দেশে কম পরিচিত ও কম ব্যবহৃত সংশোধনমূলক আইনগত কার্যক্রম। সহজে বোঝার জন্য আমি প্রশ্ন ও উত্তর আকারে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।

১. প্রবেসন কি? এ সংক্রান্তে বাংলাদেশে কি কি আইন আছে?
দন্ডিত ব্যক্তিকে শাস্তি আরোপ না করে বা কারাগারে না দিয়ে সংশোধনের উদ্দেশ্যে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেওয়াকে Probation বলে। বাংলাদেশে প্রবেসন সংক্রান্তে ৩ টি আইনগত উৎস পাওয়া যায়- ১. The Probation of Offenders Ordinance 1960. আমরা সংক্ষেপে P.O.O বলবো। এটাই প্রবেসন সংক্রান্তে মূল আইন। এ আইনটিতে ১৯৬৪ সনে সামান্য সংশোধন আনা হয়। ২. Bangladesh Probation of Offenders Rules 1971. রুলস এ মূলতঃ প্রবেসন অফিসার এর দায়িত্ব কর্তব্য উল্লেখ আছে। ৩. মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের সার্কুলার নং জে-০১/২০১৯, তারিখ ১৯ ফেব্রয়ারি, ২০১৯। এই সার্কুলারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে মাননীয় হাইকোর্ট অধস্তন আদালতগুলোকে প্রবেসন চর্চার জন্য তাগিদ প্রদান করেছেন।

২. প্রবেসন কেন?
শাস্তির উদ্দেশ্য প্রতিশোধ (Retribution) নয়, সংশোধন (Reformation)। চলার পথে কত ঘটনাই ঘটে যায়। কোন কোন ঘটনা জীবনকে উলটপালট করে দেয়; স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ কে ধূলিসাৎ করে দেয়। আমাদের যে Adversarial System এবং কারাগারের হাল, তাতে ছোট অপরাধে কেউ জেলে গেলে বড় অপরাধী হয়ে ফেরার যুক্তিসঙ্গত আশংকা রয়ে যায়। সে কারনে অপরাধীকে জেলে না পাঠিয়ে ভাল হওয়ার একটা পথ খুলে সমাজ ও রাষ্ট্র সুনাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ দেয়াই হলো প্রবেসনের উদ্দেশ্য।

৩.১ প্রবেসন কে পেতে পারে?
যে কোন বয়সের নারী বা পুরুষ প্রবেসন পেতে পারে। নারীর ক্ষেত্রে প্রবেসনের পরিধিটা একটু বেশী। P.O.O এর ৫(১)(b) ধারা মতে, মৃত্যুদন্ড ব্যতীত যে কোন দন্ডযোগ্য অপরাধে কোন নারী প্রবেসন পেতে পারে। উল্লেখ্য বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন সমূহে সর্বমোট ৬০ টি মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ আছে। বিপরীতে P.O.O এর ৫(১)(a) ধারা মতে, পুরুষের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যোগ্য অপরাধ ব্যতীত অন্য যেকোন অপরাধে প্রবেসন দেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও কিছু বিশেষ আইনে প্রবেসনের কথা বলা আছে। কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন-২০০৬ এর ৪ ধারা মতে কোন নারী ১ বছরের বেশী সময়ের জন্য শাস্তি পেলে রেয়াদ সহ ৫০% সময় ইত্যিমধ্যে পার হয়ে গেলে তিনি প্রবেসন পেতে পারেন। এক্ষেত্রে কোর্ট নয়, সরকার সিদ্ধান্ত নিবে কোন নারী প্রবেসন পাবে কি পাবে না। তাছাড়া শিশু আইন-২০১৩ এর ৩৪(৬) ধারার বিধান মতে কোন শিশুকে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডযোগ্য অপরাধ ব্যতীত অন্য কোন অপরাধে ৩ বছর পর্যন্ত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার আদেশের পরিবর্তে কোর্ট উপযুক্ত মনে করলে, সতর্ক করে হয় খালাস অথবা প্রবেসন দিতে পারে।

৩.২ প্রবেসনের ক্ষেত্রে কোথাও Restriction আছে কিনা?
রাষ্ট্রদ্রোহ, দস্যূতা, ডাকাতি সহ মারাত্মক অপরাধে দোষী সাব্যস্তরা (পুরুষ) প্রবেসন পাবে না। P.O.O এর ৫(১) ধারা মতে, পেনাল কোড এর চেপ্টার ৬, ৭ এর কোন অপরাধ এবং ধারা 216A, 328, 382, 386, 387, 388, 389, 392, 393, 397, 398, 399, 401, 402, 455, or 458 এর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত পুরুষ প্রবেসন পাবে না। নারীর ক্ষেত্রে এমন কোন বাঁধা নেই। অনেকে মনে করেন, মাদক বা নারী ও শিশু নির্যাতন বা অন্য কোন স্পেশাল আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত কাউকে প্রবেসন দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে মনে করি, সুস্পষ্টভাবে নিষেধ না থাকলে অবশ্যই দেয়া যাবে। কেননা আইনের সুবিধা যে কেউ পেতে পারে। তবে প্রবেসন কোন অধিকার নয়, এটা কোর্ট এর একক (Exclusive) ও স্বেচ্ছাধীন (Discretionary) ক্ষমতা এবং কেবল উপযুক্ত মনে করলেই কোর্ট কাউকে এই সুযোগ দিতে পারে।

৪.১ কোন কোর্ট প্রবেসন দিতে পারে?
সোজা কথায় যে কোর্ট বিচার করে, সে কোর্টই প্রবেসন দিতে পারবে। P.O.O এর ৩ ধারায় বলা আছে, হাইকোর্ট, সেসন কোর্ট এবং ম্যাজিস্ট্রেট ১ম শ্রেণী এমন আদেশ দিতে পারবে। যে কোর্ট এর ক্ষমতা নেই কিন্তু প্রবেসন দেওয়া উচিত মনে করবে, সে কোর্ট উর্ধ্বতনের নিকট প্রবেসন এর মতামতসহ রেকর্ড পাঠিয়ে দিবে। উর্ধ্বতন কোর্ট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবে।

৪.২ আপীল বা রিভিসন কোর্ট কি প্রবেসন দিতে পারে?
নিশ্চয়ই। P.O.O এর ৩(২) ধারা মতে আপীল কোর্ট বা রিভিসন কোর্টও প্রবেসন দিতে পারে।

৫.১ প্রবেসন এর মেয়াদ কতদিন? কখন প্রক্রিয়া শেষ হবে?
১ হতে ৩ বছর মেয়াদে প্রবেসন দিতে হয়।  প্রবেসন সময়কালে কোর্ট কর্তৃক নির্ধারিত সময় পর পর প্রবেসন অফিসার আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিবে। P.O.O এর ১০(২) ধারা মতে, প্রবেসনার, প্রবেসন অফিসারের অাবেদনে অথবা কোর্ট স্বয়ং যে  কোন সময় যদি মনে করে, প্রবেসনার এর আচরণ সন্তোষজনক ও প্রবেসনে রাখা যুক্তিযুক্ত নয়, তাহলে প্রবেসন আদেশ ও বন্ড ডিসচার্জ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দিবে। বিষয়টা অনেকটা সিভিল এর ডিক্রী জারির মামলার মত। সে হিসেবে প্রবেসনে ৩টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়- ১. প্রবেসন আদেশ, ২. অগ্রগতি এবং ৩. সন্তুষ্টি ও নিষ্পত্তি।

৫.২ কোন পর্যায়ে প্রবেসন দেওয়া যাবে?
আসামী যখন দোষী সাব্যস্ত হয়, তখন শাস্তি স্থগিত রেখে প্রবেসন দেওয়া যাবে। চার্জ গঠনের সময় আসামী দোষ স্বীকার করলে সে ভিত্তিতে তাকে প্রবেসন দেওয়া যেতে পারে। সাক্ষ্য শেষ হলে যুক্তিতর্কের আগে আসামীকে CrPC এর ৩৪২ ধারা মতে পরীক্ষা কালে আসামী দোষ স্বীকার করলে সে ভিত্তিতে তাকে প্রবেসনে দেয়া যেতে পারে। আরেকটা মামলার রায় ঘোষণা কালে। কোর্ট তার রায়ে সাক্ষ্য প্রমানে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা না করে (Instead of Sentencing the Person at Once) প্রবেসনের আদেশ দিতে পারবে। কেউ কেউ সাজা ঘোষণা করে তারপর প্রবেসন দিতে চান যা সঠিক পদ্ধতি নয়। রায়ে প্রথমে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে কি না এ মর্মে (Conviction) সিদ্ধান্তে আসা হয়, তারপর শাস্তি (Sentence) কত হবে বলা হয়। প্রবেসনের ক্ষেত্রে শাস্তির অংশটুকো স্থগিত থাকে, শুধু মাত্র শর্ত ভঙ্গ করলে প্রবেসনার তার প্রাপ্য শাস্তি পাবে।

৫.৩ প্রবেসনের জন্য কি আসামীপক্ষ হতে পৃথক দরখাস্ত লাগবে?
না। মামলার পক্ষের নিকট হতে কোন এপ্লিকেশন বা দরখাস্তের কোনরূপ প্রয়োজন নেই। প্রবেসন দিবে কি দিবে না তা কোর্ট এর একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা।

৬.১ প্রবেসনে কি ধরনের শর্ত দেওয়া যায়?
প্রবেশনে ২ ধরনের শর্ত আরোপ করা যায়- ১. Statutory Conditions ও ২. Discretionary Conditions.

Statutory Conditions : যে সব শর্ত P.O.O তে সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ আছে তাকে আমরা Statutory Conditions বলতে পারি। যেমন প্রবেসনার নতুন করে কোন অপরাধে জড়িত হবে না, মাদক নিবে না, শান্তি বজায়ে রাখবে, কোর্ট ও পুলিশের নির্দেশমত হাজির হবে ইত্যাদি।
Discretionary Conditions: প্রবেশনারকে সংশোধন করে সুনাগরিক হিসেবে সমাজে আত্তীকরণের স্বার্থে যেমন প্রয়োজন মনে করেন, কোর্ট তেমন শর্ত আরোপ করতে পারবেন। বিদেশে বই পড়া, গাছ লাগানো, বৃদ্ধদের সেবা করা- এমন Community Service এর অাদেশ দেওয়া হয়। আমাদের আইনে এমন শর্তারোপের কথা উল্লেখ নেই সত্য, কিন্তু কোনরূপ বাঁধাও নেই, বরং P.O.O এর ৫(২) ধারায় আরও উদার ভাবে বলা আছে, পুনঃঅপরাধ রোধ এবং সৎ, পরিশ্রমী, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক তৈরীতে যেরূপ শর্তারোপ প্রয়োজন, কোর্ট সেরূপ শর্তারোপ করতে পারবে । আমাদের দরকার চিন্তার দরজাগুলো খুলে দেওয়া।

৬.২ প্রবেসনের শর্তে কি কোন পরিবর্তন আনা যায়?
P.O.O এর ১০ ধারা মতে প্রবেসনার, প্রবেসন অফিসারের অাবেদনে বা কোর্ট নিজে শুনানির সুযোগ দিয়ে প্রয়োজনে শর্ত পরিবর্তন, সংশোধন, পরিমার্জন বা নতুন শর্তারোপ করতে পারে। Sureties  বা বন্ডের জামিনদার এ ধরনের পরিবর্তনে রাজী না হলে নতুন করে বন্ড দাখিল করতে হবে।

৭. Conditional Discharge এবং Probation কি একই বিষয়ঃ
না। কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও দুটো পৃথক বিষয়। P.O.O এর ৪ ধারায় কনডিসনাল ডিসচার্জ বা শর্তসাপেক্ষে অব্যহতির কথা বলা আছে। মূলতঃ কেউ পূর্বে দন্ডিত না হলে এবং তার বিরুদ্ধে প্রমানিত অপরাধের শাস্তি ২ বছরের কম হলে কোর্ট তার বয়স, চরিত্র, পূর্ব ইতিহাস, অপরাধের ধরণ, শারিরীক ও মানসিক অবস্থা সহ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রবেসন না দিয়ে উপদেশ বা সতর্ক করে (Admonition) দিয়ে তাৎক্ষণিক অব্যহতি দিতে পারে অথবা প্রয়োজন মনে করলে, নতুন অপরাধ করবে না, শান্তি বজায় রাখবে এমন শর্তে বন্ড দাখিল সাপেক্ষে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য শর্তসাপেক্ষ অব্যহতি দিবে; শর্ত ভঙ্গ করলে তার কৃত অপরাধের জন্য প্রাপ্য শাস্তি পাবে।

অনেকে প্রবেসন ও কনডিসনাল ডিসচার্জ বিষয় দুটোকে আলাদা করতে পারে না। ১. প্রবেসনে কেউ আগে অপরাধ করেছিল কি না- তা বিবেচনার বিষয় নয়, আর কনডিসনাল ডিসচার্জে কেউ আগে অপরাধ করলে সে তার অযোগ্য হবে। ২. প্রবেসন দেওয়া হয় ১ হতে ৩ বছরের জন্য, আর কনডিসনাল ডিসচার্জ এ শুধুমাত্র উপদেশ দিয়ে বা প্রয়োজন হলে ১ বছর পর্যন্ত সময়ের জন্য দেয়া যায়। ৩. বড় অপরাধে প্রবেসন আর ছোট অপরাধ তথা ২ বছর পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধে কনডিসনাল ডিসচার্জ। ৪. প্রবেসন দেওয়া হয় প্রবেসন অফিসার এর তত্বাবধানে, আর কনডিসনাল ডিসচার্জ এ প্রবেসন অফিসারের সম্পৃক্ততা নেই। তবে উভয় ক্ষেত্রেই জামিননামার মত আসামিপক্ষ কর্তৃক শর্ত পালনের অঙ্গীকার হিসেবে বন্ড দাখিলের আবশ্যকতা আছে।

৮. প্রবেসনে মামলার ভিকটিমের কি কোন প্রাপ্তি আছে?
P.O.O এর ৬ ধারায় বলা আছে, ৪ ধারা মতে ডিসচার্জ অথবা ৫ ধারা মতে প্রবেসন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোর্ট ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ (Compensation or damage for loss or injury) দেওয়ার আদেশ দিতে পারবে, তবে তা সংশ্লিষ্ট অপরাধের জরিমানার চেয়ে বেশী হবে না।

৯. প্রবেসন এর শর্ত না মানলে পরিনাম কি?
P.O.O এর ৭ ধারায় এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলা আছে। প্রবেসন এর শর্ত না মানা হলে উভয়পক্ষকে শুনে –
১. প্রবেসন বাতিল করে দোষী সাব্যস্ত অপরাধে কোর্ট উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবে,
২. প্রবেসন বাতিল না করেই ১০০০/- টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে, ব্যর্থতায় মূল অপরাধের শাস্তি আরোপ করতে পারবে।

১০. প্রবেসন শর্ত ভাঙলে শাস্তি কত হবে? কে দেবে?
প্রবেসন শর্ত ভাঙলে মূল অপরাধের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে। বিচারক বদলী বা পরিবর্তন হয়ে গেলে পরবর্তীজন দ্বিধায় পড়তে পারে শাস্তি কত দিবে। আইনতঃ যিনি কোর্টের দায়িত্ব নিবেন, তিনি তার স্ববিবেচনায় এখতিয়ারের মধ্যে যতটুকু যুক্তিপূর্ণ মনে করবেন, ততটুকুন শাস্তি দিতে পারবেন। কোনরূপ সমস্যা বা দ্বিধা যেন না হয়, সে জন্য প্রবেসন শর্তেই একটা ক্লজে উল্লেখ থাকা দরকার, শর্ত ভাঙলে মূল অপরাধে কতটুকু শাস্তি হবে। যেমন পেনাল কোড এর ৩২৪ এ শাস্তি ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক্ষেত্রে প্রবেসন দেওয়ার সময়ই বিচারক  উল্লেখ করে দিতে পারে, শর্ত ভাঙলে দন্ডিত কে ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

১১. প্রবেসন শর্ত পালিত হচ্ছে কি না কে দেখবে?
P.O.O এর ১৩ ধারা মতে, প্রবেসন অফিসার প্রবেসনার কে Supervise করবে। সে তার বাড়ীতে যাবে, যোগাযোগ রাখবে, সহযোগিতা করবে, পরামর্শ দিবে এবং কোর্টকে অগ্রগতি জানাতে থাকবে। প্রবেসন রুলস ১৯৭১ এর রুল ১১ তে প্রবেসনার কে প্রবেসন অফিসার এর কাছে গচ্ছিত রাখার (entrust) কথা বলা হয়েছে। তিনি প্রবেসন সংক্রান্তে রেজিস্ট্রার ও ডায়েরি সংরক্ষণ করবেন। কোন শর্ত ভঙ্গ হলে অনতিবিলম্বে তা কোর্টকে জানাবেন। সহজে বলতে গেলে লক্ষ্য অর্জনে প্রবেসন অফিসার প্রবেসনার এর মেন্টর মত একজন হয়ে কাজ করবেন।

১২. প্রবেসন আদেশে সংক্ষুব্ধ কারও প্রতিকার কি?
P.O.O এর ৮ ধারা অনুযায়ী, প্রবেসন আদেশে ভিকটিম বা রাষ্ট্রপক্ষ বা আসামী যে কেউ সন্তুষ্ট নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপীল বা প্রযোজ্যক্ষেত্রে রিভিসন কোর্ট সে আদেশ বাতিল বা সংশোধন করতে পারবে অথবা মূল অপরাধের যে শাস্তি তা আরোপ করতে পারবে।

১৩. প্রবেসন কি ভবিষ্যতে কারও চাকুরী বা অন্য কোন প্রতিযোগীতায় বা ক্যারিয়ারে বাঁধা হতে পারে?
না। কেননা প্রবেসনার দন্ডিত হলেও প্রবেসনে থেকে নিজেকে শুধরে সমাজ ও রাষ্ট্রে সুনাগরিক হিসেবে আত্তীকৃত হয়েছে। P.O.O এর ১১ ধারায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা আছে। ৪ ধারা মতে ডিসচার্জ বা ৫ ধারা মতে প্রবেসন দিলে তা দন্ড হিসেবে গণ্য হবে না। বলা আছে, “Shall be deemed not to be a conviction for any purpose” এবং Disqualification বা Disability গণ্য হবে না। কোর্ট এর উচিত, আদেশেও স্পষ্ট করে বলা যে প্রবেসন তার অযোগ্যতা বলে গণ্য হবে না।

১৪. আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রবেসন কতটা কার্যকরী?
আমাদের সমাজ কিন্তু এখনো যথেষ্ট উদার। অনেক অপরাধ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে স্থানীয় ভাবে আপোষ হচ্ছে অর্থাৎ জেল জরিমানার বাইরেও মানুষ ক্ষমা করতে জানে। প্রবেসনের বিষয়টি বেশী করে প্রচার করলে জনসাধারণ জানতে পারবে এবং প্রবেসনারকে মূল স্রোতে পুনঃএকত্রীকরণে সহায়তা করবে। দরকার প্রবেসন চর্চা বাড়ানো।

১৫. প্রবেসন চর্চা বাড়ছে না কেন?
Adversarial System এ একপক্ষ চায় খালাস, অন্যপক্ষ শাস্তি। আর কোর্টও খালাস আর শাস্তির বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেছে। আইন প্রয়োগে উদার ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। নিশ্চয়ই প্রবেসন বিষয়ে বিচারকদের আরও বেশী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। মাননীয় সুপ্রীম কোর্ট এর উদ্যোগে প্রবেসন নিয়ে একটা হ্যান্ডবুক তৈরি করে সব কোর্ট এ প্রেরণ করলে কোর্টগুলো আরও কার্যকর ভাবে প্রবেসন চর্চা করতে সক্ষম হবে বলে মনে করি।

মোঃ জিয়াউর রহমান

লেখক- চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মাগুরা। judgezia@gmail.com