মোবাইল কোর্টের সরল বিশ্বাস : বিজ্ঞ আইনজীবীকে শাস্তি প্রদানের বৈধতা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৮ মে, ২০২০ ১১:২৯ অপরাহ্ণ
আনোয়ার হোসেন সাগর, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট

আনোয়ার হোসেন সাগর:

মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সাজা প্রদানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নামে পরিচিত নির্বাহী কর্মকর্তাগনের বিতর্কের অবসান যেন হচ্ছেই না, আইনে কোন ডিগ্রী না থাকা এই নির্বাহী কর্মকর্তাগন কোন না কোনভাবে বিতর্কে থাকছেনই। সেই একই ধারাবাহিকতায় এবারও নতুন ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি এর রবিউল ইসলাম রিপন নামের একজন বিজ্ঞ আইনজীবী’কে বিগত ০২ মে, ২০২০ ইং তারিখে কারাদণ্ডের আদেশ প্রদানের মাধ্যমে। সরকারী কাজে বাধাদানের অভিযোগে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা আইনে বিজ্ঞ একজন আইনজীবীকে কারাদণ্ড প্রদান করে গতানুগতিক বিতর্কের নতুনত্বের অবতারণা করেছেন মর্মে LawyersClub নামক আইন বিষয়ক দেশের অনলাইন নিউজ পোর্টালে বিগত ০৪ মে, ২০২০ ইং তারিখে প্রকাশিত একটি বার্তা এবং একই তারিখে প্রকাশিত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এর বিজ্ঞ আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিক একটি সাক্ষাৎকার/মতামত সহ বিভিন্ন ধরনের মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়। নির্বাহী কর্মকর্তাগণ আর কত বিতর্কের নতুনত্বের জন্ম দিবেন তা দেখার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় আছে মর্মে মনে হয় না।

উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব, সাঈদ আহসান খালিদ আইন, আইনের সাধারণ নীতিমালা ও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ের বরাত দিয়ে ০৩ মে, ২০২০ ইং তারিখে নিজের Facebook Timeline এ সবিস্তরে চমৎকারভাবে একটি Post দিয়েছেন এবং তা পরের দিন উক্ত LawyersClub এও প্রকাশিত হয়। তবে, উক্ত বিষয়ে এখানে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করার সামান্য প্রয়াস চালানো হয়েছে।

সরকারী কাজে বাধাদানের শাস্তি THE PENAL CODE, 1860 এর ১৮৬ ধারায় বিধান করা হয়েছে। এখন দেখা যাক- উক্ত অপরাধের শাস্তি নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে কথিত ঘটনার সঙ্ঘটন না দেখে প্রদান করতে পারে কিনা, এক্ষেত্রে আইন কী বলে। সরকারী কাজে কোন ব্যক্তি বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী অর্থাৎ যিনি বাধাগ্রস্ত হয়েছেন তিনি বা তিনি যার অধীন তৎ কর্তৃক অর্থাৎ তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আনিত কোন লিখিত নালিশ (Complaint in writing) ব্যতিত এরূপ অভিযোগের বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার আইনত কোন সুযোগ নেই। কেননা, THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898 এর ১৯৫ ধারার (১) উপধারার (ক) দফায় বলা হয়েছে, “No Court shall take cognizance of any offence punishable under sections 172 to 188 of the Penal Code, except on the complaint in writing of the public servant concerned, or of some other public servant to whom he is subordinate.” উদাহারন- একজন Sub-Inspector (SI) তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কাজে কারো দ্বারা বাধাগ্রস্ত হলে বা কেউ বাধা দিলে সেই Sub-Inspector বা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট Officer in-charge (OC) ওই বাধাদানকারীর বিরুদ্ধে লিখিত নালিশ (Complaint in writing) দাখিল করে মামলা করবে।

আমরা সবাই জানি যে, অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে সাধারণত থানায় বা সরাসরি আদালতেও মামলা করা যায়। এখানে আদালত বলতে ফৌজদারি আদালত (Criminal Court) যা অনেক জায়গায়, যেমন কিশোরগঞ্জে, ‘কোর্ট’ (Court) হিসেবে পরিচিত, আর শুধু ‘আদালত’ বলতে দেওয়ানি আদালত (Civil Court) হিসেবে পরিচিত। যাইহোক, থানায় মামলা করতে হয় এজাহার দাখিল করে আর আদালতে করতে হয় নালিশ (Complaint), যা নালিশা দরখাস্ত (Complaint Petition) নামে পরিচিত, দাখিল করে। তাছাড়া, আমরা এও জানি যে, ফৌজদারি মামলা সাধারণত যে কেউ দায়ের করতে পারে, কিন্তু কতিপয় ক্ষেত্রে উক্ত ১৯৫ ধারা তা সীমিত করে দিয়েছে অর্থাৎ ব্যক্তি বিশেষকে চিহ্নিত করে দিয়েছে।

নালিশ (Complaint) করতে হবে একজন Magistrate এর নিকট যা উক্ত THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898 এর ৪ ধারার (১) উপধারার অন্তর্গত (জ) দফায় প্রদত্ত সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় এভাবে, “COMPLAINT means the allegation made orally or in writing to a Magistrate, with a view to his taking action under this Code, that some person whether known or unknown, has committed an offence, but it does not include the report of a police-officer.”

অন্যদিকে, বিশেষ বা আলাদা কোন শব্দ ব্যতিত MAGISTRATE বলতে Judicial Magistrate কে বুঝানো হয়। কেননা, উক্ত একই CODE এর ৪ক ধারার (১) উপধারার অন্তর্গত (ক) দফায় বলা হয়েছে, “In this Code, unless the context otherwise requires, any reference- without any qualifying word, to a Magistrate, shall be construed as a reference to a Judicial Magistrate;”

সংশ্লিষ্ট কর্মচারী অর্থাৎ যিনি বাধাগ্রস্ত হয়েছেন তিনি বা তিনি যার অধীন তৎ কর্তৃক অর্থাৎ তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিত নালিশ (Complaint in writing) যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন Judicial Magistrate এর নিকট অর্থাৎ Judicial Magistrate Court এ দাখিল করা ব্যতিত এই বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার অন্য কোন উপায় নেই। এমনকি, এই বিষয়ে থানায়ও এজাহার দাখিল পূর্বক কোন মামলা দায়ের করা যাবে না। কেননা, উক্ত ৪ ধারার (১) উপধারার অন্তর্গত (জ) দফায় প্রদত্ত সংজ্ঞার শেষাংশে ১৭৩ ধারায় উল্লেখিত পুলিশ প্রতিবেদনকে বাদ (Exclude) দিয়েছে। থানায় দায়েরকৃত মামলায় পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে যে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে তাকেই পুলিশ প্রতিবেদন (Police Report) বলে। ফলে, মোবাইল কোর্টের নিকট নালিশ (Complaint) করার আইনগত কোন সুযোগ নেই।

মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী কোন নির্বাহী কর্মকর্তার সামনে কোন অপরাধ সঙ্ঘটিত বা উদ্ঘাটিত না হলে কাউকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৬(১) ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “……… এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তফসিলে বর্ণিত …… কোন অপরাধ …… তাহার সম্মুখে সঙ্ঘটিত বা উদ্ঘাটিত হইয়া থাকিলে তিনি উক্ত অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে গ্রহণ করিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে, দোষী সাব্যস্ত করিয়া, এই আইনের নির্ধারিত দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন”। কিন্তু, কোন অনিয়মকে কেন্দ্র করে টিসিবি’র এক ব্যক্তির সাথে বিজ্ঞ আইনজীবীর তর্কের জের ধরে ফোনে মৌখিকভাবে অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তা এসে মোবাইল কোর্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বিতর্কিতভাবে বিজ্ঞ আইনজীবীকে ১৮৬ ধারায় দোষী সাব্যস্থ করে ৭ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করেছেন মর্মে বিভিন্ন ধরনের মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়।

তর্কের খাতিরে যদি THE PENAL CODE, 1860 এর ১৮৬ ধারায় উল্লেখিত সরকারী কাজে বাধা সত্যিই সঙ্ঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে বাধাগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক লিখিতভাবে নালিশা দরখাস্তের (Complaint Petition in writing) মাধ্যমে নিয়মিত মামলা দায়ের করতে হবে এখতিয়ার সম্পন্ন Judicial Magistrate Court এ। কিন্তু, টিসিবি’র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা না করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোনে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন এবং উক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও কথিত ঘটনা (তর্ক বা বাধাদান) তার নিজের সম্মুখে সঙ্ঘটিত না হওয়া সত্ত্বেও ফোনের মাধ্যমে জানতে পেরে উক্তরুপ কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করেছেন যা আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ, আইনের সাধারণ নীতিমালার (General Principles of Law) ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার (Criminal Justice System) সরাসরি লঙ্ঘন। এখানে টিসিবি’র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক নিয়মিত মামলা দায়ের করা যেত যদি বাধাদানের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ঘটে থাকতো, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তারও আইনগত দায়িত্ব ছিল আইনগত বিধানকে যথাযথভাবে শ্রদ্ধা করা।

টিসিবি যাই করুক না কেন নির্বাহী কর্মকর্তাগণ যেহেতু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আইন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে, সেহেতু তাদেরকে বাংলাদেশ সংবিধান, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ ও THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898 সহ অন্যান্য আইনে উল্লেখিত পদ্ধতিগত ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য পালনীয় বিধানাবলি পালন করার বা তা অমান্য না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। “আইন অনুযায়ী ব্যতিত” কারো ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার হরণ করার কোন সুযোগ নেই। কেননা, বাংলাদেশ সংবিধান এর ৩২ অনুচ্ছেদ মৌলিক অধিকার হিসেবে “জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা” সুরক্ষিত করেছে। ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আইন অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না”। কিন্তু, বিজ্ঞ আইনজীবীকে কারাদণ্ড প্রদানপূর্বক গ্রেফতার করে কারাগারে আটক করায় মৌলিক অধিকার হিসেবে তার ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার হরণ করা হয়েছে। এখানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তা শুধু THE CODE OF CRIMINAL PROCEDURE, 1898 ও মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ ই ভঙ্গ করেননি বাংলাদেশ সংবিধানের সমুন্নত মর্যাদার উপরও আঘাত করেছেন।

নির্বাহী কর্মকর্তার উক্ত কার্য সরল বিশ্বাসে (In good faith) হয়ে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর যথাক্রমে ১৪ ধারা তাকে কোন ফৌজদারি অভিযোগ বা দেওয়ানি দায় হতে সুরক্ষা দিবে। কিন্তু, সরল বিশ্বাসে না হলে? সরল বিশ্বাসে না হলে তার এরূপ কার্য অপরাধের সামিল হবে, দণ্ডমূলক আইনে উল্লেখিত বিভিন্ন অপরাধমূলক ধারাকে আকর্ষণ করবে। তাছাড়া, মানহানির কারণে ক্ষতিপূরণের দায়ও উদ্ভব হতে পারে। ফলে, উক্ত কর্মকর্তাকে আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত করার বা দায়ী করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে, সরল বিশ্বাসে হয়েছে কি হয়নি তা পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করবে। কথিত ঘটনা না দেখে ফোনে অভিযোগ পেয়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে বিচার করলে তাতে সরল বিশ্বাস (Good faith) দাবি করলে কিংবা উক্ত মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর ৬(১) ধারা অনুযায়ী “অপরাধটি তার সম্মুখে সঙ্ঘটিত বা উদ্ঘাটিত হতে হবে” এই বিষয়টি তিনি জানেন না মর্মে দাবি করলে তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা আইনের পাঠকগণ ভালো করেই জানেন।

সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তাকে এখনো আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত করা বা দায়ী করা না হলেও বিজ্ঞ আইনজীবী সমাজ বিগত ০৩ মে, ২০২০ ইং তারিখে লিখিতভাবে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ সহ প্রতিবাদ জানিয়েছে মর্মে এবং তাদের চাপের মুখে উক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীকে গ্রেফতারের পরের দিন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে উক্ত কর্মকর্তার আপিল কর্তৃপক্ষ জামিনে মুক্তি দিয়েছেন মর্মে LawyersClub এ বিগত ০৪ মে, ২০২০ ইং তারিখে প্রকাশিত বার্তার মাধ্যমে জানা যায়। এখন বিষয়টি কোন পর্যন্ত গড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষার পালা…।

লেখক- সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ক্ষমতাপ্রাপ্ত), সিলেট।