ভার্চুয়াল কোর্ট : আইনজীবীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আমার ভাবনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২০ ৫:০১ পূর্বাহ্ণ
শহিদুল ইসলাম সজীব, আইনজীবী

শহিদুল ইসলাম সজীব:

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে পুরো বিশ্ব থমকে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম না। ৫ দফায় সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল যথারীতি বন্ধ, সেই সাথে সকল সরকারি চাকুরীজীবীদের নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগে জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা ছাড়া কার্যত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। যদিও এর মাঝেই আসন্ন ঈদ সামনে রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে খুলে দেয়া হয়েছে শপিং সেন্টারসহ ছোট-বড় কিছু শিল্পকারখানা। কোন কিছুই স্বাভাবিক না। এক ধরনের তালমাতাল অবস্থা বিরাজ করছে সর্বত্র। বিচার বিভাগেও লেগেছে তার ছোয়াঁ।

বিগত ২৫ মার্চ থেকে বন্ধ আছে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালত। কিন্তু একটা দেশে এভাবে সাংবিধানিক শূন্যতা চলতে পারে না। এটা ভাবনাতীত। ফলে হাইকোর্ট ডিভিশন সপ্তাহে দুই দিন পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু হাজতী আসামীদের জরুরী জামিন শুনানির জন্য খুলে দেয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু বিধিবাম। সংবিধানের রক্ষাকর্তা বিজ্ঞ আইনজীবীদের প্রতিবাদ আর তোপের মুখে প্রজ্ঞাপন স্থগিত করা হয়। স্বাভাবিক কারণেই বিচার বিভাগ ভিন্নপথে হাটতে বাধ্য হয়। ৭ মে মন্ত্রীসভায় অনুমোদন পায় আদালতে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার সংক্রান্ত অধ্যাদেশের। ৯ তারিখে যা রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে পাশ হয়ে সারাদেশে একযোগে অনতিবিলম্বে কার্যকর হয়। ১০ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট এই অধ্যাদেশের ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়। ১১ তারিখ সারাদেশে চালু হয় ই-জুডিশিয়ারির প্রথম ধাপ ভার্চুয়াল কোর্ট। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার জামিন শুনানি সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে৷ খুব দ্রুত ভার্চুয়াল কোর্ট চালু হওয়ায় অনেক আইনজীবী এর সাথে মানিয়ে উঠতে পারছেন না। দেশের কিছু বার তো ভার্চুয়াল কোর্ট বর্জনের ঘোষনাই দিয়ে দিয়েছে! দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার পরেও আইনজীবীদের মধ্যে ভার্চুয়াল কোর্ট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াগুলো মোটামুটি এরকম এমন….

এক. ভার্চুয়াল কোর্টে শুধু বিজ্ঞ বিচারকগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনজীবীদের বিভিন্ন কারনে আদালত প্রাঙ্গণে যেতেই হচ্ছে।

দুই. কোন ধরনের পূর্ব ঘোষণা, প্রাক-প্রস্তুতি বা কর্মশালা না করে হুট করে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করাতে খেই হারাতে হয়েছে আইনজীবীদের।

তিন. প্রবীণ আইনজীবীদের অনেকেই ডিজিটাল সিস্টেমে অভ্যস্থ না, তাদের জন্য বিষয়টা একটু কঠিন হয়ে গেছে।

চার. জি.আর সেকশন, পুলিশ স্টেশন, কারা কর্তৃপক্ষকে ডিজিটালাইজ না করে শুধু ভিডিও কলে শুনানি গ্রহণ করলেই ভার্চুয়াল কোর্টের উদ্দেশ্য সফল হবে না।

পাচঁ. এই সিস্টেমে আদালতের মত স্পর্শকাতর জায়গার তথ্যগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।

ছয়. ইমেইলে আবেদন পাঠানোর পরে সাথে সাথে রিসিভ সংক্রান্ত বার্তা দেয়া হয় না। আবেদন ঠিকভাবে করা গেলো কিনা সেটা জানার সুযোগ নাই। ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজেও এই সমস্যায় পড়েছি। বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ, শরীয়তপুর, আদালতে চার দিন আগে ইমেল পাঠিয়েও কোন ফিরতি বার্তা পাইনি। আবার অনেককে ফিরতি মেইলে আবেদন অসম্পূর্ণ বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু কি কারণে অসম্পূর্ণ সেটা জানানো হয়নি।

সর্বশেষ শরীয়তপুরের বিজ্ঞ জেলা ও দায়রা জজ এক ইমেল বার্তা পাঠিয়েছেন সেখানে বলা হয়েছে আবেদনের ৭২ ঘন্টা পরেও কোন রেসপন্স না পেলে যোগাযোগ করতে। কিন্তু কার সাথে এবং কোন নাম্বারে যোগাযোগ করবে সে ব্যাপারে কিছুই জানানো হয় নি! তবে এখানকার ম্যাজিস্ট্রেসি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে খুব দক্ষতার সাথে দ্রুত শুনানি নিষ্পত্তি হচ্ছে।

আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়াগুলো অমূলক নয়। কিন্তু এর সবগুলোই সমাধানযোগ্য। একটা নতুন সিস্টেম এডোপ্ট করতে কিছুটা সময় লাগবেই। তাই বলে সিস্টেমটা বন্ধ করে দেয়ার দাবি অযৌক্তিক। একমাত্র বিচারক এবং আইনজীবীদের নামের আগে “বিজ্ঞ” শব্দের ব্যবহার করা হয়। আইনজীবীরা বিচার প্রার্থীর জন্য লড়াই করেন। দুনিয়ার প্রায় সব বিষয়ে তাদের জ্ঞান রাখতে হয়। মামলা পরিচালনার সময় মানুষের সমস্যার বৈচিত্র্যতার কারণে নানান বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়। প্রয়োজনের তাগিদ আর ক্লায়েন্টকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে তাকে এমনটা করতে হয়। আমার মনে হয় সামান্য ভার্চুয়াল কোর্টের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া কোন বিজ্ঞ আইনজীবীর জন্যই কঠিন কিছু হবে না।

তরুন এবং উদ্যোমী আইনজীবীরা বিচার বিভাগের এই যুগান্তকারী অধ্যায়কে স্বাগত জানিয়েছে। ওকালতনামা, জামিননামাসহ আরো বেশ কিছু ডকুমেন্টের জন্য কোর্টে যাওয়া লাগলেও ঘরে বসে শুনানি করতে পেরে তারা উজ্জীবিত। তবে আদালত ব্যবস্থার সাথে জড়িত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন- পুলিশ স্টেশন, কারাগার, বার এসোসিয়েশন, রেকর্ডরুম, হাসপাতাল ইত্যাদিকে ডিজিটালাইজ করতে পারলে ভার্চুয়াল কোর্টের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সহজ হবে। এসব প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে কাজ করলে পুরো আদালত ব্যবস্থার চিত্রই পালটে যাবে। বিচারপ্রার্থীদের হয়রানী আর আদালত প্রাঙ্গণে টাউট-দালালের দৌরাত্ম্য শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। অনেকে মনে করছে এই সিস্টেমে একজন আইনজীবীকে তথ্য প্রযুক্তি এক্সপার্ট হতে হবে। আসলে ব্যাপারটা তেমন না। স্মার্টফোনে শুধু ইমেইল পাঠানো এবং ভিডিও কলে কথা বলতে পারলেই এই সুবিধা নেয়া যায়। আর তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে একজন আইনজীবী এইটুকু পারবে না, এটা কল্পনাও করা যায় না। আলোচনা কিংবা সমালোচনা অবশ্যই হবে, তবে সেটা ভার্চুয়াল সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী, সহজ আর প্রানবন্ত করা নিয়ে, সিস্টেমটা বন্ধ করে দিতে নয়।

দেশ কেবল ই-জুডিশিয়ারির একটা ছোট ধাপে পা দিয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত প্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশও নিশ্চয়ই পূর্নাঙ্গ ই-জুডিশিয়ারি পথে হাঁটবে। সে পথে বিজ্ঞ আইনজীবীদের অবশ্যই প্রস্তুত হতে হবে। ভার্চুয়াল কোর্টে এখন শুধু জরুরী জামিন সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে। পাইলট বেসিসে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরে আত্মসমর্পণকৃত আসামীদের জামিন আবেদন এবং ই-ফাইলিং (নালিশী মামলার অভিযোগ) শুরু করা যেতে পারে। স্যারেন্ডারের আসামীদের পুলিশ স্টেশন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত করা যেতে পারে।

আমরা যেভাবে এখন জামিনের আবেদন করছি সেভাবে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নালিশ জানানো কঠিন কিছু হবে না। এক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থী নিজ অবস্থানে থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারে অথবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইনজীবীর চেম্বার থেকেও যুক্ত হতে পারে। প্রতিদিন দু’একজন চেম্বারে দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করা খুব বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই আমরা এক আইনজীবীর চেম্বারে অসংখ্য আইনজীবীকে একি কম্পিউটার বা স্ট্যান্ডি মোবাইলে শুনানী করতে দেখছি। আসলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা সবাই কম বেশি অনিরাপদ। বাস্তবে যেমনটা দেখা যাচ্ছে, আমাদের কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই চলতে হচ্ছে।

দেশের অর্থনীতির ভারসাম্য, সরকারের সক্ষমতা সব কিছু মিলিয়ে সাবধানতার মাত্রা নির্ধারিত হয়। খুব বেশি খায়েশি হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সৌভাগ্য আমাদের দেশের নেই। কার্যত কোন দেশেরই নেই। আমেরিকার মত শক্তিশালী দেশেও লকডাউন তুলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করতে হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন তিন-চার হাজার করে মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। যুদ্ধ করে বাঁচার মানসিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে পুরো বিশ্ব।

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, ই-ফাইলিং বা নালিশী মামলার অভিযোগ দাখিল জরুরী হয়ে পড়ার সম্ভবনাও কিন্তু প্রবল। আসলে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অথবা এর থেকে উত্তরনের পরেও দেশের সামাজিক ভারসাম্যে বেশ বড়সড় একটা ফাটল ধরবে। পরিস্থিতি যদি আরো ঘোলাটে হয়, সাধারণ ছুটি যদি আরো বাড়াতে হয়, মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই উলট পালট হয়ে যাবে।  অভাবী মানুষ প্রাকৃতিক কারণেই অপরাধপ্রবণ হয়। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও আশংকাজনক ভাবে বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই পুলিশ স্টেশনগুলোতে পারিবারিক অভিযোগের ভীর জমেছে। পুলিশের পক্ষে সব মামলা আমলে নেয়া সম্ভব না। স্বাভাবিক সময়েও এটা সম্ভব হয় না। তাছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ দেশের এই দূর্যোগে নানামুখী কাজ করে যাচ্ছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে পুলিশের এতো বড় ত্যাগ এবং কর্মদক্ষতা আর দেখা যায় নি। করোনায় ডাক্তার-নার্সদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। তাদের ঘাড়ে দ্বায়িত্বের বোঝা বাড়ানো অমানবিক হবে।

সব মিলিয়ে মহামান্য সুপ্রিমকোর্ট নিশ্চয়ই আগামী কয়েক সপ্তাহ পরে দেশের ম্যাজিস্ট্রেসিগুলোতে নালিশী মামলা চালুর প্রক্রিয়া হাতে নেয়ার বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করবেন। সব কিছুই নির্ভর করছে সামনের দিনগুলোতে করোনা আমাদের সাথে কেমন আচরণ করে তার উপর।

অপরাধ থেমে নেই। মানুষের উপর অন্যায় এই মহা দূর্যোগেও বন্ধ হয়ে যায় নি বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে। সাধারণ মানুষের আদালতের আসার পথ বন্ধ থাকতে পারে না। দেশের প্রচলিত আইন, সংবিধান কিংবা প্রাকৃতিক আইন কোথাও সাধারণ মানুষের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পথকে রুদ্ধ করে দেয়া সমর্থিত হয় না। আদালত আইনজীবী কিংবা বিচারকের জন্য না, আদালত সর্ব পরিস্থিতিতেই বিচারপ্রার্থীর। এই অমোঘ সত্যকে ধারণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শহিদুল ইসলাম সজীব: আইনজীবী, শরীয়তপুর।

mdshahidulislam0038@gmail.com