আসামী চালানের সময়ে কেস ডায়েরি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দিতে হয় যে কারণে

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৭ মে, ২০২০ ১০:০৯ অপরাহ্ণ
চন্দন কান্তি নাথ, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কুমিল্লা

চন্দন কান্তি নাথ :

মামলার তদন্তের লিপি হচ্ছে কেস ডায়েরি। তদন্তকারী পুলিশ অফিসার প্রতিদিন ডায়েরীতে তার তদন্তের অগ্রগতি লিপিবদ্ধ করবেন, কখন তার নিকট খবর পৌঁছাল, কখন তিনি তদন্ত শুরু ও শেষ করলেন, কোন স্থান বা স্থানগুলো তিনি পরিদর্শন করলেন এবং তার তদন্তের মাধ্যমে যে অবস্থা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হলেন তা তিনি কেস ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করবেন। যখন একটি মামলা হয় এবং মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট তদন্তের জন্যে দেয়া হয় তখন কিভাবে এটি ঘটেছে (How was it committed?), কোথায় এটি ঘটেছে (Where was it committed?) কখন কোন অবস্থায় এটি ঘটেছে, কেনো এটি ঘটেছে (Why was it committed?), কে এটি ঘটিয়েছে (Who committed it?) ক্ষয়ক্ষতি বা আঘাতের ধরণ কেমন (What is the extent of loss, damage or nature of injuries caused?) ইত্যাদি বের করেন বা বের করার চেষ্টা করেন। উক্ত কাজগুলো তাকে সততা, দক্ষতা, একাগ্রতা, খোলা মনে, সঠিকভাবে করতে হয়। কোনো রকম পক্ষপাত না করে এবং কারো ক্ষতির চিন্তা না করে কাজগুলো করতে হয়। তার থাকতে হয় সংশ্লিষ্ট এলাকা সম্পর্কে ভালো ধারণা। উক্ত বিষয় গুলো নজর দিলে খুব দ্রুত মামলায় প্রাথমিক ভাবে কে কিভাবে কখন কোথায় জড়িত তার একটা দৃঢ়ভিত্তি দাঁড় করানো যায় এবং তা সহজে ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে আসামী গ্রেপ্তার করে কেস ডায়েরি সহ আসামি কে আদালতে চালান দিতে হয়।

অনেকে মনে করেন, আইন অনুসারে কেস ডায়েরি সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, আসামীরও এটা দেখার সুযোগ নাই  এবং এই ডায়েরি সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য প্রমাণ হিসাবে ব্যবহৃত হয় না  এবং এই  কেস ডায়েরি প্রণয়নকারী পুলিশ অফিসার এর বক্তব্য ডায়েরি এর ভিন্ন হলে এবং যদি তার স্মৃতি সজীব করার জন্য  ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৬১ ধারা বা ১৪৫ ধারা ব্যবহৃত হয়। আর কোন কাজে ব্যবহৃত হয় না কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়।

আইন মোতাবেকই এটি সঠিক নয়। কেনো না ফৌজদারি কার্য বিধি ১৬৭(১) ধারায় আছে- “যখন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে হেফাজতে আটক রাখা হয় এবং ইহা প্রতীয়মান হয় যে, ৬১ ধারায় নির্ধারিত ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করা যাবে না…তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অতঃপর নির্ধারিত ডায়েরীতে লিখিত ঘটনা সম্পকিত নকল নিকটবতী ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবেন, (shall forthwith transmit to the nearest Judicial Magistrate a copy of the entries in the diary) এবং একই সময়ে আসামীকে উক্ত ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবেন। “উক্ত ধারার ‘অতঃপর নির্ধারিত ডায়েরীতে লিখিত ঘটনা সম্পকিত নকল’ বলতে আসলে কেস ডায়েরি কে বুঝানো হয়েছে এবং আবার আইনের  ধারাতে  “shall” দিয়ে বুঝানো হয়েছে পুলিশ কে আবশ্যক ভাবে তা করতে হবে।

BLAST vs Bangladesh (HC), পৃষ্ঠা ৩৬৩ এর ২০ নং প্যারাতে বলা হয়, “This sub-section provides that the police officer shall transmit to the nearest Magistrate copy of the entries in the diary hereinafter prescribed relating to the case. There is reference of diary in subsequent section 172 of the Code. However, it appears to us that by using the expression hereinafter prescribed in sub-section (1) of section 167, the case diary as mentioned in section 172 is meant because in section 167 (1) it is also mentioned as follows “the diary hereinafter prescribed relating to the section 167(1). Thus, the police officer shall be bound to transmit copy of the entries of the case diary to the Magistrate at the time when the accused is produced before him under that provision.”

উক্ত ডায়েরি বি পি ফ্রম নং ৩৮ এ লিখতে হয়  এবং  পি আর বি এর রেগুলেশন নং ২৬৪ তে কিভাবে উক্ত ডায়েরি রাখতে হয় তার  বিস্তারিত আছে। রেগুলেশন নং ২৬৩ অনুসারে আসামী কখন অপরাধের তথ্য পেলো, কখন সে তদন্ত শুরু করলো এবং ডায়েরি লিপি শেষ করলো প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপ এর বর্ননা থাকে। ফৌজদারি কার্য বিধির ১৬৭ মোতাবেক পুলিশ ২৪ ঘন্টাতে তদন্ত  শেষ করার চেষ্টা করবেন কিন্তু কোনো কারণে  তদন্ত শেষ করতে না পারলে কোনো ব্যক্তি কে কেন গ্রেপ্তার করলেন ও তার বিরুদ্ধে কি রকম অভিযোগ বা সংবাদ যা দৃঢ় ভিত্তিক এবং  কেনো তা বিশ্বাস যোগ্য তা বিস্তারিত কেস ডায়েরিতে উল্লেখ করবেন। এতে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর Judicial mind apply করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

আবার ফৌজদারি কার্য বিধি এর ধারা ১৭২  এ আছে – ‘যে কোন ফৌজদারী আদালত উক্ত আদালতে অনুসন্ধান বা বিচারাধীন কোন মামলার পুলিশ ডায়েরি  চেয়ে পাঠাতে পারেন । Criminal Rules and Order, 2009 এর ৭৫ (১) বিধি তে বলা হয়েছে যখনই পুলিশ কেস ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উত্থাপন করা হবে তখনই কেস ডায়েরি উত্থাপন করা হবে। আমাদের পবিত্র সংবিধানে  ১৫২ অনুচ্ছেদে আছে, “আইন” অর্থ কোন আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতি;” অর্থাৎ Criminal Rules and Order ও সকলের জন্যে আইন। অনুচ্ছেদ ৭ এ আছে -সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন আবার  অনুচ্ছেদ ৩২ এ আছে – আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।

BLAST vs Bangladesh (হাইকোর্ট) মামলায় আরো বলা হয়, “The order for detaining in police custody is passed by a Magistrate in exercise of the power given to him under sub-section (2) of this section. If the requirement of sub-section (I) are not fulfilled, the Magistrate cannot pass an order under sub-section (2) for detaining a person even not to speak of detention in police custody.”

একই ভাবে Saifuzzaman vs. State and others (56 DLR (HCD) 2004 (324)} মামলায় ৫৬ নং দফা এর ৭ নং উপদফাতে বলা হয়,

” vii) If a person is produced before a Magistrate with a prayer for his detention in any custody, without producing a copy of the entries in the diary as per item No (iv) above, the Magistrate shall release him in accordance with section 169 of the Code on taking a bond from him.” এখানে ‘any custody’ দিয়ে বুঝানো হয়েছে পুলিশ custody অথবা জেল custody।

উপরে উল্লেখিত BLAST vs Bangladesh মামলাটি আপিল বিভাগে যায়। সেখানে মাননীয় আপিল বিভাগের BLAST vs Bangladesh (AD) মামলা তে ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারকদের জন্য গাইডলাইনে বলা হয়েছে, ‘কোন যুক্তিতে, কাউকে কোনো তথ্যে বা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, ঠিকানাসহ তা কেস ডায়েরিতে লিখতে হবে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ (১) ধারা অনুসারে ডায়েরির অনুলিপি ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে আদালতে হাজির করে আটকাদেশ চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট, আদালত, ট্রাইব্যুনাল একটি বন্ড গ্রহণ করে তাকে মুক্তি দিয়ে দেবেন’। আর ১৬৭ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনো আদালতে হাজির করা হলে শর্তগুলো পূরণ করা হয়েছে কি-না, সেটা দেখা ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের দায়িত্ব। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ যদি কাউকে আইনের বাইরে গিয়ে আটক করে থাকেন, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট দণ্ডবিধির ২২০ ধারায় তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন’।

পি আর বি এর ২১ এ আছে ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ এর কাজে হস্তক্ষেপ করবে না কিন্তু যারা cognizance করেন তাদের তদন্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব আছে মর্মে স্মরণ করানো হয়েছে। আর  বিচারকরা বিচার কাজে  সম্পূর্ণ স্বাধীন। সংবিধানের ১১৬( ক) তে আছে –  এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিষ্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। পুলিশ এর পুলিশ আইন, ১৮৬১ (The Police Act, 1861) এর ২৩(১) (৬) ধারায় আছে – উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত সকল প্রকার বৈধ আদেশ দ্রুত পালন ও কার্যকরী করা ও অপরাধের বৃত্তান্ত অনুসন্ধান বা উদঘাটন করা পুলিশ এর দায়িত্ব। উক্ত আইনের ২৯ ধারায় আছে – কর্তব্যচ্যুতির কোন নিয়ম স্বেচ্ছাকৃত অমান্য করলে ও উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি করা যাবে। সে জন্যে পুলিশ আইন অনুযায়ী কাজ করবেন। তাছাড়া আমাদের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে আছে – সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিকদায়িত্ব পালন করা এবং… প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য৷ তাছাড়া ৩১ অনুচ্ছেদে আছে “…এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং…অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।”

আবার UDHR (Universal declaration of Human Rights) এর অনুচ্ছেদ ৯ তে আছে – ” No one shall be subjected to arbitrary arrest, detention or exile.” ICCPR (International Covenant on Civil and Political Rights) এর অনুচ্ছেদ ৯ তে আছে-

“1. Everyone has the right to liberty and security of person. No one shall be subjected to arbitrary arrest or detention. No one shall be deprived of his liberty except on such grounds and in accordance with such procedure as are established by law.

2. Anyone who is arrested shall be informed, at the time of arrest, of the reasons for his arrest and shall be promptly informed of any charges against him.”বাংলাদেশ উক্ত দলিলটিতে এবং উক্ত অনুচ্ছেদ এর উপর কোনো reservation ছাড়া অনুস্বাক্ষর করেছে। আমাদের সংবিধান এর ২৫ অনুচ্ছেদ এ আছে, “.. .. এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা(-respect for international law and the principles enunciated in the United Nations Charter)… রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং …”

আর কেস ডায়েরি ব্যতীত forwarding লেটার এর ভিত্তি যখন আসামী কে পুলিশ custody কিংবা জেল custody তে আসামী কে পাঠানো হয় তখন অনেকের মতে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ যে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন না সে বিষয়ে সমালোচনা করেন। উপরের BLAST vs Bangladesh মামলায় মাননীয় বিচারপতি Hamidul Haque বলেন, “But unfortunately though these three legal requirement are not fulfilled the Magistrate as a routine matter passes his order on the forwarding letter of the police officer either for detaining the person for further period in jail or in police custody.”

আবার Saifuzzaman vs. State and others (56 DLR (HCD) 2004 (324) মামলায় ৫৭ নং দফাতে কড়াভাবে বলা হয়, “If the police officers and the Magistrates tail to comply with above requirements, within the prescribed time as fixed herein, they would be rendered liable to he punished for contempt of Court, if any application is made by the aggrieved person in this Court. The police officers and the Magistrates shall follow the requirements strictly so that no citizen is harassed nor his fundamental right guaranteed in part Ill of the Constitution at any event is curtailed.”

এখানে উল্লেখ্য যে সরকার মাননীয় আপিল বিভাগে উপরে উল্লেখিত রায় {BLAST vs Bangladesh, (AD)} এর বিরুদ্ধে রিভিউ করেছেন কিন্তু তা বর্তমানে যে আইন আছে তা সংশোধন না করার জন্যে। রাষ্ট্রপক্ষ এর রিভিউ আবেদনে বলা হয়, এ দুটি ধারা(৫৪. ও ১৬৭) সংশ্লিষ্ট যে আইনে রয়েছে, তা যথেষ্ট ও সঠিক এবং এজন্য আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই। আর উপরের আলোচনা উপরের ১৬৭ ও বাংলাদেশে প্রচলিত অন্যান্য আইনের বিধি ও ধারার উপর করা হয়েছে। আর মাননীয় আপিল বিভাগ ও  তাঁর নির্দেশনাগুলো স্থগিত করেননি।

উপরের আলোচনা থেকে এটি পরিস্কার যে আইন মোতাবেক আসামী চালান এর সাথে অবশ্যই  কেস ডায়েরি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দিতে হয়। আমাদের পুলিশ আমাদের গর্ব। তাঁরা করোনা ভাইরাস এর সময় কিংবা জঙ্গি দমনে সফল হয়েছে। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণে শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। তাঁরা অবশ্যই সংবিধান, আইন অনুসারে কাজ করবেন বলেই সবাই বিশাস করে। এতে অনর্থক সমালোচনা বন্ধ হবে এবং সংবিধান, আইন ও মানবাধিকার সমুন্নত থাকবে।

চন্দন কান্তি নাথ : সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কুমিল্লা।