আদালতে ভার্চুয়াল ও একচুয়ালের মিশ্রনেই হতে পারে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার উপায়

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৯ মে, ২০২০ ১০:৩৮ অপরাহ্ণ
এ. এন. এম. মোরশেদ খান, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, রাঙ্গামটি

এ. এন. এম. মোরশেদ খান ( নাঈম মোরশেদ):

বৈশ্বিক করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রনে পৃথিবীর মানুষ আজ বড়ই অসহায়। তার চেয়ে বেশী অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে করোনা সংক্রমন ঠেকানোর কৌশলের সাথে জীবিকার সংস্থান কৌশল সমন্বয় করার কাজে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন আঙ্গিকে করোনা নিয়ন্ত্রনকে মাথায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি এবং শারিরীক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জীবিকা কৌশল নির্ধারন করছে। আমাদেরও সে পথে হাঁটার বিকল্প নেই। তাই সরকার ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত আকারে জরুরী সরকারী বেসরকারী কাজকর্ম সম্পাদনের পক্ষে সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু এ কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, শপিংমল, গণপরিবহন, শ্রমনির্ভর কারখানা, হাসপাতাল ও আদালতসহ যে সমস্ত স্থানে জনসমাগম অনিবার্য সে সব স্থানে শারিরীক দূরত্ব রক্ষার কৌশল কী হবে তা নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে।

আদালত ব্যতিত বাকি সব জায়গার কৌশলের সফলতা নির্ভর করছে জনসচেতনতা ও বস্তুগত অবকাঠামোর উপর। কেননা সে সমস্ত জায়গায় আইনী বাধ্যবাদকতার জটিলতা নেই। কিন্তু আদালত কার্যক্রমের বিরাট অংশজুড়ে সেবা দাতা ও সেবা গ্রহিতাদের শারীরিক উপস্থিতির আইনী বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবুও আদালতের বিচার কর্মের কিছু অংশ সংশ্লিষ্টদের শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে করা সম্ভব – তা ইতোমধ্যে আসামীর জামিন বিষয়ে ভার্চুয়াল শুনানী করে প্রমানিত হয়েছে।

আদালত পূর্ণ মাত্রায় চালুর ক্ষেত্রে সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব রক্ষার কৌশল তাহলে কীরুপ হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আদালতের কাজকে পরিষ্কার দুটি ভাগে ভাগ করে দেখতে চাই।

ক. সেবা গ্রহিতাদের শারীরীক উপস্থিতি আবশ্যক এমন কাজ
খ. সেবা গ্রহিতাদের শারীরিক উপস্থিতি অনাবশ্যক এমন কাজ।

ক. শ্রেণীতে রয়েছে ( বিদ্যমান অবস্থায় আপাতত ভার্চুয়ালী সম্ভব নয়)

১. ওকালতনামা, কোর্ট ফি ও বিভিন্ন ফরম সংগ্রহ। ২. ওকালতনামা, আরজি, দরখাস্ত ইত্যাদিতে বিচারপ্রার্থীর স্বাক্ষর প্রদান। ৩. মামলার দলিলাদি কৌশলীর নিকট বুঝিয়ে দেয়া। ৪. কোর্ট ফি সংযুক্তকরন। ৫. ফৌজদারী মামলা দায়ের করা। ৬. দেওয়ানী মামলার এভিডেভিট সম্পাদন করা। ৭. মামলার ফাইলিং নথি দাখিল। ৮. অন্যান্য যাবতীয় কাগজপত্র আদালতে দাখিল। ৯. আদালত থেকে সহিমোহরকৃত নকল সংগ্রহ। ১০. বিজ্ঞ কৌশলী কর্তৃক নথি পরিদর্শন। ১১. আসামী গ্রেফতার ও আদালতে উপস্থাপন। ১২. আসামীর রিমান্ড শুনানী। ১৩. ফোজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারা ও ৩৬৪ ধারার পদ্ধতি অনুসরনে আসামীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ডকরন। ১৪. ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সাক্ষীর বক্তব্য রেকর্ড করন। ১৫. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ২২ ধারা অনুযায়ী ভিক্টিম / সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা। ১৬. শিশু আইন ও পারিবারিক আইন মোতাবেক নাবালক শিশুকে বিচারক কর্তৃক ( প্রয়োজনে) প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষন ও পরীক্ষন। ১৭. আলামত উদ্ধার, আলামত ও আলামতের নমুনা সংরক্ষন, নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রেরন, আলামত ধ্বংসকরন। ১৮. আপোষ বৈঠক। ১৯. আসামীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ও তা পড়ে শুনানো। ২০. সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহন। ২১. ফৌজদারী কার্যবিধি ৫৪০ ধারায় আদালত যদি কারো ব্যাক্তিগত উপস্তিতির আদেশ দেন। ২২. অন্য কোন আইনে আদালত যদি কারো ব্যাক্তিগত উপস্থিতি আবশ্যক মনে করেন। ২৩. আসামী পরীক্ষা (আসামীর বক্তব্য রেকর্ড করন) ২৪. নিলাম বিক্রয় কার্যক্রম। ২৫. সমন, গ্রেফতারী পরোয়ানা সহ বিভিন্ন প্রসেস জারী ২৬. এ্যাটচমেন্ট ও রিসিভার কার্যক্রম। ২৭. ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত আদেশ জারিকরন। ২৮. দখল দেওয়ানী কার্যক্রম। ২৯. সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের ব্যাক্তিগত উপস্থিতি ছাড়া যে সব কাজ করা যায় না সেরুপ যে কোন বিচারিক কাজ। ৩০. আদালতে সংরক্ষিত সকল রেজিস্টার।

খ. শ্রেনীর কাজ সমূহ ( ভার্চুয়ালী সম্ভব)

১. মামলা ফাইলিং সংক্রান্ত তথা মোশন শুনানী। ২. কজলিষ্ট প্রকাশ তথা পক্ষদেরকে মামলার ধার্য তারিখ ও সময় মোবাইল এসএমএস এর মাধ্যমে বা ই-মেইলে জানানো। ৩. আত্ম সমর্পন ৪. শ্যোন এরেস্ট দরখাস্ত নিষ্পত্তি। ৫. জামিন দরখাস্ত সহ বিবিধ দরখাস্ত শুনানী। ৬. ই-মেইলে বন্ড দাখিল। ৭. ই- মেইলে রিলিজ অর্ডার প্রেরন। ৮. জব্দকৃত সম্পত্তির জিম্মা বিষয়ে শুনানী। ৯. ডিসচার্জ দরখাস্ত শুনানী ১০. নিষেধাজ্ঞা শুনানী ১১. এ্যাটাচমেন্ট ও রিসিভার শুনানী। ১২. নিলাম দরখাস্ত শুনানী। ১৩. দেওয়ানী ও ফৌজদারী কার্যবিধির বিবিধ দরখাস্ত শুনানী। ১৪. ই-মেইলে বা অন্য কোন ভর্চুয়াল মাধ্যমে নথির ছায়াকপি সরবরাহ ১৫. যুক্তিতর্ক ১৬. রায় প্রচার।

উপরোক্ত দুটি শ্রেনীর মাঝে “ক” শ্রেণীভুক্ত কাজ যেহেতু বিদ্যমান অবস্থায় ভার্চুয়ালী সম্পাদন করা সম্ভব নয় তা নিয়ে আলোচনার বিশেষ প্রযোজন নেই। শুধু এতটুকু বলা যায় সে কাজগুলো করার জন্য বিজ্ঞ কৌশলীগণ আদালত থেকে টেলিফোন যোগে পূর্বেই টাইম সিডিউল নিয়ে আসলে আদালতে মানুষের আগমন নিয়ন্ত্রন করে স্যোসাল ডিস্ট্যান্স রক্ষায় সহায়ক হবে। জেলা পর্যায়ে আদালতগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে এ সিডিউল মনিটর করলে তা আরও ভালো ফল দেবে আশা করি।

” খ” শ্রেণীর মধ্যে “আত্ম সমর্পন”, “শ্যোন এরেস্ট”, এবং “ই-মেইলে বা অন্য কোন ভার্চুয়াল মাধ্যেমে নথির কাগজপত্রের ছায়াকপি প্রদান” কর্যক্রম ব্যাতিত বাকী কাজগুলোর অনুরুপ কার্যক্রম ইতোমধ্যে জামিন শুনানীর সাথে জড়িত সকল কাজ করতে গিযে করা হয়েছে। তাই ঐসব বিষয় অভিজ্ঞতার আলোকে আরো ভালোভাবে করা যাবে মনে করি। তবে “শ্যোন এরেস্ট”, এবং “ই মেইলে বা অন্য কোন ভার্চুয়াল মাধ্যমে নথির কাগজপত্রের ছায়াকপি প্রদান” কর্যক্রম কৌশল কী হতে পারে সে বিষযে একটু পরিষ্কার করা দরকার।

“আত্ম সমর্পন”- আত্মসমর্পন দরখাস্তের সাথে আসামীর ছবি, জাতীয় পরিচয় পত্র/ জন্ম নিবন্ধন বা অন্য কোন পরিচিতিমূলক কাগজপত্র সংযুক্ত করবেন। শুনানীকালে আসামী সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর চেম্বারে হাজির থাকবেন; বিজ্ঞ আইনজীবী কর্তৃক সনাক্ত হবেন। জামিনের আদেশ পেলে ভার্চুয়ালী বন্ড দাখিল করবেন। জামিন না মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামী তার পরিচিতির মূল কাগজসহ জেলা কারাগারে হাজির হয়ে নিজেই জেল সুপারের কাছে রিপোর্ট করবেন। জেল সুপারকে আদালত থেকে আদেশটি আগেই অবগত করানো থাকবে। জেল সুপার আত্মসমর্পনকারীকে গ্রহন করে আদালতকে অবগত করবেন। আদেশ অমান্যকারী আসামীর বিরুদ্ধে কাস্টডি থেকে পলাতক গন্য করে দন্ডবিধি ২২৫খ ধারায় ও আদালতের আদেশ অমান্যের জন্য দন্ডবিধি ১৮৮ ধারায় নতুন মামলা আমলে নিয়ে সামারী ট্রায়াল করার সুযোগ রয়েছে। করোনাকালে আত্মসমর্পনকারীর স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় রাখার দাবী রাখে। সে অনুযায়ী কর্মকৌশল নেয়া যায়। থানায় আত্মসমর্পন করে জামিন চাওয়ার প্রকৃয়ার কথা কেহ কেহ লিখেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। কিন্তু তা বিভিন্ন কারনে আদালতে আত্ম সমর্পনের আইনবিজ্ঞানের সাথে খাপ খায়না মনে করি। এ ছাড়া আসামী নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে পারেন যা আদালত কার্যক্রমের নিজস্ব চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

” শ্যোন এ্যারেস্ট” – এ ক্ষেত্রে আসামী যেহেতু অন্য মামলায় গ্রেফতারকৃত আছে মর্মে পুলিশ দাবি করে সেহেতু সংশ্লিষ্ট জেলখানা থেকে ই-মেইলে আসামী এখনও কারাবন্দী আছে মর্মে নিশ্চিৎ হয়ে শ্যোন এ্যারেস্টের আদেশ দেয়া যায়।

“ই-মেইলে বা অন্য কোন ভার্চুয়াল মাধ্যমে নথির কাগজপত্রের ছায়াকপি প্রদান”:  সাধারনত কোন মামলার কোর্ট নথি থেকে কোন কাগজ পত্রের ফটোকপি দেয়ার রেওয়াজ নেই। কিন্তু বাস্তবতা হল মামলার নথির কিছু কাগজপত্রের ফটোকপি প্রায়ই মানুষের হাতে দেখা যায়। এটি অপেন সিক্রেটের মত অবস্থা। বিজ্ঞ আইনজীবী কর্তৃক জামিন শুনানীর জন্য মামলার কাগজ পত্র পর্যালোচনা করা আবশ্যক। তাই নথি থেকে আদেশপত্র ব্যাতিত বাকি সকল কাগজপত্রের কপি ই- মেইলে বা অন্য কোন ভার্চুয়াল মাধ্যমে বিজ্ঞ কৌশলীর চাহিদা মোতাবেক পাঠানোর নির্দেশনা থাকলে কাজটি সহজ হয়ে যায় মনে করি।

কেহ কেহ রিমান্ড শুনানীও ভার্চুয়ালী করা যায় মনে করতে পারেন। কিন্তু আসামীকে রিমান্ডে প্রেরনের পূর্বে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বচক্ষে পর্যবেক্ষন ও আসামীর ভয়মুক্ত বক্তব্য শ্রবনের বিচারিক বাধ্যবাদকতা আছে। যেটা আসামীকে কারাগারে বা থানা হেফাজতে রেখে কোন ভাবেই করা নিরাপদ হবেনা।

ফৌজদারী জামিন মিস কেইসে নকল দাখিলের বিষয়টির আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। এটি প্রাকটিস মাত্র। যেহেতু বিজ্ঞ দায়রা জজ নথি তলব ছাড়া এটা শুনানী করেন না, সেহেতু এ ধরনের মিস মামলায় দরখাস্তের সাথে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নথির কিছু দাখিল না করলেও শুনানী করার প্রাকটিস করা যায়।

বিজ্ঞ আইনজীবীগণ বেশী করে ওকালতনামা, ফরম ইত্যাদি আগাম কিনে চেম্বারে রাখলে সেসবের জন্য বার বার কারো বাইরে যেতে হয় না। আদালতের সাথে ভার্চুয়াল যোগাযোগের জন্য প্রত্যেক আইনজীবী নিজ নামে ই-মেইল একাউন্ট, ভার্চুয়াল শুনানীর একাউন্ট, মোবাইল নম্বর বার সমিতির মাধ্যমে আদালতকে অবগত করলে কাজগুলো আরও সহজ হয়ে যাবে।

আমরা হয়তো কোন প্রস্তুতি ছাড়া কোর্টে আংশিক কাজ ভার্চুয়ালী শুনানী শুরু করেছি। সে কার্যক্রমের আওতা সর্বক্ষেত্রে প্রসারিত করা সম্ভব না হলেও উপরোক্ত ‘খ’ শ্রেণীর কাজ সমূহে প্রসারিত করা সম্ভব বলে মনে করি। তার জন্য দরকার আমাদের ইতিবাচক মানসিক সাহস ও ব্যাক্তিগতভাবে ও সাংগঠনিকভাবে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট থাকা। আমরা ২০০৭ খ্রি. সনে জনবল সংকট ও আরও অনেক অভাব নিয়ে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি শুরু করেছিলাম। সেদিনও কেহ কেহ বলেছিলেন ২০২৫ সনের আগে এটা করা উচিৎ হবেনা। তবে সে অনুচিৎ কাজ আমরা করে সক্ষমতার প্রমান রেখেছি। আমাদের সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিয়ে সদাশয় সরকারও বিচার বিভাগের জন্য বেশ কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নিযেছে। সে সবের মাঝে ই- জুডিসিয়ারিও আছে। করোনা কালে পুরোটা না পারলেও আংশিক ভার্চুয়াল শুনানী করে ই- জুডিশিয়ারীর যে সামান্য হাতেখড়ি ইতোমধ্যে হয়েছে তার উপর ভর করে আজো যদি সাহস নিয়ে এগিযে যাই করোনা মোকাবেলায় যেমন বিচার বিভাগ ভূমিকা রাখতে পারবে, তেমনি ভবিষ্যৎ ই-জুডিসিয়ারির জন্যও এটা মাইল ফলক হয়ে থাকবে ইনশাল্লাহ।

এ. এন. এম. মোরশেদ খান (নাঈম মোরশেদ) : চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, রাঙ্গামটি।