দেনমোহর কখন দিতে হবে না, আর কখন অর্ধেক দিলেও চলবে

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২০ ৩:৩০ অপরাহ্ণ

শফিকুল ইসলাম:

যারা আইন পেশার সাথে সম্পৃক্ত অথবা আইনের ছাত্র-ছাত্রী রয়েছেন তাদের অনেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা হয়তো মজার ছলে জিজ্ঞাসা করেন যে, দেনমোহর না দিয়ে কোনভাবে পার পাওয়া যায় কিনা অথবা কম দেওয়া যায় কিনা ইত্যাদি। সাধরণত আমরা জানি দেনমোহর থেকে মাফ পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাস্তুবিক অর্থেও স্বাভাবিক অবস্থায় তাই দেনমোহর থেকে নিষ্কৃতির কোন রাস্তা নেই; তবে দুই একটা ব্যতিক্রম পরিস্থিতি আছে যেক্ষেত্রে কখনোকখনো স্ত্রী আংশিক দেনমোহরপ্রাপ্য হবেন এবং আর কয়েকটি ব্যতিক্রম পরিস্থিতি আছে যখন স্ত্রী একেবারেই কোন দেনমোহর প্রাপ্য নাও হতে হতে পারেন।

প্রথমত, আমরা একটু দেখে নেই দেনমোহর কি। দেনমোহর হল একটি বৈধ বিবাহে স্বামী তার স্ত্রীকে মর্যাদার প্রতীক হিসাবে যা প্রদান করে তাকেই দেনমোহর বলে। উপমহাদেশেশের বিখ্যাত আইনবিদ D.F MOLLAH বলেন, “Mahr or dower is a sum of money of the other property which the wife is entitled to receive from the husband in consideration of the marriage.” অর্থাৎ মোহর হল এমন কোন সম্পদ বা অর্থ যা স্ত্রী তার স্বামীর নিকট হতে বিবাহের প্রতিদান হিসাবে পাওয়ার অধিকার রাখে। দেনমোহরের প্রধান সোর্স বা উৎস হল পবিত্র কুরআন। সুরানিসার ৪ নং আয়াত এ আল্লাহ পাক বলেন-

وَءَاتُوا۟ ٱلنِّسَآءَ صَدُقَٰتِهِنَّ نِحْلَةً فَإِن طِبْنَ لَكُمْ عَن شَىْءٍ مِّنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيٓـًٔا مَّرِيٓـًٔا

অর্থঃ আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে। তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।

অতএব এটি স্ত্রীর অধিকার এবং সম্মানের স্বীকৃতি। দেনমোহরকে স্ত্রীর বিক্রয়মূল্য বা তার প্রতি দয়া দাক্ষিণ্য ভাববার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া দেনমোহর যদি বিক্রয়মূল্য হতো এবং এর মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীকে  কিনে নিতো তাহলে স্বামী স্ত্রীয়ের মধ্যে বৈবাহিক চুক্তির শর্ত পালন বাধাগ্রস্থ হতো। কেননা আমরা জানি যে কোন ব্যক্তি যখন কোন কিছু কিনে নেন তখন সেই বস্তু বা বিষয়ের উপর ক্রেতার একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় এবং বিক্রেতার এই বস্তুর উপর আর কোন মালিকানা বা দাবি থাকে না। কিন্তু বাস্তবে স্বামী স্ত্রীকে দেনমোহর দিয়ে দিলেও স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক মালিক আর সম্পত্তির মত নয়।

সাধারণত বৈধ বিয়ের পর দেনমোহর দিতেই হবে। স্বামী যদি দেনমোহর প্রদান না করে মারাও যান তবুও স্ত্রী স্বামীর সম্পদ থেকে দেনমোহর আদায় করতে পারেন বা আদায় না হওয়া পর্যন্ত তার অধিকারে রাখতে পারেন। তবে পূর্বেই বলা হয়েছেকিছু ব্যতিক্রম আছে যখন কিনা স্ত্রী কোন দেনমোহর পান না বা অর্ধেক দেনমোহর প্রাপ্য হোন।

­যখন স্ত্রী অর্ধেক দেনমোহর পাবে

যদি বৈধ বিবাহ হয় এবং দেনমোহর নির্ধারণ করা হয় কিন্তু যদি স্ত্রীয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক কিংবা দাম্পত্য নির্জনতা না পালন হয় সেক্ষেত্রে অর্ধেক দেনমোহর দিতে হবে। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-

“আর যদি মোহর সাব্যস্ত করার পর স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তাহলে যে, মোহর সাব্যস্ত করা হয়েছে তার অর্ধেক দিয়ে দিতে হবে” (আল কুরআন ২:২৩৭)

এছাড়া Taibi vs Nathai Sharif (1940)2MLJ345=191IC728 এই মামলায়ও আদালত এই বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন- If the marriage was not consummated and the amount of dower was specified in the contract she is entitled to half of the amount the amount.

স্ত্রী কখন কোন দেনমোহর নাও পেতে পারেনঃ

যদি বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সহবাস অথবা দাম্পত্য নির্জনতা পালিত হওয়ার পূর্বে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং যদি দেনমোহর নির্ধারিত না থাকে তাহলে কোন দেনমোহর পাওয়া থেকে স্ত্রী বঞ্চিত হতে পারেন।

এছাড়া যদি বিয়েটি অনিয়মিত (irregular marriage) ধরণের হয় এবং স্বামী স্ত্রীর মাধ্যে সহবাস না হলে, কোন পক্ষের মৃত্যু বা ডিভোর্স যেভাবেই বিয়েটির সমাপ্তি ঘটুক না কেন এবং দেনমোহর নির্ধারিত হোক বা না হোক স্ত্রী কোন দেনমোহর লাভ করবে না।

এখানে উল্ল্যখ্য যে, বিয়ে অনেক কারণেই অনিয়মিত হতে পারে। যেমনঃ সাক্ষীর উপস্থিতি না থাকা, পঞ্চম স্ত্রী গ্রহণ, ইদ্দত কালে বিয়ে ইত্যাদি। অনিয়মিত বিয়েতে হওয়া দূষণগুলি মুক্ত করে বৈধ বিয়েতে রুপান্তর করা যায়।এছাড়া কিছু আরো কিছু কারণে বিয়ে অনিয়মিত হতে পারে। এছাড়াও অনিয়মিত বিয়ের কারণ নিয়ে একটা অংশের আইনবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে।

এছাড়া খুলা তালাকের (Khula divorce) ক্ষেত্রে স্বামীর দেনমোহর প্রদান থেকে অব্যহতি পাওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। ‘(1952) PLR Lah.77’ এই মামলায় আদালত বলেন- “খুলা তালাক হল স্ত্রী স্বামীকে কোন কিছু ক্ষতিপূরণস্বরূপ দেওয়ার শর্তে স্বামীকে তালাক দিতে প্রস্তাব দেয় এবং এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেয়”।

এখানে তালাক স্বামীই প্রদান করে তবে প্রস্তাবটি আসে স্ত্রীর নিকট থেকে। এটাকে আবার স্ত্রী তালাক দিচ্ছে এমনটি ভাবা সঠিক হবে না। তবে খুলা তালাক হলেই যে স্ত্রী দেনমোহর পাবে না এমনটি নয়। এইখানে অবশ্যই দেখতে হবে যে স্ত্রী কি তার দেনমোহরের পরিবর্তে তালাকের প্রস্তাব করেছেন কিনা। কেননা দেনমোহর ছাড়াও অন্য কিছু প্রদানের প্রস্তাব দিয়েও স্ত্রী খুলা তালাক চাইতে পারেন।

আরেকটি হচ্ছে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় তার দেনমোহরের অধিকার ত্যাগ করেন। তবে সেটি কারো প্ররোচণা বা কুটিলতা মুক্ত অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্ত্রীর নিজের ইচ্ছায় হতে হবে। তবে এরূপ দাবি তুলে নেওয়ার পরেও পুনরায় দেনমোহর দাবী করতে পারে স্ত্রী। খলীফা হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) এমন একটি ঘটনার ব্যাপারে রায় দিতে গিয়ে বলেন যে, যদি স্ত্রী সত্যিই তার মোহর মাফ করে দিতেন তাহলে তিনি তা পুনরায় চাইতেন না। স্ত্রী মাফ করার পর পুনরায় মোহর চাওয়ার অর্থ তিনি প্রথমে প্রকৃত অর্থে তার মোহরের দাবি ত্যাগ করেননি। (Doi, Abdur Rahman; Shariah: The Islamic Law, 1997, Ta Ha Publishers, London, UK,159)

আমরা সাধরণত জানি স্ত্রীয়ের দেনমোহরের অধিকার কখনো ক্ষুণ্ণ হয়না। কারণ এটি স্ত্রীয়ের আইনগত ও ধর্মীয় অধিকার। তবে উপরে উল্লেখিত এই সকল বিশেষ ব্যতিক্রমী পরিস্থিতে দেনমোহর প্রদানের বিষয়ে শিথিলতা আসতে পারে। তবে এই ধরণের পরিস্থিতি সমাজে খুবই নগণ্য হওয়ায় এই বিষয়গুলি সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন।

লেখক: শিক্ষার্থী; আইন বিভাগ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।