মানবপাচার ও বাংলাদেশ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২০ ১২:২৮ অপরাহ্ণ
ফারিয়া ইফ্ফাত মীম

ফারিয়া ইফ্ফাত মীম:

জীবিকার তাগিদে মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটে চলে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে। এরই সাথে লোভনীয় চাকুরি এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার প্রলোভন ফাঁদে পা দিয়ে কেউ কেউ হারিয়েছে জীবন, কেউবা প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন সর্বস্ব হারিয়ে। মানব পাচারের এমন ঘটনা অগণিত।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন্স রিপোর্ট’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ধাপের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা’ আইনের ওপর ভিত্তি করে কোনো দেশ মানব পাচারের নজরদারিতে কতটুকু সক্ষম তার ওপর ভিত্তি করে স্তর নির্ধারণ করা হয়। যেসকল দেশ দৃশ্যত ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করতে পেরেছে তাদের প্রথম ধাপে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন উদ্যোগ, পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও পাচারসংক্রান্ত অভিযোগের সুরাহা না করা, তদন্তকার্যে দীর্ঘসূত্রতা, অবৈধ এজেন্ট চিহ্নিত করণে তেমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়া, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়া, দূতাবাস থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়া, বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ এখনো প্রবল। চেষ্টা চলমান থাকলেও ন্যূনতম মানদণ্ড দৃশ্যমান না হওয়ায় বাংলাদেশ এখনো দ্বিতীয় ধাপেই রয়ে গেছে।

একদিকে যেমন মানব পাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বাংলাদেশ এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা) একটি প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, অপরদিকে গত ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৩৫ জন বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি অবৈধ অভিবাসীকে তুরস্কের ইস্তামবুলে আটক করা হয়। করোনাকালীন সময়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীবিরোধী অভিযানে মে মাসেই ৭৮ অবৈধ বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। জাতিসংঘের মাদক অপরাধ দপ্তর (ইউএনওডিসি) এর মানব পাচার বিষয়ক সর্বশেষ ২০১৯ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের যে ১০টি নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মানব পাচার হয়েছে, বাংলাদেশের অবস্থান তার মধ্যে ৬ নম্বরে।

সম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় আবারও প্রবলভাবে ধরা পড়লো বাংলাদেশের মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের দালাল চক্র করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ইউরোপে নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান লিবিয়ার মিজদা শহরে পাঠায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের। সেখানে একটি স্থানীয় পাচারকারী চক্র তাদের আটকের পর মারধর ও মুক্তিপণ দাবি করে। এই নিয়ে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে অভিবাসীদের সংঘর্ষে একজন পাচারকারী নিহত হওয়ায় সেই হত্যার প্রতিশোধের জের ধরে ঐ ২৬ বাংলাদেশি এবং ৪ জন আফ্রিকার অভিবাসন প্রত্যাশীসহ মোট ৩০জন শিকার হন এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের। আরো ১১জন বাংলাদেশী ব্যক্তি আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। করোনাকালীন এই সময়ে নিহতদের মরদেহও ফেরত আনা সম্ভব হয়নি, দাফন করা হয় সেখানেই। এ পর্যন্ত এই ঘটনায় ২২টি মামলা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়ন করা হয় ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। এটি ২০১২ সালের ৩নং আইন। এই আইনের ধারা ৪৬ এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর ধারা ১৬ অনুযায়ী এই আইনের অধীনের অপরাধসমূহ অ-জামিনযোগ্য এবং অ-আপোষযোগ্য। এই আইনের ধারা ২১ এ দ্রুত বিচারের নিমিত্তে ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হলেও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য সাত বিভাগে ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের নির্দেশনা আসে এ বছর মার্চ মাসে, দীর্ঘ ৮ বছর পর। ধারা ২৪(১) অনুযায়ী এই আইনের অধীনে সংঘটিত কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সম্পাদন করবে এবং ২৪(২) অনুসারে উক্ত সময়সীমার মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে না পারলে তার কারণ ব্যাখ্যা করে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রতিবেদন প্রেরণ করতে হবে। বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সাল পর্যন্তই মামলার অধীনে মামলা হয়েছে ৪,৬৬৮টি যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,১৩৪।

স্বচ্ছল অর্থনৈতিক জীবনের আশায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়েই অভিবাসী প্রত্যাশীদের পাড়ি জমাতে হয় দেশ ছেড়ে বিদেশে। মানব পাচারকারীদের মাধ্যমেই অভিবাসন প্রত্যাশীরা পাড়ি দেন কখনো আকাশ পথে, রেলপথে আবার কখনো ভূমধ্যসাগরের ঝুঁকিপূর্ণ পথ, অনেক সময় পৌঁছানোর পূর্বেই নিতে হয় সলিল সমাধি। কখনো আবার আটক হতে হয় স্থানীয় পাচারকারী চক্রের কাছে, সেখানেও মোটা অংকের মুক্তিপণ চাওয়া হয়। এভাবেই অনেক অস্বচ্ছল পরিবার স্বচ্ছলতার আশায় নিঃস্ব হয়ে যেতে থাকেন, কখনো আবার চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হয় পরিবারের সেই প্রিয় মানুষটিকে। দেশে আইন বিদ্যমান থাকলেও আইনের প্রয়োগ কম হওয়া, ভুক্তভোগীদের আইনের প্রতি অনীহা, তদন্তে সময়ক্ষেপণ, দেশে কর্মসংস্থানের অপ্রতুলতা, এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ায় নজরদারির অভাব এবং দালালদের অবাধে বিচরণের ফলে দেশে মানব পাচারের সংকট এখনও বিদ্যমান এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শক্ত ও কঠোর পদক্ষেপ ব্যতীত অন্য কোনো বিকল্প নেই।

লেখকঃ মানবাধিকারকর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র।