বিচারক ও আইনজীবী: তুলনামূলক আলোচনা (পর্ব- ০১)

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২০ ১:২৬ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক:

মানবদেহের রোগ মুক্তির দায়ভার যেমন একজন ডাক্তারের উপর অর্পিত থাকে, ইঞ্জিনিয়ার তার ইটের গাঁথুনিতে অবকাঠামোর ভিত গড়ে, ঠিক তেমনি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিচারাঙ্গণ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। বিখ্যাত দার্শনিক ‘রোজার ডাটেন্স’ বলেছিলেন “বাঁচ এবং বাঁচতে দাও এই হলো সাধারণ বিচারের কথা।” বিচার হলো মূলত বিবাদমান দলের মধ্যকার বিরোধের বিষয়ের উপর একটি সিদ্বান্ত বা রায়। কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত রায়ে রূপান্তরিত করতে বিচারক, আইনজীবী, পক্ষ-বিপক্ষ, সাক্ষী একে অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইনজীবী আদালতের সামনে সাক্ষ্য প্রমাণ, জেরা, জবানবন্দী এবং সংশ্লিষ্ট আইনের উপস্থাপন করে থাকেন। আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই আইনজীবীদের প্রধান কর্তব্য ও দায়িত্ব। এককভাবে আদালতের পক্ষে সত্যকে উৎঘাটন করে আইনের সমর্থিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সেকারণেই আদালত ও আইনজীবীদের যৌথ সহযোগিতায় বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষিত হয়। আর এই সত্যতার স্বীকৃতি ঘটেছে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে।

কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, আমাদের বহু জেলাতে আইনের কূটতর্কের বিষয়টি ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে পড়ায় বহু ক্ষেত্রে বার ও বেঞ্চের মধ্যকার উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে আদালত বর্জন অনুষ্ঠান চলে। এই অবস্থা কখনও কাম্য নয় এবং তা ন্যায়বিচার প্রত্যাশীদের গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেওয়ার সামিল বলে গণ্য। আইন ও বিচারের প্রতি গণমানুষের শ্রদ্ধা যদি বাঁধার সৃষ্টি করে তবে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। কাজেই বিচারক, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে যার যার অবস্থান থেকে সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাতে পক্ষগণ অন্ততঃ বুঝতে পারেন যে, আদালতে ন্যায় বিচার হয়েছে। বিচারকের নীতিমালাতে স্পষ্ট বলা আছে যে, বিচারককে ভয় ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে বিচারকার্য সম্পাদন করতে হবে। বিচারক অবশ্যই ন্যায়নিষ্ঠ এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী হবেন। বিচারকরা এমন কোনো সংগঠনের সদস্য হবে না যা ধর্ম, বর্ণ, লিংগ ভেদাভেদের কারনে গঠিত হয়। একজন বিচারক অন্য কারও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য তার নিজের পরিচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না। বিচারককে আইনজীবী এবং বিচারপ্রার্থী জনগণেরর প্রতি ধ্যৈর্যশীল হবেন এবং সম্মানজনক আচরণ প্রদর্শণ করবে। বিচারক বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য কারো কাছ থেকে বিচারিক ক্ষমতার বিনিময়ে উপহার, অনুরোধ, ঋণ বা সুবিধা চাইতে পারবেন না। এক কথায় বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস থাকে, এমন আচরণ করতে হবে।

বিচারকের চোখ অন্ধ, আদালতের সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে, আইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে তিনি রায় ঘোষণা করেন। এখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা বাস্তবায়নের কোন সুযোগ নেই। যদিও দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারা, ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৬১(ক) ধারা আদালতকে বিপুল ক্ষমতা প্রদান করেছে। তবে আদালতের এই অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আইনের বিকল্প নয় বরং আইনের অনুপস্থিতিতে বিচারকের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতার সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায় বিচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিচারক আইন অনুযায়ী তাঁর বিচারকর্ম সম্পাদনে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিচারের রায় কোন এক পক্ষের অনুকূলে গেলে বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট হবেন এহেন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরী। কেননা বিচারক শুধুমাত্র তাঁর নিকট উপস্থাপিত সাক্ষ্য, প্রমাণ, যুক্তি-তর্ক বিবেচনায় রায় প্রদান করেন। এক্ষেত্রে পক্ষদের দূরদর্শিতা, সময়োপযোগী পদক্ষেপ, মামলার আলামত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সতর্কতা, সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন ইত্যাদি রায় নির্ধারণে বহুলাংশে ভূমিকা রাখে। বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কেঁদে যাবে বিচারকের অগোচরে। আর আইনজীবীগণ মিথ্যাবাদী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে! এক্ষেত্রে একটি উদাহরণের অবতারনা করা আবশ্যক। একজন ব্যক্তি কর্তৃক অপর একজন ব্যক্তির মৃত্যু হলে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি খুন বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে একজন মানুষ অপর একজন মানুষ কর্তৃক মৃত হলেই তা খুন বলে বিবেচিত হবে না। তা ক্ষেত্র বিশেষে নরহত্যা হিসাবে গণ্য হবে। কারণ আইনে নরহত্যা এবং খুন দুটি ভিন্ন অপরাধ যা দন্ডবিধির ধারা যথাক্রমে ২৯৯ ও ৩০০ তে বর্ণিত আছে।

ঠিক তেমনি একজন মানুষকে হত্যা করেও হত্যাকারী বেকসুর খালাস পাওয়ার দাবী রাখে যা দন্ডবিধির ৯৬ ধারায় (ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা অধিকার প্রয়োগকালে কৃত কোন কিছুই অপরাধ বলে গণ্য হবে না) বর্ণিত হয়েছে। কতিপয় ক্ষেত্রে দেহ (১০০ ধারা) এবং সম্পত্তি (১০৩ ধারা) রক্ষায় আক্রমণকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানো আইনের দৃষ্টিতে কোন অপরাধ হবে না। এক্ষেত্রে একজন আইনজীবী যদি তাঁর মক্কেলকে নির্দোষ দাবী করেন কিংবা এই যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, আমার মক্কেল খুন করেননি তবে তা আইন সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে সঠিকভাবে বোধগম্য হবে না বরং তিনি আইনজীবীকে মিথ্যাবাদী হিসাবে বিষোদগার করে যাবেন। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ আইনের এই সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবহেতু তা অধরাই থেকে যাবে।

অতীতে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পিপাসার অন্যতম খোরাক ছিল আইন। ফলে তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা, মননশীলতা, উন্নত আচরণ আইন পেশাকে অনেক উঁচুতে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আর জয় করেছিল মানুষের হৃদয়। কিন্তু এখন গণেশ উল্টে গেছে, দিক ভ্রান্ত পথিকের ভারে আইন পেশা দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়ছে! সাধারণ মানুষের কাছে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, আইন পেশায় আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার আশায় অন্য একটি পেশা ছেড়ে দিয়ে শেষ বেলাতে আইন পেশার দ্বারস্থ হন অনেকেই। নির্দিষ্ট বয়সসীমা না থাকায় অনেক সময় নীতি নৈতিকতাহীন ব্যক্তিবর্গের আগমনেরও সুযোগ ঘটে। ফলে হয়রানির স্বীকার হয় বিচার প্রত্যাশী অসহায় মানুষগুলো। তাই বলে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের প্রতারণায় দায়ে একটি পেশাকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। তবে প্রত্যেকটি পেশায় কতিপয় ব্যক্তি তাদের কৃত কর্মের সমালোচনা তথা ক্ষেত্র বিশেষে শাস্তি প্রাপ্তির যোগ্য বটে। এক্ষেত্রে সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ গুরুদায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বিচার বিভাগের একার পক্ষে তা অনেকাংশেই অসম্ভব।

পাঠক নিশ্চয়ই মনে আছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল অতিরিক্ত বিচারকের পদ থেকে শাহিদুর রহমানকে সরিয়ে দেন। ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান সৈয়দ শাহিদুর রহমান। ওই বছরের অক্টোবরে নাসিম সুলতানা কনা নামের এক নারী ‘ঘুষের বিনিময়ে জামিন’ করানো সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আনেন সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেন। কাউন্সিল অভিযোগ তদন্ত করে জানান, বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। যেহেতু অভিযোগটি গুরুতর সেহেতু অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে শাহিদুর রহমানের দায়িত্ব পালন করা উচিত নয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৬(৬) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে শাহিদুর রহমানকে অতিরিক্ত বিচারকের পদ থেকে অপসারণ করেন। এ অপসারণ আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন শাহিদুর। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রাষ্ট্রপতির অপসারণ আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হয়। আপিল আদালত ওই বিচারক আর বিচারক পদে আর ফিরতে পারবেন না বলে রায় দেন।

সিরাজ প্রামাণিক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com

চলবে…