জমি অধিগ্রহণ কি, কেন, কখন, কিভাবে?

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১২:১৪ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক: আমরা সবাই জানি, রাষ্ট্র বা সরকার দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবকাঠামো নির্মাণে দেশে প্রচলিত ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুসারে আপনার মালিকানাধীন বা দখলাধীন ভূমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। অর্থাৎ সরকার জনস্বার্থে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে যেমন শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলপথ, সড়ক বা সেতুর প্রবেশ পথ বা এ জাতীয় অন্য কিছুর জন্য জমি অধিগ্রহণ করার প্রয়োজন পড়লে সরকার দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কারো জমি অধিগ্রহণ করতে পারে। তবে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ ধারা (১৩) অনুসারে ধর্মীয় উপাসনালয়, কবরস্থান ও শ্মশান অধিগ্রহণ করা যাবে না। তবে শর্ত আছে যে, এগুলোও অধিগ্রহণ করা যাবে যদি তা জনস্বার্থে একান্ত অপরিহার্য হয়। সেক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ব্যক্তি বা সংস্থার অর্থে স্থানান্তর ও পুনঃনির্মাণ করে দিতে হবে।

আপনার জমি অধিগ্রহণ হলে কি করবেন
আপনার অনেক কিছুই করার আছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ এর ধারা (৫) অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে ৪ ধারার নোটিশ জারির পর আপনি পনের (১৫) কার্য দিবসের মধ্যে অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের নিকট আপত্তি দাখিল করতে পারবেন। আপত্তি পাওয়ার পর সম্পত্তির পরিমাণ ৫০ বিঘার ঊর্ধ্বে হলে তার মতামত সংবলিত প্রতিবেদনসহ নথি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত জন্য প্রেরণ করবেন। আর জমির পরিমাণ ৫০ বিঘার কম হলে আপনার মতামত সংবলিত প্রতিবেদনসহ নথি কমিশনারের কাছে প্রেরণ করবেন।

সরকার বা কমিশনার কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত জনপ্রয়োজন বা জনস্বার্থে গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, এর বিরুদ্ধে কোথাও আপীল করা যাবে না। সবশেষে দেখা যাচ্ছে যে, ৩ এবং ৪ ধারার নোটিশ জারি করার পরই কেবল শেষবারের মতো ৭ ধারায় নোটিশ জারি করা হয়। ৭ ধারায় নোটিশ জারির পর আর কোনো অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

জমির মূল্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিভাবে আদায় করবেন
নোটিশ জারির সময় সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বাজার মূল্য নির্ধারণের সময় উক্ত স্থাবর সম্পত্তির পারিপার্শ্বিক এলাকার সমশ্রেণির এবং সমান সুবিধাযুক্ত স্থাবর সম্পত্তির নোটিশ জারির পূর্বের ১২ (বার) মাসের গড় মূল্য হিসাব করা হবে। তবে যে বিষয়গুলি সরকার পক্ষ থেকে বিবেচনা করা হয় সেগুলো নিম্নরূপ:

১। জমির উপর দণ্ডায়মান যে কোনো ফসল বা বৃক্ষের জন্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতি;
২। অধিগ্রহণের কারণে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিদ্যমান অপর স্থাবর সম্পত্তি হতে প্রস্তাবিত স্থাবর সম্পত্তি বিভাজনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি;
৩। অধিগ্রহণের কারণে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্যান্য স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি বা উপার্জনের উপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি;
৪। অধিগ্রহণের কারণে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তার আবাসস্থল বা ব্যবসা কেন্দ্র স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হলে উক্তরূপ স্থানান্তরের জন্য যুক্তিসংগত খরচাদি।
৫। সরকারি কোনো প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাজারদরের উপর অতিরিক্ত শতকরা ২০০ (দুইশত) ভাগ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। (অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্য ২ কোটি হলে আপনাকে আরো ৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে)
৬। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে উক্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে বাজারদরের উপর অতিরিক্ত শতকরা ৩০০ (তিনশত) ভাগ। (অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্য ২ কোটি হলে আপনাকে আরো ৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে)
৭। অন্যান্য কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য উক্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে বাজারদরের উপর অতিরিক্ত শতকরা ১০০ (একশত) ভাগ। (অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্য ২ কোটি হলে আপনাকে আরো ২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে)
৮। উল্লিখিত ক্ষতিপূরণ প্রদান ব্যতীত, নির্ধারিত পদ্ধতিতে, অধিগ্রহণের কারণে বাস্তচ্যুত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বর্গাদারের আবাদ করা ফসলসহ কোনো স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হলে ফসলের জন্য জেলা প্রশাসক যেমন ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবেন, একই রকম ক্ষতিপূরণ বর্গাদারকে দিতে হবে।

ক্ষতিপূরণ মঞ্জুরির প্রাক্কলিত অর্থ জমা দেওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসক ক্ষতিপূরণের অর্থ বুঝিয়ে দেবেন। কোনো ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের অর্থ নিতে অসম্মত হলে বা ক্ষতিপূরণ নেওয়ার দাবিদার পাওয়া না গেলে অথবা ক্ষতিপূরণ দাবিদারের মালিকানা নিয়ে কোনো আপত্তি দেখা দিলে ক্ষতিপূরণের অর্থ সরকারি কোষাগারে রাখা হবে। অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ হওয়ার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে গেজেট জারির মাধ্যমে অধিগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হবে।

রাষ্ট্র কর্তৃক ভূমি অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি নিয়ে মামলা করা যাবে কি-না?
অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি নিয়ে প্রদত্ত কোন আদেশ বা কোন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন ধরণের মামলা বা আবেদন গ্রহণ করার এখতিয়ার রহিত করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখন আইন, ২০১৭ এর (৪৭) ধারায় অধিগ্রহণ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা না করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এরপরও ৮ ধারায় নোটিশ জারির পরেও অসাধু চক্রের যোগসাজশে টাইটেল স্যুট দায়ের করছে। এতে করে ভূমির মালিকগণ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্ভোগের স্বীকার হচ্ছে। সংবিধানের ৪২(২) অনুচ্ছেদেও ক্ষতিপূরণসহ বাধ্যতামূলকভাবে স্থাবর সম্পত্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন বা মামলা না করার বিষয়ে বলা হয়েছে। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয় অধিগ্রহণ সম্পর্কিত ভূমি নিয়ে কোন প্রকার মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করা নিয়ে পরিপত্র জারি করেছে।

অধিগ্রহণ সম্পত্তি পুনঃগ্রহণ
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও সম্পত্তি হুকুম দখল আইন, ২০১৭ এর ১৯ (১) ও (২) ধারা মোতাবেক প্রত্যাশী সংস্থার অনুকূলে অধিগৃহীত সম্পত্তি যে উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে বা বিক্রয়, লিজ, এওয়াজ বা অন্যে কানোভাবে হস্তান্তর করা হলে অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তি জেলা প্রশাসক কর্তৃক পুনঃগ্রহণ করে সরকারি দাগ খতিয়ানে আনয়ন পূর্বক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন। এখানে ভূমির মালিক যদি কোন ক্ষতিপূরণ না নেন তবে তার একধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। প্রায়ই এমন দেখা যায়, যে উদ্দেশ্যে কোনো জমি হুকুমদখল করা হয় তা অন্য উদ্দেশ্যে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহত হচ্ছে আবার কখনো কখনো এটাও লক্ষ্য করা যতটুকু ভূমি হুকুমদখল প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি জমি হুকুমদখল করান এবং তা দীর্ঘদীন ফেলে রাখেন এতে ভূমির মতন বিরল সম্পদের উপর চাপ পড়ে।

বর্তমানে কার্যকর ভূমি আইনটি অধিগ্রহণকৃত সম্পত্তির মালিকদের মনে একটু স্বস্তি ফিরিয়ে আনলেও ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অনিয়ম-দুর্নীতি এবং আইনগত বেশ ফাঁক-ফোকড়ের ফলে জমির মালিকগণ সঠিক উপায়ে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারছেন না। জমি অধিগ্রহণ হলে এমনিতেই জমির মালিক হতাশায় ভোগেন তার উপর যখন এসব হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়, তার তখন আর্তনাদ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বিশেষ করে অধিগ্রহণ শাখা থেকে বিভিন্ন রেকর্ডীয় মালিকের কাছে নোটিস পাঠিয়ে বিষয়টি জটিল করে তোলা হয়। অনেকেই টাকার লোভে জমির প্রকৃত মালিক না হয়েও একে অন্যের বিরুদ্ধে আপত্তি দায়ের করেন। বর্তমান আইনে তখনই ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে যায়। এর মাধ্যমে ঘুষের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। এমনও অনেকে আছেন যার শেষ সম্বল ওইটুকু জমি যা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তাই ক্ষতিপূরণ যথাসম্ভব দ্রুত প্রদান করে তাদের পুনর্বাসন করা উচিৎ।

সিরাজ প্রামাণিক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com