বিদায়ী বছরের আলোচিত রায়সমূহ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৩ জানুয়ারি, ২০২১ ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
সালতামামি -২০২০

করোনা মহামারির বছরে দুই পদ্ধতিতে (ভার্চ্যুয়াল ও শারীরিকভাবে) উচ্চ আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে অনেক আলোচিত রায় ও আদেশ এসেছে দেশের উচ্চ আদালত থেকে।

ক্ষতিপূরণের রায় পেয়েছেন পা হারানো রাসেল সরকার ও বিনাদোষে জেল খাটা জাহালম। জামিন প্রত্যাহার করা হয়েছে আলোচিত কারাবন্দী ঠিকাদার জিকে শামীমের। ফেসবুকে স্ট্যাটাসের জেরে এক আইনজীবী ক্ষমা চেয়ে পার পেলেও অপর আইনজীবীকে তিন মাসের জন্য আইনপেশা পরিচালনা থেকে বিরত রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। ঠিক করে দিয়েছেন যাবজ্জীবন দণ্ডের সীমাও।

তাৎক্ষণিক মৌলিক অধিকার রক্ষায় অন্তত তিনবার রাতে বসেছিলেন হাইকোর্ট বিভাগ। রাতে বসে আদেশের কারণে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেয়েছেন বরিশালের চার শিশু। নিজ পিতার বাসায় ফিরেছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেলের দুই নাতি। একই সুযোগ পেয়েছেন কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদেরে দুই ভাতিজিও।

তবে করোনার কারণে যখন সব বন্ধ হয়ে গেছে তখন জনগণকে আইনি প্রতিকার দিতে বসে থাকেনি বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ। ফুল কোর্ট সভা করে ভার্চ্যুয়াল আদালত চালানোর বিষয়ে মতামত তুলে ধরেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ। অপরদিকে নির্বাহী বিভাগ ভার্চ্যুয়াল আদালতের অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। শুরু হয় ভার্চ্যুয়াল বিচার কাজ। পরে সংসদ বসার পর তা আইনে পরিণত করা হয়।

জি কে শামীম
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যে ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গুলশানের নিকেতনে শামীমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় ওই ভবন থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা, এফডিআর, আগ্নেয়াস্ত্র ও মদ উদ্ধার ক‌রে আইন-শৃঙ্খলা বা‌হিনী।

ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ ও ৬ তারিখে তিনি হাইকোর্টের দুই বেঞ্চ থেকে অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় জামিন পান। মাসখানেক পরে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। এরপর ৮ মার্চ সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ দুই মামলায় তার জামিন প্রত্যাহার করেন।

রাসেল সরকার
মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল গ্রিন লাইন পরিবহনের ধাক্কায় প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ঘটনায় অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি রিট আবেদন করেন। এই রিট আবেদনে হাইকোর্ট ওই বছরের ১৪ মে রুল জারি করেন। এ রুল বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় রাসেল সরকারকে চিকিৎসা ব্যয়সহ মোট ১৩ লাখ টাকা দেয় গ্রিন লাইন। তবে রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১ অক্টোবর তিন মাসের মধ্যে আরও ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে গ্রিনলাইনকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

জাহালম
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে একটি জাতীয় দৈনিকে ৩৩ মামলায় ‘ভুল’ আসামি জেলে ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না…’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, মামলার বাদীসহ চারজনকে তলব করেন হাইকোর্ট। এছাড়া রুলও জারি করেন । ৩ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্টরা হাজিরের পর হাইকোর্ট জাহালমকে মুক্তির নির্দেশ দেন।

পরে এ ঘটনায় জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানির শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর এক রায়ে হাইকোর্ট জাহালমকে ১৫ লাখ টকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংকে নির্দেশ দেন। অবশ্য এ রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেছে ব্র্যাংকটি।

রাতের আদেশ
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় শিশু ধর্ষ‌ণের অভি‌যো‌গে দা‌য়ের করা মামলায় চার শিশুকে জামিন না দিয়ে য‌শোর কি‌শোর উন্নয়ন কে‌ন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। ওই শিশুদেরকে পুলিশভ্যানে তোলার সময় তাদের কান্নায় হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে তা উচ্চ আদালতের নজরে আসে।

৮ অক্টোবর রাতে হাইকোর্ট তাদের জামিন নিস্পত্তি করতে আদেশ দিয়ে ওই চার শিশু‌কে রাতের মধ্যেই এসি মাইক্রোবাসে করে তাদের অভিভাবকদের নিকট পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালত তাদেরকে জামিন দেওয়ার পর রাতের মধ্যে তাদের যশোর থেকে মাইক্রোবাসে করে বরিশালে রওনা দেন কর্মকর্তারা। পরদিন সকালে শিশুদের অভিভাবকদের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

৪ অক্টোবর শনিবার রাতে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে আলোচনা হচ্ছিলো সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল কে এস নবীর ছোট ছেলের দুটি শিশু নিয়ে। যাদেরকে তাদের চাচা বাসায় ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ। কিছুদিন আগে যারা বাবা হারিয়েছিলো। আর এ টকশোটি হাইকোর্ট বিভাগের নজরে আসায় শনিবার দিনগত মধ্যরাতে স্বপ্রণোদিত হয়ে তাৎক্ষণিক আদেশ দেন। আদেশে ওই দুই শিশুকে তাদের বাসায় নিরাপদে রেখে আসতে ধানমণ্ডি থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। আদেশ অনুসারে রাত দেড়টার দিকে ওসি তাদের বাসায় পৌঁছে দেন।

বাবা মারা যাওয়ার পর সৎ মা সঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদের দুই ভাতিজিকে তাদের বাবা মোস্তফা জগলুল ওয়াহিদের গুলশান ২–এ ৯৫ নম্বর সড়কের বাসায় ঢুকতে দিচ্ছেন না। এ রকম প্রতিবেদন নজরে আসার পর ২৬ অক্টোবর রাতে দুই বোনকে অনতিবিলম্বে তাদের বাবার বাসায় প্রবেশ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এ আদেশ অনুসারে গুলশান থানার ওসি রাতেই দুই বোনকে বাবার বাসায় উঠিয়ে দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

ফেসবুক স্ট্যাটাস
আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বিচার বিভাগ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন অভিযোগ তুলে তা আপিল বিভাগের নজরে আনেন প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আপিল বিভাগ বিষয়টি আমলে নিয়ে তাকে শোকজ করে তলব করেন। পরে সৈয়দ মামুন মাহবুব আপিল বিভাগে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের অবমাননাকর কাজ থেকে বিরত থাকার নিশ্চয়তা দেন। শুনানি শেষে ২৩ আগস্ট তার আদালত অবমাননার মামলা নিষ্পত্তি করে দেন।

পরবর্তীতে আইনজীবী ইউনুছ আলীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আদালত নিয়ে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেওয়ায় অভিযোগ আনেন তৎকালীন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। আপিল বিভাগ তা আমলে নিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর তাকে তলব করে দুই সপ্তাহের জন্য আইনপেশা থেকে বরখাস্ত করেন। এছাড়া তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্লক এবং আপত্তিকর স্ট্যাটাস অপসারণ করতে বিটিআরটিসিকে নির্দেশ দেন। পরে ইউনুছ আলী হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। শুনানি শেষে ১২ অক্টোবর আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে তিন মাস ইউনুছ আলীকে সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

যাবজ্জীবন
২০০১ সালে সাভারে এক হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক আসামির মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন সর্বোচ্চ আদালত। রায় ঘোষণার সময় আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে আমৃত্যু কারাবাস বলে উল্লেখ করেন। তখন যাবজ্জীবনের সময়সীমা নিয়ে আলোচনা সামনে আসে। এ অবস্থায় আসামিও এ রায় রিভিউ চেয়ে আবেদন করেন। সেই রিভিউ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে ১ ডিসেম্বর রায় দেন আপিল বিভাগ।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুপ্রিম কোর্ট তাদের সংক্ষিপ্ত আদেশে যেটা বলছেন (সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে), যাবজ্জীবন বলতে বোঝা যাচ্ছে যে সারাজীবনই হবে। আমৃত্যু হবে। তবে বিভিন্ন আইন, ধারা উপধারা বিশ্লেষণ করে আদালত বলছেন যে এটা (যাবজ্জীবন) ৩০ বছর। ধারাগুলো যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে ৩০ বছর। কিন্তু যদি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কেনো মামলায় কারো যদি আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন সে ক্ষেত্রে ৩০ বছরের বিধানটি হবে না। আমৃত্যু হবে।

এদিকে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও দুর্নীতি-অনিয়ম-অবিচারের সাজায় গত বছর ব্যস্ত ছিল ঢাকার আদালতপাড়া। দেশের বিচারাঙ্গনে ২০২০ সাল সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল- সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা, কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণ মামলা, মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের অস্ত্র মামলা, পাপিয়া দম্পতির অস্ত্র মামলা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পায়েল হত্যা মামলার রায়।

সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা: ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড
রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গত ২০ জানুয়ারি ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। ঢাকার অতিরিক্ত তৃতীয় মহানগর দায়রা জজ রবিউল আলম এ রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হুজির সদস্য মুফতি মঈন উদ্দিন শেখ, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মহিবুল মুত্তাকিন, আমিনুল মুরসালিন, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান ও নূর ইসলাম। এদের মধ্যে প্রথম চারজন কারাগার, বাকিরা পলাতক। মামলার পলাতক দুই আসামি মশিউর রহমান ও রফিকুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাদের খালাস দেয়া হয়।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশ চলাকালে বোমা হামলায় পাঁচজন নিহত ও অনেকে আহত হন। এ ঘটনায় সিপিবির তৎকালীন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান মতিঝিল থানায় মামলা করেন। এর দুই বছর পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মোমিন হোসেন।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার সঙ্গে যোগসূত্র পেয়ে ২০০৫ সালে আবার মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই হামলায় মামলা হওয়ার ১৩ বছর পর ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক মৃণাল কান্তি সাহা ১৩ জন আসামি চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার অতিরিক্ত তৃতীয় মহানগর দায়রা জজ আদালত।

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ: মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামি মজনুকে গত ১৯ নভেম্বর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। পাশাপাশি মজনুকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার এ রায় ঘোষণা করেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, বিদায়ী বছরের ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে কুর্মিটোলা এলাকায় নামেন ওই ঢাবি ছাত্রী। এরপর তার মুখ চেপে ধরে সড়কের পেছনে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরদিন সকালে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে ওই ছাত্রীর বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। এরপর ৮ জানুয়ারি মজনুকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

১৬ মার্চ ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মজনুর বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আবু বক্কর। ২৬ আগস্ট ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার ভার্চুয়াল আদালতে মজনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। ১৩ কার্যদিবসে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষ হয়।

অস্ত্র মামলায় সাহেদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলায় ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া অস্ত্র আইনের ১৯ (এফ) ধারায় তার সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় ঘোষণা করেন।

গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র‍্যাব। অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম ওঠে। এ ঘটনার পর পালিয়ে যান সাহেদ। ১৫ জুলাই সাহেদকে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। পরে তাকে হেলিকপ্টারে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আনা হয়।

করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১৬ জুলাই সাহেদকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এরপর ১৯ জুলাই তাকে নিয়ে উত্তরার বাসার সামনে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। সেখানে সাহেদের সাদা প্রাইভেটকার থেকে পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ১০ বোতল ফেনসিডিল, একটি পিস্তল এবং একটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর উত্তরা পশ্চিম থানায় অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করা হয়।

৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়। এরপর ২৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলায় ১৪ সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময় ১১ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন।

পাপিয়া দম্পতির ২০ বছরের কারাদণ্ড
নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলায় ১২ অক্টোবর দুজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া অস্ত্র আইনের আরেক ধারায় তাদের সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। দুই ধারার কারাদণ্ড একই সঙ্গে চলবে বলে আদেশে উল্লেখ করেন বিচারক। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় ঘোষণা করেন।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশত্যাগের সময় পাপিয়া ও তার স্বামীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতারের পর ওইদিন রাতেই নরসিংদীর বাসায় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে হোটেল ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিং করা বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অভিযান চালানো হয়।

এছাড়া ফার্মগেট এলাকার ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডে অবস্থিত রওশন’স ডমিনো রিলিভো নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড জব্দ করে র‌্যাব।

ওই ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি, বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা করা হয়।

গত ২৯ জুন ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) র‌্যাবের উপ-পরিদর্শক আরিফুজ্জামান অস্ত্র আইনের মামলায় পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুরের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ২৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুরের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন। এ সময় তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। মামলায় ১২ সাক্ষীর সবাই আদালতে সাক্ষ্য দেন।

নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী পায়েল হত্যায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড
বাস থেকে ফেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান পায়েল হত্যা মামলায় ১ নভেম্বর তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন হানিফ পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার জনি, চালক জামাল হোসেন ও তার সহকারী ফয়সাল হোসেন। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২১ জুলাই রাতে দুই বন্ধু আকিবুর রহমান আদর এবং মহিউদ্দিন শান্তর সঙ্গে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার পর নিখোঁজ হন পায়েল। ২৩ জুলাই মুন্সিগঞ্জের ভাটেরচর সেতুর নিচ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে গজারিয়া থানা পুলিশ।

এ ঘটনায় হানিফ পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার জনিকে ঢাকার মতিঝিল এবং চালক জামাল হোসেন ও তার সহকারী ফয়সাল হোসেনকে আরামবাগ থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে জামাল হোসেন ও ফয়সাল হোসেন দুই ভাই। এ ঘটনায় ২৪ জুলাই পায়েলের মামা গোলাম সরোয়ার্দী বিপ্লব বাদী হয়ে চালক, সহকারী ও সুপারভাইজারকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনায় ২৫ জুলাই আটক করা সুপারভাইজার জনি (৩৮) ও চালক জামাল হোসেন (৩৫) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

স্বীকারোক্তিতে তারা বলেন, গজারিয়ার একটি স্থানে বাস যানজটে পড়লে টয়লেট করার জন্য পায়েল বাস থেকে নামেন। যানজট ছুটে গেলে বাসটি চলতে শুরু করলে পায়েল দৌড়ে উঠতে গিয়ে মারাত্মক আহত হন। সেই অবস্থায় তাকে বাসে না তুলে অভিযুক্তরা পাশের সেতু দিয়ে নদীতে ফেলে দেন। পায়েলের সঙ্গে থাকা বন্ধুদের জানানো হয়, তিনি পরের গাড়িতে আসবেন।

গজারিয়া থানা পুলিশ তিনজনকে অভিযুক্ত করে ওই বছরের ৩ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। এ মামলায় ২৪ সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১৪ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামি পক্ষে চারজন সাফাই সাক্ষী দেন।

মামলার বিচারকাজ মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শুরু হয়। পরে পরিবারের আবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে মামলাটি চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে মামলাটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালেই বিচারাধীন ছিল। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারকাজ শুরু হয়।

হেফাজতে মৃত্যু: এসআই জাহিদসহ ৩ পুলিশের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
থানায় নিয়ে জনি নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় ৯ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান জাহিদসহ তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া মামলার অপর দুই আসামিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারক। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ রায় ঘোষণা করেন। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে এটি ছিল প্রথম রায়।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন- পল্লবী থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ও এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। এছাড়া এই তিন পুলিশ সদস্যের প্রত্যেককে বাদীকে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

সাত বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সোর্স সুমন ও রাশেদ। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাদের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুর-১১ নম্বর সেক্টরে স্থানীয় সাদেকের ছেলের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান চলাকালে পুলিশের সোর্স সুমন মেয়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় জনি ও তার ভাই সুমনকে চলে যেতে বলেন। সুমন চলে গেলেও পরদিন এসে আবার আগের মতো আচরণ করতে থাকেন। তখন জনি ও তার ভাই তাকে চলে যেতে বললে সুমন পুলিশকে ফোন করে তাদের ধরে নিয়ে যান। তাদের নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকার লোকজন ধাওয়া দিলে পুলিশ গুলি ছোড়ে।

পরে থানায় নিয়ে জনিকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে জনির অবস্থা খারাপ হলে ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই ঘটনায় ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নির্যাতন ও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন নিহত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি।

শিশু সামিউল হত্যায় মা ও প্রেমিকের মৃত্যুদণ্ড
রাজধানীর আদাবরে পরকীয়ার জেরে শিশু খন্দকার সামিউল আজিম ওয়াফিকে (৫) হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০ ডিসেম্বর তার মা এশা ও মায়ের প্রেমিক বাক্কুকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের ২৩ জুন পরকীয়া প্রেমিক শামসুজ্জামান আরিফ ওরফে বাক্কুর সঙ্গে মায়ের অনৈতিক ঘটনা দেখে ফেলায় সামিউলকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর মরদেহ গুম করতে ফ্রিজে লুকিয়ে রাখা হয়। মরদেহটি বস্তায় ঢুকিয়ে পরদিন ২৪ জুন রাস্তায় ফেলে দেয়া হয়। সেদিনই আদাবরের নবোদয় হাউজিং এলাকা থেকে সামিউলের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সামিউলের বাবা কে এ আজম বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী শাহান হক এশা ও বাক্কুর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।