ওয়ানটাইম প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধের এক বছর, দৃশ্যমান পদক্ষেপ কই?

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারি, ২০২১ ১:১৮ অপরাহ্ণ
ওয়ানটাইম প্লাস্টিক পণ্য এবং হাইকোর্ট

সামাজিক অনুষ্ঠান, বনভোজন এবং দোকানে খাবার ও পানীয় পরিবেশন করতে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে থার্মোকলের ‘ওয়ান টাইম’ বাসনকোসন। বিভিন্ন মার্কেটের ক্রোকারিজ দোকানে মিলছে এসব গ্লাস, প্লেট, চামচ ও বক্স। কিন্তু প্রচারণা ও সচেতনতার অভাবে এই পণ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো রয়ে যাচ্ছে আড়ালে।

রসায়নবিদরা বলছেন, থার্মোকলে থাকে থার্মোপ্লাস্টিক যৌগ পলিস্টাইরিন। স্টাইরিন ও ফেনিলিথিন পলিমারাইজেশনে পলিস্টাইরিন যৌগ তৈরি হয়।

এটি বিষ। পাশাপাশি ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ‘বিসফেনল এ’ ও নানা রাসায়নিক। আর এসব রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে প্রবেশ করে শরীরের ভারসাম্য নষ্টের পাশাপাশি কারণ হতে পারে ক্যান্সারেরও। বস্তুটি দেখতে যতটা সাদা, এর কাজ ততটাই কালো।

হালকা, সহজে পরিবহনযোগ্য ও সস্তা হওয়ায় অনেকে খাবারের প্লেট থেকে চায়ের কাপ সবকিছুতেই ‘ওয়ান টাইম’ পণ্য ব্যবহার করেন। এছাড়া পরিষ্কার করার ঝামেলা থেকে রেহাই পেতেও মানুষ বেছে নিচ্ছেন অস্বাস্থ্যকর এই পণ্য।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরাও বলছেন, থার্মোকলের ব্যবহার বন্ধ হওয়া দরকার। এটি মাটির সঙ্গে মেশে না। গাছের পানি শোষণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। থার্মোকল পোড়ালে সৃষ্ট কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসারে পলিথিন নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। ২০০২ সালে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপনও রয়েছে। কিন্তু প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী যেমন- কটন বার্ড, প্লাস্টিক বোতল, প্লেট, ব্যাগ ও ফুড প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

দেশের ৫৪টি নদী ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো বঙ্গোপসাগরে ফেলছে। এতে পানি, মৎস্য ও সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এমতাবস্থায় ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতিসহ (বেলা) ১১টি সংগঠনের পক্ষে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। রিটে বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও বিভিন্ন দেশের প্লাস্টিক রোধের কার্যক্রর ব্যবস্থাগুলো আদালতে তুলে ধরা হয়।

রিটকারী অন্য সংগঠনগুলো হলো- এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো), পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়ুথ), সেভ দি কোস্টাল পিপলস্‌ (স্কোপ), রীচ টু আন রীচ (রান), বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বেডস), ইনিশিয়েটিভ ফর রাইটভিউ (আইআরভি), এ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি), সেল্‌ফ হেল্‌প এন্ড এ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (শ্যাডো) এবং সিলেট ও সেবা ফাউন্ডেশন।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে একবছরের মধ্যে দেশের সব উপকূলীয় অঞ্চল ও হোটেল-মোটেল-রেস্টুরেন্টে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক সামগ্রী ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এ সময়ের মধ্যে দেশের উপকূলীয় এলাকায়, পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাগ এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার, বহন, বিক্রি ও বাজারজাতকরণ বন্ধ করতে হবে।

পাশাপাশি আইন অনুসারে নিষিদ্ধ পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার বন্ধের বিষয়টিও কঠোরভাবে কার্যকর করতে বাজার তদারকি, উৎপাদন, কারখানা বন্ধ ও যন্ত্রপাতি জব্দ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত বছরের ৬ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

একইসঙ্গে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত।

চলতি বছরের গত ৫ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের ওই আদেশের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী এদিন প্লাস্টিক বন্ধের ব্যাপারে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে বিবাদীদের জানাতে বলা হয়।

শিল্প মন্ত্রণালয় সচিব, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সচিব, বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সচিব, বাংলাদেশ প্লাস্টিক প্রোডাক্ট প্রডিউসার অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানসহ ৮ জন বিবাদীকে ওই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

কিন্তু আদালতের ওই আদেশ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা এ বিষয়ে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। এ বিষয়ে গৃহীত কোন পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়।

এতে নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব পণ্যের ব্যবহার তো কমেইনি বরং বেড়েছে। ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যদিও গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর পলিথিনের বিকল্প পাটের ব্যাগ উদ্ভাবনে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) আয়োজিত ‘হাই লেভেল পলিসি ডায়ালগ অন স্টপিং টক্সিক প্লাস্টিক ওয়েস্ট ট্রেড অ্যান্ড ইটস ট্রান্সবাউন্ডারি মুভমেন্ট’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সেমিনারে সরকারি বাসভবন থেকে যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘মানবদেহে ও পরিবেশের ওপর একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে সরকার এর ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে।’

পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, ‘ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক পণ্য মাটি ও পানিতে বছরের পর বছর থেকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার খাদ্যচক্রের সঙ্গে মিশে মানবস্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতিসাধন করে।

তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় বর্তমান সরকার ২০১০ সালে প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করার জন্য জুট প্যাকেজিং আইন পাস করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের এক হাজার ৪০০ ডেলিগেট ২০১৯ সালের ১০ মে প্লাস্টিক বর্জকে বাসেল কনভেনশনে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং এসব বর্জ্যকে একটি আইনি কাঠামোতে আনতে ঐক্যমত প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যের ট্রান্স-বাউন্ডারি মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। তাছাড়া, আমদানি নীতি ২০১৫-২০১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশে যেকোনও প্রকার বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পলিথিনের বিকল্প পাটের ব্যাগ উদ্ভাবনেও সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের সবার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খাবার ও ব্যক্তিগত পণ্যের মোড়ক, পানির বোতল, শ্যাম্পুর বোতল ও মিনি-প্যাক, কন্ডিশনার প্যাকেট, টুথপেস্ট টিউব, প্লাস্টিক টুথব্রাশ, টি-ব্যাগ এবং বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের চামচ, স্ট্র, প্লেট, কাপ, গ্লাসসহ সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০ লাখ ৯৫ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) জরিপ অনুযায়ী বার্ষিক ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়।

দেশে ব্যবহৃত একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-প্লাস্টিকের স্ট্র, কটনবাড, ফুড প্যাকেজিং, ফুড কনটেইনার, বোতল, প্লেট, প্লাস্টিক চামচ, প্লাস্টিক ব্যাগ ইত্যাদি।

মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্লাস্টিক কৃষি জমি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নদী-নালা, খাল-বিল ও সমুদ্রে পতিত হয়ে পরিবেশ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি করে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী পদ্মা নদীর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ ধরনের প্লাস্টিক পণ্য বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদন অনুযায়ী পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনা নদীর মাধ্যমে প্রায় ৭৩ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বঙ্গোপসাগরে মাছের পেটে এবং লবণের মধ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের অস্বিস্ত পাওয়া গেছে যা প্রাণিকুল ছাড়াও মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক সামগ্রী নিয়ন্ত্রণ ও রোধে বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

আদেশ অনুসারে, আগামীকাল রোববার (১০ জানুয়ারি) বিষয়টি ফের আদেশের জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আসবে। এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকদের চোখ তাই এখন উচ্চ আদালতের দিকেই।