সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী : সমস্যা ও সম্ভাবনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৪ এপ্রিল, ২০২১ ৩:০১ অপরাহ্ণ
রায়হান কাওসার, আইনজীবী

রায়হান কাওসার :
১৭৫৪ সাল। বাংলার ৮৩ বছরের বয়স্ক নবাব জনাব আলীবর্দী খাঁ স্বর্গে যাবার জন্য দিন গুনছেন। স্বর্গে যাবার আগে নবাবের শেষ ইচ্ছা নাতিকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার নবাবী দিয়ে যাবেন। নাতির বয়স ২০। নাতির নাম সিরাজউদ্দৌলা- ছোট মেয়ে আমিনার পুত্র। আলীবর্দী খাঁ ভাবলেন, অল্প বয়স্ক নাতি সিরাজের সিংহাসনে আরোহনের পর তার সম্ভাবনাময় একমাত্র শত্রু হতে পারেন হোসেন কুলি খান নামক এক সুদর্শন, বুদ্ধীদীপ্ত এবং সাহসী ভদ্রলোক। যিনি ছিলেন আলীবর্দী খাঁ’র বড় মেয়ে ঘষেটি বেগমের সচিব ও মূল পরামর্শক।

ঘষেটি বেগমের স্বামী নওয়াজেশ মোহাম্মদ খান ছিলেন রুগ্নদেহী এবং ক্ষমতার প্রতি উদাসীন একজন মানুষ। ফলে ঘষেটি বেগম তাঁর দেওয়ান হোসেন কুলি খানের উপর ছিলেন অনেকটা নির্ভরশীল এবং আসক্ত। তাঁর সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ করতেন না ঘষেটি বেগম। গুঞ্জন রয়েছে ঘষেটির রুগ্ন স্বামীর অবর্তমানে সুদর্শন ও সুপুরুষ হোসেন কুলি খানের সাথে ঘষেটি একান্তে মিলিত হতেন এবং ঘষেটির অন্দর মহলে নির্বিঘ্নে প্রবেশাধিকার কেবলমাত্র একজন পুরুষেরই ছিল। তিনি হলেন জনাব হোসেন কুলি খান।

অশীতিপর আলীবর্দী খাঁ ভাবলেন, ব্যাটা হোসেন কুলি খানকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে না। হোসেন কুলি খানের বেঁচে থাকা হবে আগামীদিনে সিরাজের সিংহাসন রক্ষার জন্য বড় বাধা। যথারীতি নাতি সিরাজকে তাঁর মনোবাসনা বাস্তবয়নের জন্য ইঙ্গীত দিয়ে দিলেন। নানার কথায় সিরাজ মুর্শীদাবাদের রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে সুদর্শন-বুদ্ধীদীপ্ত পুরুষ হোসেন কুলি খান ও তাঁর একমাত্র অন্ধ ভাইকে নিজ হাতে হত্যা করলেন। অন্ধ ভাই সহ অত্যন্ত কাছের মানুষের হত্যা ঘষেটি বেগমের নারী মনে চরমভাবে আঘাত হানে। হোসেন কুলি খানের বিদায় তাঁর হৃদয়কে চরমভাবে ব্যথিত করে। প্রকাশ্য দিবালোকে সিরাজের এই হত্যাকান্ড ঘষেটির নারী মনে প্রতিশোধের এক উত্তাল আগুনের সৃষ্টি করে।

বছর দুয়েক পরে জনাব আলীবর্দী খাঁ সিরাজকে নবাব বানিয়ে স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সিরাজউদ্দৌলা এখন নবাব। বাবা জয়েন উদ্দিন মৃত। কাছের বলতে শুধু আছেন মা এবং নানী। এদিকে বয়স মাত্র ২২। অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে তেমন কিছু নেই, তবে সৃষ্টি করেছেন শত্রু ঘরে-বাইরে ধূর্ত ও দুর্ধ্বষ ইংরেজ।

অন্যদিকে সেনাপতি সৈয়দ মীর জাফর আলী খানের সাথে সিরাজের নানা আলীবর্দী খাঁ তাঁর সৎ বোন শাহ খানুমকে বিয়ে দেন। পারস্য বা ইরান দেশ থেকে আগত মীরজাফর আলীবর্দী খাঁ’র অধীনে প্রথমে চাকুরী নিয়েছিলেন। তারপর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব দেখিয়ে সেনাপতির পদে আসীন হয়েছিলেন এবং আলীবর্দীর সৎ বোনকে বিয়ে করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যাই হোক, রাজ্যের প্রধান সেনাপতি এবং বিদায়ী নবাব আলীবর্দীর সৎ বোনের স্বামী মীর জাফরের বয়স তখন ৬৫ এবং যাকে নবাবী দিয়েছেন অর্থাৎ সিরাজের বয়স মাত্র ২২। তিন ভাগের একভাগ।

মীরজাফরের সৈনিক জীবনের সাহস, জীবনের চড়াই উৎরাই এবং অভিজ্ঞতার কাছে জনাব সিরাজ হয়ে গিয়েছিলেন এক অতিশয় ছেলে মানুষ। অনেক সিনিয়র আইনজীবীরা জুনিয়র আইনজীবীদের নিয়ে যেমন মন্তব্য করেন, এরা তো জুনিয়র মানুষ, বয়স কম। এরা আর কী বোঝে? তেমনি বাচ্চা সিরাজকেও মীর জাফর সাহেব বাচ্চা সিরাজ বলেই মনে করেছিলেন এবং নবাব হিসেবে তাকে মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। ফলে, আলীবর্দী সাহেব মরার পর থেকেই মীরজাফর একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।

মীর জাফর বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রধান সেনাপতি। সেনার সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। ফরাসী ও অন্যান্যদের সহযোগিতা নিয়ে মোট সেনা সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার। অন্যদিকে ইংরেজদের সৈন্য সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার। এত সৈন্য থাকার পরও মীরজাফর সাহেব চুপ থাকলেন। ঘষেটি বেগম এবং মীরজাফর ছিলেন অন্দরের শত্রু । অন্দরের শত্রু চিনতে পারেননি সিরাজ। মীরজাফর নিরব দর্শক হয়ে দেখলেন সবকিছু এবং সুযোগ বুঝে ছেলে মীরনকে পাঠালেন সিরাজকে জীবনের মত শেষ করে দেওয়ার জন্য। মীরনের নির্দেশে মোহাম্মাদী বেগ সিরাজের পটল তুলে দিলেন। মীর জাফর নাম মাত্র নবাব। ক্ষমতা চলে গেল ইংরেজদের হাতে। শুরু হয়ে গেল বিভাজন আর শোষণের ২০০ বছরের ইতিহাস।

সিরাজের পরাজয় বরণ করার পেছনে নানা কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল অন্দরমহলের শত্রু ঘষেটি বেগম এবং মীরজাফরের ষড়যন্ত্র। বিশ্বাসঘাতকতা একটি মানসিক অবস্থা যা ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত আন্দাজ করা যায় না। বিশ্বাসঘাতকতা যখন ধরা পড়ে তখন এটি শোধরানোর কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু সমূহ বিপদ ঘটাতে পারে এমন ব্যক্তিদেরকে বিপদ সীমার মধ্যে আসতে না দেওয়াই হলো দূরদর্শী নেতৃত্ব। মীরজাফর সাহেব যখন আলীবর্দী খানের সাথে প্রথম মারাঠা আক্রমণের ব্যাপারে মনোমালিন্য করেছিলেন তখনই জনাব আলীবর্দী খানের বোঝা উচিত ছিল একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, একজন ইরানী পরদেশী, একজন যোদ্ধা ২২ বছরের একজন তরুণের কমান্ড মানবে কিনা। যদি আস্থাভাজন না হয়ে থাকে তাহলে তাকে আগেই কৌশলে সরিয়ে না দিয়ে তরূণ সিরাজকে নবাব বানানো হয়েছিল জনাব আলীবর্দী খাঁ’র নবাব হিসেবে চরম অদূরদর্শিতা।

তবে আধুনিককালে নেতৃত্ব আর মনোনীত নয়; নির্বাচিত। একটি দেশের নাগরিকরা কিংবা কোন সংগঠনের সদস্যরা সরাসরি ভোটাধিকারের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। এখন আর সেই নবাবী আমল নেই। কাউকে ভালো লাগলো আর তাকে নেতা বানিয়ে দিলাম, তেমনটি হয়না। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক পন্থায় স্ব স্ব দল থেকে অনেক সময় স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীতার সৃষ্টি হয়। এবারের সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ২০২১-২২ কে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বিজ্ঞ আইনজীবীকে স্বতন্ত্রভাবে ইলেকশন করতে দেখা গিয়েছে। হয়তবা তাঁরা নিজ দলের মনোনয়ন বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

সত্যিকার অর্থে স্বতন্ত্র প্রার্থীতা সৃষ্টি হয় দল প্রদত্ত সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থার কারনে। বিদ্রোহী প্রার্থীরা মনে করেন দল থেকে তাদের প্রতি যথাযথ ন্যায় বিচার করা হয়নি। অন্যদিকে দল মনে করে যোগ্য প্রার্থীদেরকেই মনোনিত করা হয়েছে। এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারনেই বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সৃষ্টি যা অনেক সময় মূল দলের ইমেজ নষ্ট করে এবং দলের জন্য ক্ষতি ডেকে আনার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করে।

এই স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীতা এড়িয়ে যাবার কিছু পন্থা যে একেবারে নেই তা নয়। এক্ষেত্রে যদি সেসব পন্থা অবলম্বন করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন নিজ দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চেতনা ও চর্চা বাড়ানো যাবে, তেমনি বিভিন্ন সমিতি এবং জাতীয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও বেশি ফলপ্রসূ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে।

নিজেদের মধ্যে অসন্তোষ, মনোমালিন্য এবং তৎসৃষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থীর সূচনা যাতে না হয় এবং নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের প্রতি যাতে সর্বোচ্চ সমর্থন দেওয়া যায় সে লক্ষ্যে ইন্ট্রা-পার্টি এবং ইন্টার-পার্টি নির্বাচনের ব্যবস্থা এক্ষেত্রে ভাল একটি সমাধান। এতে করে দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা বাড়বে, অসন্তোষ কমবে এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তিগত পছন্দের লোকদের মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে যা গণতান্ত্রিক চেতনার মূল কথা।

ইন্ট্রা-পার্টি ইলেকশনে ভোটার হবেন অতীতে উক্ত পার্টি হতে নির্বাচিত সদস্যগণ। তাঁরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে মূল নির্বাচনে অর্থাৎ ইন্টার-পার্টি ইলেকশনে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। প্রতিটি পার্টি হতে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ মূল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক অনেক দেশেই নিজ দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা নেই। পরিবারতন্ত্র বা রাজতন্ত্রের কাছাকাছি। আমরা যদি গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন করতে চাই, জনগণের শাসন চাই, শক্তিশালী গণতন্ত্র চাই তাহলে নিজ দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার সূচনা করতে হবে প্রথমত। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য দলের সাথে সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে হবে। তবেই দল বা সমিতির মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা কমে গিয়ে সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে একটি সমিতি কিংবা বৃহৎ আকারে একটি দেশ এগিয়ে যাবে। আর সেক্ষত্রে ইন্ট্রা-পার্টি এবং ইন্টার-পার্টি নির্বাচনের ব্যবস্থা ভাল একটি সমাধান হতে পারে।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।