মুসলিমদের ‘গোপন বিবাহ’ বা ‘SECRET MARRIAGE’ অনুমোদিত নাকি ব্যভিচার!

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৬ এপ্রিল, ২০২১ ২:৩৩ অপরাহ্ণ
মোকাররামুছ সাকলান : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

মোকাররামুছ সাকলান :

বিয়ে একটি সামাজিক আচরণ। হিন্দু, মুসলিম, জাতিসত্তা ও অধিবাসী তারা প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব বিয়ের আচার-আচরন মেনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে। বিয়ে শব্দটার সাথে আনুষ্ঠানিকতা শব্দটা ব্যবহার করেছি কারন বিয়ে কখনো গোপনে করা যায় না। কেননা বিয়ের জন্য সমাজের স্বীকৃতি প্রয়োজন হয় নতুবা একজন পুরুষ বা নারীর একসাথে মিলিত থাকাকে ইসলামি আইন সমর্থন করে না।  যা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। পাশ্চাত্য দেশে নারী ও পুরুষ বিয়ে না করলেও তারা একসাথে বসবাস করে যাকে আমরা Live Together হিসাবে জানি। পাশ্চাত্য সমাজে বিয়ে বহির্ভূত Live Together গ্রহনযোগ্য সামাজিক আচরণ যা ইসলামী আইনে সম্পূর্ন নিষিদ্ধ এবং কোন মুসলিমের জন্য করা একদম হারাম। মুসলমানদের জন্য সমাজকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করা এবং স্বামী-স্ত্রী হিসাবে নিয়ম মাফিক বসবাস না করে অনিয়মিত Live Together বা ঘুরে বেড়ানো হারাম। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরাআনের সুরা আল-নিসা আয়াত ২৫ বলা আছে

نَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ

Marry them with the permission of their families and give them their due as is good, chaste women, neither fornicators nor secret mistresses.

ইসলামি বিশেষজ্ঞরা উপুর্যুক্ত আয়াতের secret mistresses শব্দগুলোর কারণে ‘secret marriage’ বা ‘গোপন বিবাহ’ কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গে ইবনে তায়মিয়াহ (Ibn Taymiyyah)লিখেছেন:

وَمَالِكٌ يُوجِبُ إعْلَانَ النِّكَاحِ وَنِكَاحُ السِّرِّ هُوَ مِنْ جِنْسِ نِكَاحِ الْبَغَايَا وَقَدْ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ فَنِكَاحُ السِّرِّ مِنْ جِنْسِ ذَوَاتِ الْأَخْدَانِ

Malik obligated announcing the marriage in public. A secret marriage is a type of prostitution. Allah Almighty said: Chaste women, neither fornicators nor secret mistresses. (4:25) Thus, a secret marriage is a type of secret mistress.

সুত্র: Majmū’ al-Fatāwá ৩২/১০২

ইসলামি বিশেষজ্ঞরা এক্ষত্রে বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর হাদিস থেকে বলে থাকেন যে তিনিও মসজিদে বিবাহ অনুষ্ঠান করতে বলেছেন এ প্রসঙ্গে নিম্নাক্ত সুত্রে বলা হচ্ছে-

Aisha reported: The Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, said:

أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ وَاجْعَلُوهُ فِي الْمَسَاجِدِ وَاضْرِبُوا عَلَيْهِ بِالدُّفُوفِ

Announce this marriage publicly, conduct it in the mosque, and strike the drums for it.

সুত্র: Sunan al-Tirmidhī  ১০৮৯,

Muhammad ibn Hatib বলেছেন: The Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, said:

فَصْلُ مَا بَيْنَ الْحَرَامِ وَالْحَلَالِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ

The difference between an unlawful and lawful marriage is the beating of drums and the raising of voices.

সুত্র: Sunan al-Tirmidhī ১০৮৮,

Abdullah ibn al-Zubayr বলেছেন: The Messenger of Allah, peace and blessings be upon him, said:

أَعْلِنُوا النِّكَاحَ

Announce the marriage.

সুত্র: Ṣaḥīḥ Ibn Ḥibbān ৪০৬৬,

উপর্যুক্ত প্রমানাদি থেকে বোঝা যায় যে বিবাহ গোপনে করা হয় তা বাতিল (invalid এবং annulled) এমনকি দু’জন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী এবং অভিবাবকের অনুমোদন হলেও।

এ প্রসঙ্গে Abu Bakr Abdul Aziz বলেছেন:

نِكَاحُ السِّرِّ بَاطِلٌ؛ لِأَنَّ أَحْمَدَ قَالَ إذَا تَزَوَّجَ بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْنِ لَا حَتَّى يُعْلِنَهُ

A secret marriage is invalid, as Ahmad said: If he is married with a guardian’s permission and two witnesses, it is not so until it is announced publicly.

সুত্র: al-Mughnī ৭/৮৩

Ibn Qudamah লিখেছেন:

فَإِنْ عَقَدَهُ بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْن فَأَسَرُّوه أَوْ تَوَاصَوْا بِكِتْمَانِه كُرِهَ ذَلِك وَصَحَّ النِّكَاحُ

If the marriage is contracted with a guardian and two witnesses, but he keeps it secret or conceals its attestation, that is disapproved but the marriage is valid.

Source: al-Mughnī ৭/৮৩

ঈবনে আল-কাইউম (Ibn al-Qayyim) লিখেছেন:

أَنَّ الشَّارِعَ اشْتَرَطَ لِلنِّكَاحِ شُرُوطًا زَائِدَةً عَلَى الْعَقْدِ تَقْطَعُ عَنْهُ شُبَهَ السِّفَاحِ كَالْإِعْلَامِ وَالْوَلِيِّ وَمَنْعِ امْرَأَةٍ أَنْ تَلِيَهُ بِنَفْسِهَا وَنَدَبَ إلَى إظْهَارِهِ حَتَّى اُسْتُحِبَّ فِيهِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ وَالْوَلِيمَةُ

The Law giver has set conditions for marriage, in addition to the contract, in order to cut off any suspicion of promiscuity, such as announcing it, the guardian, and preventing a woman from conducting it by herself. It is encouraged to publicize it, even recommended to beat the drums, raise voices, and hold a banquet.

সূত্র: I’lām al-Muwaqqi’īn ৩/১১৩

ইসলামী বিশেষজ্ঞদের উক্ত রূপ নিষেধকে হালকাভাবে নেবার কিছু নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হল আইনগত বৈধতা মানেই তা নৈতিক (moral and ethical) হবে তা নয়। আইন বিশ্লেষনে কিছু কিছু আইনজ্ঞ ‘গোপন বিবাহ’ ‘secret marriage’ কে বৈধ মনে করলেও তারা এটিকে উৎসাহ বা অনুমোদন দেন নাই। অধিকন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ ‘গোপন বিবাহ’ বা ‘secret marriage’ কে Adultery হিসাবে মনে করেন।

এ প্রসঙ্গে Abu al-Zubayr বলেন: Umar ibn al-Khattab, may Allah be pleased with him, was presented with a marriage which no one had witnessed except one man and one woman. Umar said:

هَذَا نِكَاحُ السِّرِّ وَلَا أُجِيزُهُ وَلَوْ كُنْتُ تَقَدَّمْتُ فِيهِ لَرَجَمْتُ

This is a secret marriage and I do not permit it. If I had known of it beforehand, I would have stoned them.

সূত্র: al-Muwaṭṭa’ ১১৩৬

এখানে পরিস্কার এক ধরনের হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে যে, তিনি যদি এমন ‘গোপন বিবাহ’ বা ‘secret marriage’ এর কথা জানতেন তবে তিনি পাথর ছুড়ে মারতেন।

Ibn Taymiyyah লিখেছেন:

وَأَمَّا نِكَاحُ السِّرِّ الَّذِي يَتَوَاصَوْنَ بِكِتْمَانِهِ وَلَا يُشْهِدُونَ عَلَيْهِ أَحَدًا فَهُوَ بَاطِلٌ عِنْدَ عَامَّةِ الْعُلَمَاءِ وَهُوَ مِنْ جِنْسِ السِّفَاحِ

As for a secret marriage, the attestation of which is concealed and witnessed by no one, it is invalid according to the prevalent opinion of scholars. It is a type of illicit intercourse.

সুত্র: Majmū’ al-Fatāwá ৩৩/১৫৮

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনায় বাংলাদেশের আইন বিশ্লষনে পাওয়া যায় যে বাংলাদেশের আইনও ‘গোপন বিবাহ’ বা ‘secret marriage’ সমর্থন করে না। বাংলাদেশে যেকোন বিবাহকে এজন্য রেজিস্ট্রিশন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারায় পরিস্কার ভাবে ২য় বিবাহের পূর্বে ১ম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নেবার বিধান করার কথা আছে। সুরা আল নিসার আয়াত ২৫ এর সাথে বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৬ ধারা সামঞ্জস্যপূর্ন। সামাজিক ভাবে ২য় বিবাহকে সমর্থন করতে গিয়ে রাস্ট্রীয় আইন আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি নেওয়াকে বাধ্যতা মূলক করে দিয়েছে। সুরা আল নিসার আয়াত ২৫, ১ম বা ২য় বা তার পরবর্তী যেকোন বিবাহের জন্য প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে Abdullah Vs. Rokeya Khatun মামলায় 21 DLR (HD) 213 পৃষ্ঠায় উল্লিখিত রায় প্রণিধানযোগ্য। উক্ত রায়ে বলা হয়েছে

“Section 5 of the Muslim Family Law Ordinance makes it absolutely necessary that the marriage solemnized under the Muslim Law shall be registered. The solemnization of Marriage if validly effected might not be effected for non-registration of the marriage. But the non-registration of the marriage causes a doubt on the solemnization of the marriage itself’’.

উক্ত রায়ে এমনকি বলা হয়েছে যে “co-habitation for a period of one year does not establish a valid marriage”.

আল কোরআনের আয়াত, হাদিস ও ইসলামি বিশেষজ্ঞদের বর্ননা, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ ও  আদালতের সিদ্ধান্ত সমূহ যুগপৎ ভাবে পড়লে এটা পরিস্কার বোঝা যাবে যে, কোন মুসলমান নারী ও পুরুষের বিবাহ সামজিক ভাবে স্বীকৃতি না পেলে তাকে কোনভাবেই অনুমোদিত বিবাহ বলা যাবে না। যেহেতু সামাজিক স্বীকৃতি কে আইন গ্রহন করে শাস্তি আরোপের বিধান করেছে তাই ইসলামিক পুর্বোক্ত বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী ‘গোপন বিবাহ’ বা ‘secret marriage’ ব্যভিচার বা Adultery এর পর্যায়ে পড়বে; বাংলাদেশে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং অনুমোদিত না।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ।

বি. দ্র.- প্রবন্ধটির তথ্য ও রেফারেন্স ইন্টারনেট থেকে সংকলিত। কোন রাজনৈতিক আলোচনা গ্রহনযোগ্য নয়। কোন কল্পিত চরিত্রের সাথে মিলে গেলে তার দায় সংকলকের নয়।