ভ্রমণ বৃত্তান্ত: পশ্চিমবঙ্গ বিচার ব্যবস্থা


প্রকাশিত :১৭.১১.২০১৭, ২:১২ অপরাহ্ণ


জাহাঙ্গীর আলম সরকার

১.
ভারত ভ্রমণের অংশ হিসাবে লেখক বিগত সময়গুলোতে ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলায় ভ্রমণের সময় জেলাগুলোর আদালত এলাকায় প্রবেশ করেন। সেখানকার আইনজীবী ও প্রান্তিক মানুষের সাথে আলাপচারিতায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিচারব্যবস্থা এবং বিচার প্রার্থী মানুষের নানা সমস্যা নিয়েও কথা বলেন। অত্র নিবন্ধ লেখকের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ আদালত পাড়ার অভিজ্ঞতার সার-সংক্ষেপ মাত্র। এই অভিজ্ঞতা লেখকের ব্যক্তিগত মতামত ছাড়া অন্য কিছু নয়। আইন, বিচার ব্যবস্থাসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে বিগত এক বছরে লেখক এ রাজ্যের বিচার ব্যবস্থার স্বরুপ উম্মোচনের চেষ্টা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য একটি নিয়মানুগ এবং সংগঠিত বিচার ব্যবস্থার আশীর্বাদ প্রাপ্ত, যা দ্রুত বিচার বিতরণে সাহায্য করে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মত ভারতেও, ভারত সরকার কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা অনুসরণ করে না। তবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সাথে ভারতের বিচার ব্যবস্থার অনেকাংশেই সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ভারত ঐকিক শাসন ব্যবস্থা পালন করে, যার অধীনে সুপ্রিমকোর্ট হল সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এবং যা প্রতিটি রাজ্যের উচ্চ আদালত দ্বারা সমর্থিত হয়। রাজ্যের বিচার ব্যবস্থার শীর্ষ হল কলকাতা হাইকোর্ট। যা একজন মুখ্য (প্রধান) বিচারপতির নেতৃত্বাধীন। ভারতের প্রাচীনতম উচ্চ আদালত হিসেবে এই রাজ্যের উচ্চ আদালত দাবী রাখে। গথিক স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত, এই উচ্চ আদালত তার ভাব গম্ভীর কাঠামোর সঙ্গে কলকাতার ব্যস্ত ও জনাকীর্ণ রাস্তার অভ্যন্তরে লম্বা ভাবে দন্ডায়মান।
পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মহকুমা আদালত, এমনকি জেলা ও দায়রা আদালত ভিজিট শেষে কলকাতা হাইকোর্ট-এ উপস্থিত হওয়ার অনুভূতি নগণ্য কিছু নয়। খোজ নিয়ে লেখক জানতে পেরেছেন যে, কলকাতা উচ্চ আদালতের অধীনে দুই ধরনের আদালত আছে। একটি হল ফৌজদারি আদালত যা অপরাধ মূলক বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করে এবং অন্যটি হল দেওয়ানী আদালত যা নাগরিকদের সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করে। অন্যদিকে জেলার সর্বোচ্চ আদালত, সেশন জজ্ কোর্ট অপরাধের মামলাগুলোর উপর কাজ করে। কলকাতার মত মহানগর এলাকায়, অপরাধের মামলাগুলো মহানগরী হাকিম দ্বারা কার্যকারী হয়। নাগরিক মামলায় অভিজ্ঞ বিচারবিভাগীয় কর্মচারীগণ শহরের দেওয়ানী আদালত গুলিতে কাজ করে থাকে। শ্রম আদালত ও শিল্প ট্রাইব্যুনাল, শ্রমিক এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিল্প বিরোধ সংক্রান্ত মামলার কাজ করে। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সাথে বহুলাংশেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের বিচার ব্যবস্থার।
পশ্চিমবঙ্গীয় বিচার ব্যবস্থা একটি পিরামিড আকৃতির অনুক্রমে সাজানো। এখানের আদালতের দুটি সমান্তরাল পিরামিড হল – দেওয়ানী আদালত ও ফৌজদারি আদালত। এই দুই পিরামিড এর শিখর উচ্চ আদালতে গিয়ে মিলিত হয়। অন্যান্য সমস্ত আদালত কলকাতার উচ্চ আদালতের কঠোর তত্ত্বাবধানের অন্তর্ভুক্ত। ফলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ অপরিসীম বৈকি।

২.
পশ্চিমবঙ্গ শহর দেওয়ানী আদালত সম্পর্কে না বললেই নয়। কলকাতা শহরের দেওয়ানী আদালতগুলি গুরুত্বপূর্ণ সব দেওয়ানী বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করে এবং আবেদনকারীদের দ্রুত বিচার প্রদান করতে সহায়তা করে। কলকাতার কিরণ শংকর রায় রোডে অবস্থিত, এই শহুরে দেওয়ানী আদালত ভারতের প্রাচীন দেওয়ানী আদালতের মধ্যে এক অন্যতম বলে দাবী রাখে। কলকাতা শহরের দেওয়ানী আদালত তার স্বচ্ছতা এবং কার্যকারিতার জন্য সুপরিচিত, যা দিয়ে বিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বিভিন্ন মামলার সাথে কারবার করেন।
কলকাতা শহরের দেওয়ানী আদালতের একটি সমৃদ্ধ বিচারবিভাগীয় ইতিহাস রয়েছে। এই আদালত আবেদনকারীদের স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দান করেছেন। বর্তমানে এই শহুরে দেওয়ানী আদালত বিচার বিভাগীয় ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দ্বারা চালিত হয়। এই আদালতের বিচারকর্তৃগণ মামলার স্বচ্ছতার জন্য সুপরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উচ্চ আদালতের কঠোর তত্ত্বাবধানে, কলকাতার এই শহুরে দেওয়ানী আদালত অসাধারণ স্বচ্ছতা এবং স্পষ্টতার সঙ্গে সব রকমের দেওয়ানী বিষয়গুলি নিয়ে কাজ কারবার করেন। আইনজীবীরা কঠোর বিধি এবং প্রবিধান অনুযায়ী তাদের মামলা প্রস্তুত করেন।

৩.
এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ আদালত, শ্রম আদালত এবং পশ্চিমবঙ্গের বিচারালয় সম্পর্কে। ভারতের এক অন্যতম প্রাচীন উচ্চ আদালত, কলকাতা উচ্চ আদালত ১৮৬২ সালের ১৪-ই মে ক্ষমতা পত্র দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিচারপতি পি.চক্রবর্তী ছিলেন প্রথম ভারতীয় বিচারকর্তা যিনি আদালতের বিভিন্ন মামলা উপর তত্ত্বাবধান করতেন। কলকাতা উচ্চ আদালতের একটি সমৃদ্ধ বিচারবিভাগীয় ইতিহাস রয়েছে, যা বিখ্যাত যুগান্তকারী রায় প্রদান করার জন্য সুপরিচিত। কলকাতা উচ্চ আদালত অসংখ্য অমীমাংসিত মামলার দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান করার জন্য সুপরিচিত। রাজ্যের নিম্ন আদালত গুলির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে, রাজ্যের যে কোন নাগরিক উচ্চ আদালতে আবেদন করতে পারেন।
পশ্চিমবঙ্গের শ্রম আদালত ও বিচারালয় শিল্প সংক্রান্ত বা শ্রমিক সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে দ্রুত বিচার প্রদানে সাহায্য করে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য একটি নিয়মানুগ এবং সংগঠিত শ্রম আদালত ও বিচারালয়ের আশীর্বাদ প্রাপ্ত, যা শ্রম সঙ্ঘ, শ্রম প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিচারবিভাগীয় সমস্যা বা কার্য বলের মনোভাবকে আঘাত করে এরকম কিছু সমস্যার সমাধান করে। শ্রম আদালত ও শ্রম বিচারালয় শ্রম-বিবাদ আইন ধারার অধীনে ১৯৪৭ সালে স্থাপন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার শ্রম আদালত ও শ্রম বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
শ্রম আদালত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত প্রদানে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছেন, যেমন কর্মক্ষেত্র থেকে শ্রমিক স্থগিত সংক্রান্ত বিষয়, রাজ্যের পৃথক শ্রমিক কল্যাণ সম্পর্কিত ধর্মঘট ও অন্যান্য অনেক বিষয়ের আইনগত মাত্রা। শ্রম বিচারালয়গুলি মজুরি সংক্রান্ত, কাজের সময়ের মেয়াদ, এবং সাধারণ শ্রমিকদের যৌথ সমস্যার সাথে সম্পর্কিত অন্য যে কোন বিষয়গুলিতে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। শ্রম আদালত এক কর্মকর্তার দ্বারা সভাপতিত্ব হয়, যিনি ন্যুনতম ৭ বছর ধরে এক বিচার বিভাগীয় কার্যালয়ে পরিবেশন করেন অথবা রাজ্যের আইন ধারা অনুযায়ী রাজ্যের শ্রম আদালতে অধিশয়িত কর্মকর্তা হিসাবে ন্যুনতম ৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এছাড়াও, অধিশয়িত কর্মকর্তা এক জেলা বিচারপতি বা অতিরিক্ত জেলা বিচারপতি হিসাবে একটানা তিন বছরের জন্য বা উচ্চ আদালতের একজন বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
পশ্চিমবঙ্গের আদালত পাড়ার অভিজ্ঞতা এবং এ রাজ্যের বিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত অত্র নিবন্ধ বিষয়ে কারো কোন প্রকার মতামত থাকলে মন্ত্যব প্রকাশ করতে পারেন। এ নিবন্ধের প্রতিটি বাক্যই যে বেদবাক্য লেখক এমনটা মনে করেন না। এটি লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পাঠককুলে ইচ্ছে করলে তাদের মতামতও প্রদান করতে পারেন।

লেখক: বাংলাদেশের নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। advsagar29@gmail.com



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon