মামলার ফাঁদে চট্টগ্রাম বন্দরে আটক ৭ বিদেশি জাহাজ

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ১২:৫২ অপরাহ্ণ
প্রতীকী ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরে এসে মামলার ফাঁদে পড়ে একযোগে আটকে গেল ৭টি বিদেশি ফিডার জাহাজ। শিপিং বাণিজ্যের ইতিহাসে একই সময়ে এতগুলো জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনা নজিরবিহীন। বাংলাদেশে এসে এভাবে হয়রানিতে পড়ায় বিদেশি জাহাজ মালিকদের মধ্যে আতংক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অপরদিকে, ফিডার জাহাজসমূহ আটকে পড়ার জেরে দেশের আমদানি–রপ্তানিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশংকা তৈরি হয়েছে।

মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের মামলায় আটকে গেছে জাহাজগুলো। তাদের মামলার প্রেক্ষিতে মোট ১৪টি জাহাজের বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি হয়েছে এডমিরালটি আদালত থেকে। মামলা হয়েছে এসব জাহাজের মালিক এবং মাস্টারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। গত ১১ জানুয়ারি এই আটকাদেশ দেয়া হয়। জাহাজগুলোর মধ্যে মাল্টা পতাকাবাহী কালামাতা ট্রেডার, সাইপ্রাস পতাকাবাহী ক্যাপে সাইরস, মাল্টা পতাকাবাহী টিজিনি, কামিল্লা, মাল্টা পতাকাবাহী সি মাস্টার, সিঙ্গাপুর পতাকাবাহী ম্যাজেস্টিক এবং ওইএল লংকা চট্টগ্রাম বন্দরে থাকায় আটকাদেশ কার্যকর হয়েছে। ওইএল মালয়েশিয়া রয়েছে চট্টগ্রামের পথে। এছাড়া, অন্য ৬টি জাহাজ আর চট্টগ্রাম বন্দরে আসে না।

এসব জাহাজ হলো : এন্ডারসন ব্রিজ, মেরাটাস মেডান, আরকা, হানসা কাসেলা, এমসিসি জাভা এবং ম্যাক্স সাটল।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে মেসার্স গ্লোবাল এগ্রো রিসোর্সেস কর্তৃক রপ্তানি করা আলু নিয়ে গিয়েছিল জাহাজগুলো। আমদানিকারক ছিল ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস মালয়েশিয়া। এসব আলুর রপ্তানি মূল্য বাবদ ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ২১৬ ডলার পাওনার দাবিতে মিডল্যান্ড ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসুদুজ্জামান মামলা দায়ের করেন এডমিরালটি আদালতে। মামলায় জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে আটকাদেশের আবেদন জানানো হয়। এডমিরালটি আদালত তা মঞ্জুর করে আটকাদেশ দেন। যে ৭টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ছিল সেগুলো তাতে আটকে গেছে। এরমধ্যে কয়েকটি জাহাজের এজেন্ট এবং লাইনও পরিবর্তন হয়েছে। সি মাস্টার ২০১৬ সালে যখন রপ্তানি পণ্য নিয়ে গিয়েছিল তখন এটা ছিল ওইএল–এর। আর স্থানীয় এজেন্ট ছিল জিবিএক্স। বর্তমানে এটা সীমাটেক লাইনের অধীনে পরিচালিত হয়। আর স্থানীয় এজেন্ট হচ্ছে সিএনসিএল। আমদানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনার খালাসের পর জাহাজটি নির্ধারিত রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার নিতে পারেনি। জাহাজটি আটকে গেছে। ম্যাজেস্টিক জাহাজটি আমদানি কন্টেইনার নামিয়ে বোঝাই করেছে রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার। জাহাজটি আটকে পড়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পণ্যের আমদানিকারক জার্মান প্রতিষ্ঠান সিএসএ।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ–সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, একই সময়ে এত সংখ্যক ফিডার জাহাজ আটকে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে তৈরি পোশাক শিল্প। যথাসময়ে কাঁচামাল আসবে না, আবার অনেকে সময় মত রপ্তানি করতে পারবে না। তাদেরকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্ট করতে হবে। তিনি আশংকা করেন, দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে ফিডার জাহাজ সংকটে। মাদার ভেসেলসমূহ বাংলাদেশমুখী পণ্যবোঝাই কন্টেইনার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে নামিয়ে দেয়। ফিডার জাহাজগুলো সেসব কন্টেইনার নিয়ে আসে চট্টগ্রামে। আবার এখান থেকে ইউরোপ, আমেরিকার রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার নিয়ে যায় মাদার ভেসেলে শিপমেন্টের জন্য।

মিডল্যান্ড ব্যাংক কর্তৃক ১৪টি জাহাজের বিরুদ্ধে মামলার সংবাদ গত শনিবারই জানাজানি হয়ে যায় দেশে–বিদেশে শিপিং সার্কেলে। শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানালেন, আলোচ্য ঘটনায় জাহাজের কোন দায়–দায়িত্ব না থাকা সত্ত্বেও মামলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের শিপিং বাণিজ্যে। বর্তমানে আলু রপ্তানির মওসুম। কিন্তু কোন শিপিংলাইন এ ধরনের পরিস্থিতিতে আলুর কন্টেইনার নেবে না। আটকে পড়া এক একটি জাহাজের দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে এ প্রসঙ্গে জানালেন, মামলার ফাঁদে জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনায় বিদেশি মালিকদের মধ্যে আতংক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজন আইনের সংস্কার ও যুগোপযোগী করা যাতে জাহাজ হয়রানিতে না পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইতিপূর্বে একইভাবে মামলার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে যাওয়া বেশ ক’টি জাহাজ এখনও ফিরে যেতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে দু’একটি জাহাজের ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণে মামলা হলেও অন্যান্য জাহাজ স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটকে দিয়েছে। অবস্থা এমন যে মাত্র লাখ দু’য়েক টাকা খরচ করলে ৫০ কোটি টাকার জাহাজ আটকে দেয়া যায়। জাহাজ আটকের জন্য মামলার উৎপত্তিতে সার্ভেয়ারদের যোগসাজশ থাকে। মামলায় ২০১১ সালে আটক একটি জাহাজ এখনও নোঙ্গর তুলতে পারেনি। দু’টি দেশীয় জাহাজও আটক আছে প্রায় ৩ বছর ধরে। ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ থেকে আটকে আছে গাগাসন যোহর। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী আতিকুর রহমান ২০১৫ সালের ১৮ মে থেকে আটক রয়েছে। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পানামা পতাকাবাহী সুইফট ক্রো আটক হয়।

জাহাজের আটকাদেশসমূহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আরজিতে আদালত আটকাদেশ প্রদান করে থাকে। এসব এডমিরালটি মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে জাহাজ মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অবস্থানের কারণে স্থানীয় এজেন্ট বা প্রটেক্টিং এজেন্ট ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। ফলে জাহাজের নাবিকরা নানা দুর্ভোগে পড়ে জাহাজ পরিত্যাগ করে চলে যান। জাহাজ নিয়ে পালিয়ে যেতেও বাধ্য হন। অতীতে এমভি ডেল্টা স্টার, এমভি জিংঈ জাহাজকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন নাবিকরা। আর কোনো প্রকার পোর্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই পালিয়েছিল টেকমেট পাইওনিয়ার জাহাজ। একশ্রেণির আমদানিকারক এবং শিপিং এজেন্টদের শিকারে পরিণত হয় গম, ক্লিংকার, কয়লা, লবণবোঝাই বিদেশি জাহাজগুলো। কোনো একটা অজুহাত তুলে তারা জাহাজ মালিকের কাছে থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি–ফিকির শুরু করে। হুমকি দেয়া হয় এডমিরালটি কোর্টে মামলা দায়েরের। এরপরও জাহাজ মালিক রাজি না হলে মামলা করে দেয়। ১০ লাখ টাকা ক্ষতির জন্য ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসে। শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানালেন, বাংলাদেশে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা একের পর এক জাহাজ এভাবে হয়রানিতে পড়ার ঘটনায় শিপিং কোম্পানিরা উদ্বিগ্ন। তারা এটাকে ভালভাবে নিচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

আদালত থেকে জাহাজের আটকাদেশের পর তা ন্যস্ত হয় বন্দরের হেফাজতে। আদালতের পুনরাদেশ ছাড়া জাহাজ যাতে বাংলাদেশের জলসীমা ত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে। জাহাজের ছাড়পত্র প্রদান ( এনওসি ) বন্ধ রাখে বন্দর কর্তৃপক্ষ। জানা যায়, ঢালাওভাবে জাহাজ আটক করার প্রবণতারোধ এবং আটক জাহাজের মামলা নিষ্পত্তি ৩ মাসের মধ্যে করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেটা হলে জাহাজ মালিকদের হয়রানি হ্রাস পেতো বলে অভিমত শিপিং সংশ্লিষ্টদের।

জেলা প্রতিনিধি/ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম