তাহলে দেশে কোর্ট কাচারি থাকার দরকার নাই: প্রধান বিচারপতি

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ৪ এপ্রিল, ২০২২ ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

একটি মামলায় ১০ বছরেও আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিতে না পারায় রাষ্ট্রপক্ষের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সর্বোচ্চ আদালত। এমনটি হলে দেশে আদালত থাকার দরকার নেই বলেও খেদ জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

রাজধানীর মগবাজার এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য অধিগ্রহণের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানিতে বারবার সময় চাওয়ায় বিরক্তি প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে তিন বিচারপতির আপিল বিভাগ। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ কমান্ডারের জায়গা অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের অধিগ্রহণ অবৈধ ঘোষণার রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিলের শুনানিতে তিন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ রোববার (৩ এপ্রিল) ক্ষোভ প্রকাশ করে।

শুনানিতে যা হল

শুনানির শুরুতে ১০ বছরেও মামলাটি শুনানির প্রস্তুতি না নেওয়ায় উষ্মা করে আদালত বলেন, ‘১০ বছরেও একটা মামলার প্রস্তুতি নিতে পারেন না, এটা লজ্জার।’

প্রস্তুতির জন্য বার বার সময় চাওয়ায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘যাদের ভিটে মাটি, আগে তো তাদের কথা ভাবতে হবে। একজনের ভিটে মাটি নিয়ে যাবেন, তা তো হয় না। তাহলে তো দেশে কোর্ট কাচারি থাকার দরকার নাই।’

মামলাটি গত ছয় মাস ধরেই শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রাখা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ বারবার সময় চেয়ে আসছে। আজও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী সময় চান।

এতে আদালত বিরক্তি প্রকাশ করলে মেহেদী বলেন, ‘তাহলে নিষ্পত্তি করে দেন মাই লর্ড।’

এতে উষ্মা প্রকাশ করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। এই আইন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমরা ডিসপসঅব (নিষ্পত্তি) করব না কী করব সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত। সেটা আপনার কাছ থেকে শুনে দিতে হবে নাকি?’

এ সময় সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘জনগণের যদি সুরক্ষাই না থাকে, আদালত বলে তো কিছু থাকল না… আমরা যদি এভাবে অ্যালাও করতে থাকি।’

সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনের দ্বারা আরোপিত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাইবে না।’

পরে আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য সোমবার দিন ঠিক করেন দেয়।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাছান চৌধুরী। রিটের পক্ষে ছিলেন আওসাফুর রহমান।

প্রেক্ষাপট

জানা গেছে, ঢাকার মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় ১৯৪৫ সালে দেশ ভাগের সময় বীরেন্দ্র নাথ রায় তার সাড়ে ১৯ কাঠা জমির আমমোক্তার (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) দিয়ে যান স্থানীয় সিরাজুল হককে।

২০ বছর পর ১৯৬৫-৬৬ সালে এ জমির খাজনা দিয়ে নিজের নামে নামজারি (মিউটেশন) করান। এরপর দীর্ঘদিন খাজনা না দেওয়ায় ১৯৯৯ সালে সরকার এ জমির খাজনা দাবি করে মামলা করে।

মামলার পর ১৯৯৯ সালের ২৫ জুলাই সিরাজুল হক ২ হাজার ৭৯২ টাকা খাজনা পরিশোধ করে জমির ভোগ-দখলে থাকেন। এর আগে তিনি এ জমিতে থাকা ভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির সংযোগ নেন। এভাবেই সিরাজুল হক এবং তার পরিবার এ জমির ভোগ-দখল করে আসছিলেন।

এর মধ্যে হঠাৎ ২০০৮ সালে এ জমির খতিয়ান সংশোধন চেয়ে মামলা করে রাষ্ট্র। পরে ২০০৯ সালের ২৩ জুন এই জমি অধিগ্রহণের জন্য নোটিশ দেন রমনার ভূমি কর্মকর্তা।

নোটিশে বলা হয়, বড়মগবাজার মৌজার আরএস খতিয়ান নং-১, দাগ-২, ০.২৬৪৪ একর (কমবেশি) সম্পত্তি বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড-এর অনুকূলে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং সদস্যদের আবাসন সুবিদার জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এবং জনস্বার্থে প্রয়োজন।

এ জমির বাজারমূল্য ২ কোটি ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৯ টাকা উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর জমির মালিক বীরেন্দ্রনাথকে নোটিশ দেয় রমনা ভূমি অফিস।

এরপর ভূমি অধগ্রহণের গেজেটও জারি করা হয়। গেজেট জারির কিছুদিন পর জমির ভোগ-দখলকারী সিরাজুল হকের পরিবারকে উচ্ছেদ করে প্রশাসন।

হাইকোর্টে রিট

২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই গেজেট চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন সিরাজুল হকের স্ত্রী মালেকা সিরাজ ও তার পাঁচ সন্তান।

এই রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১১ সালে অধিগ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি (লিভ টু আপিল) চেয়ে ওই বছরই আবেদন করে সরকার। চেম্বার আদালত প্রথমে আদেশ না দিলেও পরে হাইকোর্টের আদেশে স্থিতাবস্থা (স্টেটাসকো) দেয়।

তখন চেম্বার বিচারপতি ছিলেন এস কে সিনহা। পরে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে সরকার ২০১২ সালে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে।

ওই আপিলের শুনানির জন্য প্রস্তুতি নাই বলে বার বার সময় প্রার্থনা করে আসছে রাষ্ট্রপক্ষ।