দেশকে বসবাসের উপযোগী একটি উত্তম স্থানে পরিণত করতে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে এই দেশকে বসবাসের জন্য একটি উত্তম স্থানে পরিণত করার জন্য চেষ্টা করি, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এই দেশের কল্যাণ কামনা করি, সবার জন্য একতা ও সমৃদ্ধি প্রার্থনা করি।’
আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) আজ রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এ কথাগুলো বলেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি গত ২৮ ডিসেম্বর শপথ নেন। তখন সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ চলছিল। অবকাশ শেষে আজ নিয়মিত আদালত খুলেছে। রীতি অনুসারে প্রধান বিচারপতিকে বিচারকক্ষে আজ সংবর্ধনা জানানো হয়।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যখন সেক্রেটারিয়েট (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়) গঠনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে যাত্রা শুরু করেছি, তখন আমি বিচার বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে—এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করি, বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে। অবশ্যই আশা করি, আমার পূর্বসূরি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের প্রণীত রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে, প্রয়োজন অনুসারে কিছু পরিবর্তন–পরিমার্জনসহ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন : অবকাশ শেষে খুলেছে সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির প্রথম কার্যদিবস আজ
আইনজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করতে বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতি আহবান জানান প্রধান বিচারপতি। সেই সাথে আদালত প্রাঙ্গণের ভেতরে ও বাইরে পেশার মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানান প্রধান বিচারপতি।
বিচার অঙ্গনে আগত বিচারক, আইনজীবী ও বিপুলসংখ্যক বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি আইনজীবী সমিতি, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে আইনজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে আহ্বান জানান।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার প্রয়াত পিতা বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীকে, যাঁর কাছ থেকে আমি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাহস, সত্যনিষ্ঠা ও কর্তব্যবোধ শিখেছি। গভীর কৃতজ্ঞতা ও বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার মাতা বেগম সিতারা চৌধুরীকে, যিনি গত আগস্টে ইন্তেকাল করেছেন। আমার জীবনের বড় অংশে তিনি ছিলেন আমার মেন্টর, তিনি আমাকে নৈতিকতা ও ন্যায়বোধের মৌলিক শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর একটি মন্তব্য আজও আমার মনে প্রতিধ্বনিত হয়, “জুডিশিয়ারি যেন বরফের টুকরোর মতো, কঠিন কিন্তু স্বচ্ছ।”’
সংবর্ধনায় প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও পরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা, আইনজীবী ও আগত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আদালতকক্ষ ছিল পূর্ণ।
‘শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের দুর্নীতি নির্মূল হবে’
সংবর্ধনায় অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি। দুর্নীতির এই বিষবাষ্প বিচারকার্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আক্রান্ত করেছে। দুর্নীতির প্রচলিত ধারণায় অর্থনৈতিক লেনদেনকে বোঝালেও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ডিনামাইটের চেয়ে ধ্বংসাত্মক, অ্যাটম বোমার চেয়েও ভয়াবহ, ক্যানসারের চেয়েও প্রাণঘাতী। সুতরাং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সব স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল হবে।
এর আগে মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ অভিযোগ করেন, বিগত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়েছিল। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিচারের কারণবিহীন দীর্ঘসূত্রতা এবং উদ্দেশ্যমূলক অতিদ্রুত বিচার—দুটোই বিচার বিভাগকে আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। বিচার বিভাগ তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছিল।…৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের পর এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়।
বর্তমানে আপিল বিভাগে ৩৯ হাজার ৪১৭ এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮২ মামলা বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন আরশাদুর রউফ। মামলার এই বিশাল জট বিচারপ্রার্থী জনগণের মধ্যে একটি হতাশা সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে তিনি এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড—এ বিষয়ের প্রতিও সজাগ থাকতে বলেন।
‘যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ আশা করছি’
প্রধান বিচারপতিকে দেওয়া সংবর্ধনায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বিচার বিভাগে যেকোনো সিন্ডিকেট বন্ধ করতে হবে, সুপ্রিম কোর্টে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইন এবং সম্পূর্ণ পৃথক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করেছেন উল্লেখ করে এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এই দায়িত্ব আপনার (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) ওপর বর্তায়। সুপ্রিম কোর্টের পেশকার, বেঞ্চ অফিসার, পিয়নসহ কোর্টের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা আপনার কাছে আশা করছি। নিম্ন আদালত স্বজনপ্রীতি পরিহার করে নির্ভীক ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে, সে মোতাবেক বিচার বিভাগকে আপনি গড়ে তুলবেন এবং অতীতের অনিয়ম দূর করার জন্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি সব প্রকার সহযোগিতা করবে।’

