সারা দেশের আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি ও নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা পদ্ধতি, ফল প্রকাশে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে আলোচনা ও সমালোচনা হলেও থেমে থাকেনি বার কাউন্সিলের কার্যক্রম। সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার জট অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে এবং বর্তমানে একটি লিখিত পরীক্ষার খাতা পুনর্বিবেচনা বা রিভিউ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামানকে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পদাধিকারবলে অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনে বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করতে তিনি পদত্যাগ করেন। এ অবস্থায় অ্যাটর্নি জেনারেলের পদে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
এদিকে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি জেলা জজ মোহাম্মদ কামাল হোসেন সিকদার বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। একই বছরের ২৯ মে কার্যকরী কমিটির নির্বাচন না হওয়ায় সরকার একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই কমিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
আরও পড়ুন : রমজানে হাইকোর্টে বিচারকাজ ও অফিস সময়সূচি নির্ধারণ
অ্যাডহক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে পদাধিকারবলে দায়িত্বে রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল), আবদুল্লাহ আল মামুন, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, শাহ মো. খসরুজ্জামান, মো. নজরুল ইসলাম খান, মো. আবদুল মতিন, মো. মহসীন মিয়া, এ এস এম বদরুল আনোয়ার, এ টি এম ফয়েজ উদ্দিন, কাজী এনায়েত হোসেন, মো. মাইনুল আহসান ও মো. শফিকুল ইসলাম।
বার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য কার্যকরী কমিটির সদস্যদের বিভিন্ন উপকমিটিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে আইনজীবী তালিকাভুক্তির পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এনরোলমেন্ট কমিটি। এই কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেন বার কাউন্সিলের সচিব।
দায়িত্ব গ্রহণের পর এক বছরের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে বার কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন সিকদার বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরীক্ষাগুলো নিয়মিত গ্রহণের চেষ্টা করা হয়েছে এবং অনেকাংশে তা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তাকে সহযোগিতা করেছেন।
বার কাউন্সিল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সচিব দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আইনজীবীদের জন্য অনলাইনভিত্তিক কন্টিনিউয়াস প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট বা সিপিডি কোর্স চালু করা হয়েছে। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনের মাধ্যমে আইনজীবীরা এই কোর্সে অংশ নিতে পারছেন।
আরও পড়ুন : অধস্তন আদালতের বার্ষিক ছুটিতে পরিবর্তন, জুন-ডিসেম্বরে অবকাশ পাবেন বিচারকরা
এ ছাড়া আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও গবেষণার জন্য ঢাকার নিকটবর্তী এলাকায় একটি আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বার কাউন্সিল নিয়মিতভাবে আইনবিষয়ক জার্নাল বাংলাদেশ ল’ ডাইজেস্ট (বিএলডি) অনলাইনে প্রকাশ করছে। এতে করে দেশ ও বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ রায় সহজে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বার কাউন্সিলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো মৃত আইনজীবীদের নমিনি বা পরিবারের কাছে আর্থিক সুবিধা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে ৫৯০ জন আইনজীবীর মৃত্যুর পর তাদের নমিনিদের ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৬৫ টাকা এবং স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া ১৩৭ জন আইনজীবীকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ১২৫ টাকা প্রদান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বেনেভোলেন্ট ফান্ড থেকে মোট ৩৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৮৯০ টাকা বিতরণ করে নজির স্থাপন করেছে বার কাউন্সিল।
পরীক্ষা শৃঙ্খলা রক্ষায়ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫ সালের ২৮ জুন আইনজীবী তালিকাভুক্তির লিখিত পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ৭৫ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের সচিব বলেন, পরীক্ষায় শৃঙ্খলা রক্ষায় চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফ্যাকাল্টি ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী এনরোলমেন্ট পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন করে এমসিকিউসহ পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। পাশাপাশি হাইকোর্ট পারমিশন লিখিত পরীক্ষা এবং এনরোলমেন্ট লিখিত পরীক্ষার রিভিউ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ বিষয়ে বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, জাতীয় নির্বাচন শেষে যত দ্রুত সম্ভব বৈঠক করে পরীক্ষাসংক্রান্ত সব জটিলতার সমাধান করা হবে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

