দীপেন দেওয়ান
দীপেন দেওয়ান

এজলাস থেকে মন্ত্রিসভা: দীপেন দেওয়ান হলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী

বিচারকের চাকরি ছেড়ে রাজনীতির কঠিন পথে পা রাখা, দীর্ঘ আইনি জটিলতায় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০৮ সালে ভোটের মাঠে নামতে না পারা, তারপর প্রায় দুই দশকের অপেক্ষা। অবশেষে সেই অপেক্ষার ইতি টানলেন সাবেক সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তিনি নতুন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নতুন সরকার গঠন করে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। নতুন মন্ত্রিসভায় দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি মীর হেলাল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে দীপেন দেওয়ানই প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য মনিস্বপন দেওয়ান উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রায় ২৮ বছর পর রাঙামাটি পেলো নিজ জেলার একজন পূর্ণ মন্ত্রী।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন দীপেন দেওয়ান। রাঙামাটি আসনে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৫৪৪ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা ফুটবল প্রতীকে পান ৩১ হাজার ২২২ ভোট। ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৩২২। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি।

আরও পড়ুন : আইনজীবী থেকে আইনমন্ত্রী হলেন আসাদুজ্জামান

রাঙামাটি সদরের কলেজ গেট এলাকার মন্ত্রিপাড়ায় দীপেন দেওয়ানের পারিবারিক বাসভবন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সুবিমল দেওয়ানের মন্ত্রী পদমর্যাদার কারণেই এলাকাটি বহু আগে থেকেই ‘মন্ত্রিপাড়া’ নামে পরিচিত।

নতুন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পিতা প্রয়াত সুবিমল দেওয়ান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা)। তিনি ১৯৮০ সাল থেকে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাঙামাটি জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সভাপতি ছিলেন।

দীপেন দেওয়ান ১৯৭৮ সালে মাধ্যমিক এবং পরে রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠক ছিলেন।

১৯৮০-৮১ সেশনে ৮ম ব্যাচে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এলএলবি অনার্সে ভর্তি হন। আইন বিভাগে সফলতার সঙ্গে গ্রাজুয়েশন শেষ করে পারিবারিক চাপের মুখে ৭ম বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগদান করেন।

২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে এসে বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছরের জুডিশিয়াল সার্ভিসের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে সাবেক সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর তিনি প্রথমে রাঙামাটি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘ সময় রাঙামাটি বিএনপির তৃণমূলে নেতৃত্বের সংকট কাটাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে জেলা বিএনপি পুনরুজ্জীবিত হয়।

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, ৬৩ বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান বর্তমানে আইন পেশায় নিয়োজিত। তাঁর আগের পেশা ছিল সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ। বর্তমানে তাঁর বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

রাঙামাটি থেকে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য পূর্ণ মন্ত্রী হওয়ায় স্থানীয় নেতা-কর্মী ও পাহাড়ের মানুষের মধ্যে আনন্দ ও প্রত্যাশা বিরাজ করছে।