সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার আকাঙ্ক্ষা আপাতত পূরণ হচ্ছে না

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ: সংসদীয় কমিটির সুপারিশ

সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিতের সিদ্ধান্তে আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বিচার বিভাগ। অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা আবার চলে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বিলুপ্ত হবে গত ১১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। ফলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার বিষয়ে জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা আপাতত পূরণ হচ্ছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই অধ্যাদেশগুলো আপাতত আইনে পরিণত হচ্ছে না।

আইনজীবীরা বলছেন, বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। গত বৃহস্পতিবার কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে প্রতিবেদন দেন।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক দুটি অধ্যাদেশ কার্যত বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ করায় হতাশা ও ক্ষোভ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

অধ্যাদেশ তিনটি হুবহু বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে টিআইবি এই আহ্বান জানায়।

বিচারপতি নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন হুমকির মুখে ফেলবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা।

আরও পড়ুন : কার্যকারিতা হারাচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ

তারা বলছেন, সংবিধানে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা বলা আছে। কিন্তু এত বছরেও তা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করায় কিছুটা হলেও অগ্রগতি হয়েছিল। কেন তা গ্রহণ করা হচ্ছে না তা পরিষ্কার নয়। দেরিতে হলেও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো যেন আইনে পরিণত করা হয়, এমন প্রত্যাশা তাদের।

গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরের মাসে সচিবালয়ের উদ্বোধনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছিলেন, ‘আগামী দিনে যে নির্বাচিত সরকার আসবে, তাদের তো বটেই এবং যত অংশীজন আছে, তাদের সবাইকে এই ধারাবাহিকতা, এই সচিবালয়ের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন বজায় রাখা, গণতন্ত্রকে বজায় রাখা– এই ধারাবাহিকতা যেন অটল থাকে, অটুট থাকে।’

পৃথক এ সচিবালয়ের জন্য একজন সচিব, ১৫ জন জুডিশিয়াল অফিসার এবং ১৯ জন স্টাফ ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ রহিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এই কর্মকর্তাদের এখন কী হবে?

সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির। তবে তিনি তা সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে করবেন। অধ্যাদেশে রাষ্ট্রপতির পক্ষে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ও বিচারিক সার্ভিসের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে দেওয়া হয়, যা আগে আইন মন্ত্রণালয় করত। অধ্যাদেশ রহিত হলে আবারও আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে এই ক্ষমতা ফিরবে।

অধ্যাদেশে সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ায় হয়েছে। অধ্যাদেশটি রহিতে সংসদের বিশেষ কমিটিকে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারকদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবেন। সরকারের সঙ্গে কাজের সমন্বয় হবে না। একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ বিচারকদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন : বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচন ১৯ মে

গত বছর ২১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারির পর ওই বছরের ২৫ আগস্ট প্রথম মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ আদালতে ২৫ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়।

সংবিধানে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতায় বিচারক নিয়োগের বিধান থাকলেও, কখনও আইন হয়নি। বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারক নিয়োগের কোনো আইন না থাকায় সরকারদলীয় লোককে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আসছিল।

সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। আবার ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্টের দুজন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত সাবেক একজন বিচারপতি ও একজন অধ্যাপককে নিয়ে গঠিত কাউন্সিল পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারপতি পদে নিয়োগে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করবে। তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়োগের নাম পাঠাবে। এই প্রস্তাব প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে। অধ্যাদেশটি রহিতের সিদ্ধান্তে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা ফের সরকারের হাতে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে আইনজীবী শাহ্‌দীন মালিক বলেন, এই দুটি অধ্যাদেশ হয়েছে এবং কয়েক মাস প্রয়োগও হয়েছে। তাই এসব অধ্যাদেশ রহিত হলে বুঝতে হবে, এই সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে দেশে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বুলিতে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন : আদালতে বাদীর স্বীকারোক্তি ‘আমি কোন মামলা করিনি, কিছুই জানিনা’

সুপ্রিম কোর্ট বার সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, সরকার যদি সংসদে বিচারক নিয়োগে নতুন আইন তৈরির জন্য অধ্যাদেশ রহিত করে থাকে তাহলে যথার্থ হয়েছে। কারণ, বিচারক নিয়োগের বর্তমান যে অধ্যাদেশটি অন্তর্বর্তী সরকার ও সাবেক প্রধান বিচারপতি সমন্বয় করে তৈরি করা হয়েছে তা কোনো ভালো উদ্যোগ নয়। সেখানে তারা হাইকোর্টের বিচারপতিদের জজকোর্ট থেকে আসা বিচারক এবং হাইকোর্ট থেকে আসা বিচারপতি– এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল।

তিনি বলেন, ‘অধ্যাদেশগুলো করার প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্ট বারের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। এসব অধ্যাদেশ ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আমি মনে করি, অধ্যাদেশটি বাতিল করে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে শিগগির নতুন একটি সুষম আইন করতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, বিচার বিভাগের রুল অব ল’ অন্তর্বর্তী সরকার নিশ্চিত করেনি। দুটি অধ্যাদেশ জারি করে কিছুটা অগ্রগতির চেষ্টা করেছে। যদিও এগুলো নিয়ে কিছুটা বিতর্ক ছিল। যেমন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের অধ্যাদেশটিকে আমরা আরও স্বচ্ছ করার জন্য বলেছিলাম। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি। এটিকে আরও মধ্যপন্থি করতে হবে।

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘কিন্তু এই অগ্রগতিটুকু (অধ্যাদেশ) কেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তা এখনও পরিষ্কার না। আমি শুনেছি, এই অধ্যাদেশগুলোকে নাকি আরও কার্যকর করে সংসদে বিল আকারে তোলা হবে। যদি তা হয় তবে আমরা দ্বিমত করব না। দেরি যেন না হয়। বেশি দেরি হলে বিচার বিভাগেরও দর পতন হবে।’

সূত্র : সমকাল