শফিকুল ইসলাম
শফিকুল ইসলাম

সাইবার আইন সংশোধন: ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে কি কমেছে অপরাধ প্রতিরোধের শক্তি?

শফিকুল ইসলাম: বিগত ইন্টারিম সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যকর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নতুন করে কিছুটা পরিমার্জন করে জাতীয় সংসদে পাস হয়। ব্যক্তির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা পেশার ওপর খড়্গহস্ত থাকার দরুন এই সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত পূর্বের আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিল দেশে ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে। নানামুখী চাপের প্রেক্ষিতে বিগত পতিত রেজিম আমলে আইনটির সংশোধন হিসেবে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ পাস করে।

কিন্তু উক্ত আইনটির ব্যাপারেও সমালোচকদের একই অভিযোগ ছিল যে এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর হস্তক্ষেপে ব্যবহার করার যথেষ্ট ফাঁকফোকর রয়েছে। অতঃপর বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এখন কার্যকর রয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পূর্ববর্তী আইনের যেসব বিধান মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা তৈরি করেছিল, সেগুলোর কিছু অপসারণ নাগরিক স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন।

প্রশ্ন হলো, সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গিয়ে ব্যক্তির অনলাইন নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো নতুন শূন্যতা তৈরি হয়েছে কি না। এই আইনটি সাইবার অপরাধ দমনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ হিসেবে বলা যায় এই আইনটি পূর্বের তুলনায় শাস্তির মাত্রা ও আইনের কড়াকড়ি অনেক লঘু করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর তুলনায় ২০২৬ সালের আইনে বেশ কিছু অপরাধের শাস্তি ও আইন প্রয়োগের কঠোরতা কমানো হয়েছে। বিশেষ করে পূর্বের আইনে যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি কারাদণ্ড এবং অ-জামিনযোগ্যতার বিধান ছিল, নতুন আইনে সেগুলোর কয়েকটির শাস্তি কমিয়ে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা বাড়লেও গুরুতর সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আইনের নিবৃত্তিমূলক প্রভাব কতটা কার্যকর থাকবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আরও পড়ুন : ২০ রুপি ঘুষের মামলায় ৩০ বছর পর গুজরাটের দুই সরকারি কর্মীকে খালাস দিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

সেই সাথে কিছু শব্দ ও অপরাধের বিষয় আইনটি হতে বাদ দেওয়া হয়েছে যার ফলে অনলাইনে প্রতিনিয়ত ঘটা কিছু সমস্যার সমাধান পাওয়া সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ দূরূহ হয়ে গিয়েছে। নতুন আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের ২৫ ধারায় ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান (চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ম্যাটেরিয়াল) বা সেক্সটরশন-এর উদ্দেশ্যে ডিজিটাল উপাদান প্রকাশ বা প্রকাশের হুমকিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অনলাইনে করা যৌন অপরাধ, কারো অন্তরঙ্গ বা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন, বা শিশুদের যৌন নিপীড়ন, বা কোনো ব্যক্তির অন্তরঙ্গ ছবি, ভিডিও বা যৌন সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে তার কাছ থেকে টাকা, মূল্যবান জিনিস বা অনৈতিক সুবিধা দাবি করা অর্থাৎ সেক্সটরশন করা অথবা গোপন তথ্য প্রকাশের ভয় দেখিয়ে কোনো বেআইনি সুবিধা আদায় করা অর্থাৎ ব্ল্যাকমেইলিং করা—মোটামুটি এগুলোকেই এই আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইনের ২৫(২)-এ সাধারণ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়, আর ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে ২৫(৩)-এ সর্বোচ্চ ৫ বছর বা ২০ লাখ টাকা বা উভয়—এমন বিধান আছে। তবে ২৫ ধারায় উল্লেখিত এত গুরুতর অপরাধগুলোকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে তা আইনের কঠোরতা ও অপরাধের মাত্রাকে লঘু বলে জনমনে ধারণা তৈরি করতে পারে। অপরাধগুলোর সামাজিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মাত্রার তুলনায় এসব অপরাধকে জামিনযোগ্য রাখার ফলে অপরাধীদের নিবৃত্ত করার ক্ষেত্রে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আইনটির বাকি অপরাধ ও দণ্ড অংশে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যান্য সাধারণ অপরাধকে যুক্ত করা হয়নি। যারা সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মিত ব্যবহার করেন তারা জানেন যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একটি খুবই সাধারণ অপরাধ হচ্ছে সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে মানহানি ঘটানো, বা কার নামে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া। একজন ব্যক্তিকে অফলাইনে যতটা মানহানি ঘটানো যায় তার চেয়ে ঢের ক্ষতি অনলাইনে তার মানহানির মাধ্যমে করা সম্ভব, একই সাথে কাউকে উত্ত্যক্ত করা বা বুলিং করা সাইবার অপরাধ অনেক বেশি ঘটে থাকে।

আরও পড়ুন : সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর কারামুক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের মতো কর্মকাণ্ডও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মানহানির বিষয়টিকে দিয়ে সাংবাদিক হয়রানি পূর্বে অনেক ঘটেছে এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃতভাবেই যারা মানহানি ও বুলিংয়ের বা মিথ্যা প্রোপাগান্ডার শিকার হচ্ছেন তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সাইবার অপরাধ আইনে অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে যদি না তাতে যৌনতা বিষয়ক, অশ্লীল বা অন্তরঙ্গ ছবি ইত্যাদি কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকে।

যৌন নিপীড়ন বা ব্যক্তিগত ছবি, অশ্লীল ভিডিও তৈরি ছাড়াও যে একজন ব্যক্তিকে হয়রানি ও ভুক্তভোগী করা যায় তা এই আইনে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ও উপেক্ষা করে যাওয়া হয়েছে। উচিত ছিল সাইবার বুলিংয়ের ব্যাপারে স্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা এবং সৎ উদ্দেশে, জনস্বার্থে এবং পেশাগত সাংবাদিকতার স্বীকৃত মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সুরক্ষা রাখা যেতে পারে; তবে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য বা অপপ্রচারকে এর আওতার বাইরে রাখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন : সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি ও বিক্রির অভিযোগে ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার সুমাইয়া ও সহযোগী গ্রেপ্তার

এতে করে সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের সাথে সাথে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে মানহানি ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করার শাস্তির সুযোগ তৈরি হতো এই আইনে। ফলে আইনটি হতো যুগোপযোগী। অথচ এসব বিষয় বাদ দেওয়ার ফলে এখন মানহানির জন্য আইনি আশ্রয় হয়ে উঠেছে আগের ন্যায় প্রচলিত দণ্ডবিধি অথবা মানহানির জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে সিভিল মামলা যা কিনা সাইবার ট্রাইব্যুনালের তুলনায় বেশি সময়সাপেক্ষ।

সাইবার আইন সংশোধনের মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও, কিছু গুরুত্বপূর্ণ অপরাধে শাস্তি, প্রয়োগক্ষমতা বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। সাইবার জগতে স্বাধীনতা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সেই স্বাধীনতার আড়ালে অন্যের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত জীবনে আঘাত করার সুযোগও কোনো আইনের উদ্দেশ্য হতে পারে না।

তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে, আবার সাইবার বুলিং, হয়রানি, যৌন নিপীড়ন ও অন্যান্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিও দ্রুত ও কার্যকর প্রতিকার পাবেন। শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর সাইবার আইনের সাফল্য নির্ভর করবে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার এই দুইয়ের মধ্যে কতটা সুসমন্বিত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় তার ওপর।

লেখক: শফিকুল ইসলাম, আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট।