সাঈদ আহসান খালিদ : ২০২৫ সালে যখন বিতর্কিত ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ বিচারপতির বয়স সংক্রান্ত একটি বিধানের জেরে অতিরিক্ত বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে স্থায়ী নিয়োগের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি একটি আইনি ও সাংবিধানিক মূল্যায়নে এই সিদ্ধান্তের আপত্তি জানিয়েছিলাম।
সে সময় আমার মূল বক্তব্য ছিল—সংবিধানে না থাকা একটি বয়সসীমার শর্ত ভূতাপেক্ষভাবে (Retrospectively) প্রয়োগ করে কোনো বিচারকের ‘বৈধ প্রত্যাশা’ (Legitimate Expectation) নস্যাৎ করা কেবল অন্যায্যই নয়, বরং তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। পরবর্তীতে অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদ কর্তৃক বাতিল হয়েছে এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী শেষ পর্যন্ত গতকাল স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
কিন্তু আমাদের কি আসলে আনন্দিত নাকি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
বিচারপতি দেবাশীষ রায়ের স্থায়ীকরণ: বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের এপ্রিলে বিএনপি সরকার কর্তৃক ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল হওয়া এবং পরবর্তীতে গতকাল বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর স্থায়ীকরণ—এই দুটি ঘটনাকে কেবল আইনি ধারাবাহিকতা বা একক ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার অন্যতম বড় একটি প্রাতিষ্ঠানিক অসঙ্গতি হলো সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদের অধীনে ‘অতিরিক্ত বিচারপতি’ নিয়োগের বহুল চর্চা। সংবিধান প্রণেতারা এটিকে সাময়িক কাজের চাপ সামলানোর একটি জরুরি বিধান হিসেবে রাখলেও, বাস্তবে এটি স্থায়ী নিয়োগের মূল প্রবেশদ্বারে পরিণত হয়েছে। এই দুই বছরের ‘পরীক্ষামূলক’ বা ‘প্রবেশনাল’ ব্যবস্থাটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং এতে দুটি বড় কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়:
১. সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বিচারবিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ হইতে পৃথকীকরণ নিশ্চিত করিবেন”। কিন্তু অতিরিক্ত বিচারপতিরা অনধিক দুই বছরের জন্য নিয়োগ নেন এবং তাঁদের স্থায়ীকরণ চূড়ান্তভাবে নির্ভর করে রাষ্ট্রপতির—অর্থাৎ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর “সন্তুষ্টি”র ওপর। কার্যকালীন সময়ে নিজেদের স্থায়ীত্বের বিষয়ে এমন তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা বিচারকদের মনে অবচেতনভাবেই নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছা বা নীতির বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পারে, যা বিচারিক নিরপেক্ষতাকে শুরুতেই দুর্বল করে দেয়।
২. বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি অলিখিত কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক প্রথা হলো—যদি কোনো অতিরিক্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে গুরুতর অদক্ষতা বা অসততার অভিযোগ না থাকে, তবে সাধারণত তাঁকে দুই বছর পূর্তিতে স্থায়ী করা হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন বা পারফরম্যান্স অডিট ছাড়া, একই দিনে নিয়োগ পাওয়া একদল বিচারকের মধ্য থেকে কাউকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে স্থায়ীকরণ থেকে বাদ দেওয়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) এবং ২৯(১) অনুচ্ছেদের (প্রজাতন্ত্রের কর্মে সুযোগের সমতা) স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জারি করা ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ’ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারত। এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ (SJAC) গঠন।
এই কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নির্বাহী বিভাগের একক ও গোপন মর্জির বাইরে গিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। এটি বিচার বিভাগে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার এবং ভারতের Second Judges Case (1993)-এর পর গঠিত “Collegium System”-এর মতো বিচার বিভাগের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ ছিল।
তবে এই ইতিবাচক সংস্কারের সমান্তরালে অধ্যাদেশটির ধারা ৬(২)(ক)-তে হাইকোর্টের বিচারক পদের জন্য ন্যূনতম ৪৫ বছর বয়স নির্ধারণের শর্ত যুক্ত করা হয়। সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদে বিচারক হওয়ার সুনির্দিষ্ট যোগ্যতায় কোনো বয়সসীমার শর্ত রাখা হয়নি। সংবিধান প্রণেতাদের অভিপ্রায় ছিল অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা মূল্যায়ন করা, বয়স নয়। ফলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধানের এই বাধাহীন যোগ্যতাকে সীমিত করার চেষ্টা আইনত Ultra Vires বা সংবিধান অতিক্রমকারী এবং বাতিলযোগ্য ছিল।
এই ৪৫ বছর বয়সসীমার শর্তটি ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবরে নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা আইনশাস্ত্রের মূল নীতি ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো আইন সাধারণ ক্ষেত্রে ভূতাপেক্ষভাবে বা অতীতের ঘটনার ওপর প্রযোজ্য হতে পারে না, যদি না আইনে তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকে। যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অদক্ষতা বা অসততার অভিযোগ ছিল না, তাই প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী তাঁর স্থায়ী হওয়ার একটি ‘বৈধ প্রত্যাশা’ বা Legitimate Expectation তৈরি হয়েছিল, যা নতুন অধ্যাদেশের অপ্রাসঙ্গিক শর্ত দিয়ে নস্যাৎ করা ছিল Procedural Unfairness বা পদ্ধতিগত অন্যায্যতার উদাহরণ।
অধ্যাদেশ বাতিল ও বিচারক নিয়োগের কাঠামোগত সংকট
২০২৬ সালের এপ্রিলে বর্তমান সংসদ কর্তৃক এই অধ্যাদেশটি স্থায়ী আইন হিসেবে পাস না করে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়ার ঘটনাটি গভীরভাবে রাজনৈতিক এবং এর পেছনে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। অধ্যাদেশটি বাতিলের ফলে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এর সরাসরি অর্থ হলো, বিচারক নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা আবারও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্টার ছাড়া সংবিধানের ৯৫ ও ৯৮ অনুচ্ছেদের পুরোনো ধারায়, অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয় তথা নির্বাহী বিভাগের একক নিয়ন্ত্রণে ফিরে গেছে। সরকার মূলত বিচারক নিয়োগে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিচারক বাছাইয়ের সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায়নি বলেই এই অধ্যাদেশটি স্থায়ী আইন করেনি।
গতকাল বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীকে স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত যদিও ব্যক্তিগত স্তরে একটি বৈষম্য দূর করেছে এবং তাঁর ‘বৈধ প্রত্যাশা’ পূরণ করেছে, কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার দিক থেকে বিচার বিভাগ বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পড়েছে। কারণ, সরকার উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আইনগত বাধ্যবাধকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটিই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
টেকসই ও নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগ মডেলের প্রয়োজন
এই ঘটনা পরিক্রমা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখনো উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের একটি টেকসই ও নিরপেক্ষ মডেল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি বা বাদ পড়া এখানে মূল সংকট নয়; মূল সংকট হলো স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে অস্থায়ী বা পরীক্ষামূলক নিয়োগের মাধ্যমে বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের মুখাপেক্ষী করে রাখা।
বাংলাদেশ আইন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্থায়ীকরণের প্রত্যাশার মানবিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক চাপ এড়াতে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ অস্থায়ী ভিত্তিতে না হয়ে সরাসরি ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থায়ী ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত ৯৮ অনুচ্ছেদের এই ‘অতিরিক্ত বিচারক’ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা অধরাই থেকে যাবে।
লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

