অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক : স্বামী স্ত্রীর কাছে টাকা চাইলেই তা আইনের চোখে ‘যৌতুক’ হয় না। সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগের দুটি রায়ে বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হয়েছে। নারী নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি, তাঁদের পরিবার, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী এবং সাধারণ মানুষের জন্য রায় দুটি জানা জরুরি।
কক্সবাজারের একটি ভাড়া বাসায় ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় এক স্বামী তাঁর স্ত্রীর কাছে ব্যবসার জন্য ১ লাখ টাকা চান। অভিযোগ অনুযায়ী, স্ত্রী টাকা দিতে না পারায় স্বামী তাঁকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করেন।
এ ঘটনায় স্ত্রী মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১, কক্সবাজার ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর স্বামীকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারায়—যৌতুকের জন্য সাধারণ জখমের অভিযোগে—দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী হাইকোর্টে আপিল করেন। ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট আদালত তাঁকে সম্পূর্ণ খালাস দেন। এর পেছনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
১. টাকার দাবিটি যৌতুকের সংজ্ঞায় পড়েনি
আইনের ২(ঞ) ধারা অনুযায়ী, বিয়ের শর্ত বা পণ হিসেবে বর বা বরপক্ষ যে অর্থ, জিনিসপত্র বা সম্পদ দাবি করে, তা যৌতুকের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
এ মামলায় বাদী ও সাক্ষীরা বলেছেন, স্বামী নিজের ব্যবসার জন্য সরাসরি স্ত্রীর কাছে টাকা চেয়েছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ ধরনের দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌতুক বলা যায় না। টাকাটি যৌতুক হিসেবে চাওয়া হয়েছিল—বাদীপক্ষ তা প্রমাণ করতে পারেনি।
২. সাক্ষ্য ও চিকিৎসা প্রতিবেদনে অসংগতি ছিল
ভুক্তভোগী নিজে বলেছেন, তাঁর ডান কাঁধে আঘাত লেগেছে। আরেক সাক্ষী বলেছেন, আঘাত লেগেছে কোমর ও পিঠে। তিনজন সাক্ষী আঘাতের স্থান উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে, চিকিৎসক পরীক্ষার সময় বাঁ কাঁধে ফোলা জখম পেয়েছেন।
ঘটনার সময় নিয়েও সাক্ষীদের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল। অভিযোগে সন্ধ্যা ৬টার কথা বলা হলেও একজন সাক্ষী বিকেল ৪টার কথা বলেছেন, আরেকজন বিকেল সাড়ে ৩টায় ফোন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে কে কাকে কোথায় দেখেছেন, সে বর্ণনাতেও অসংগতি ছিল।
দ্বিতীয় রায়েও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ
২০২৬ সালের ১৫ জুন হাইকোর্ট আরেকটি মামলায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত দেন। মামলাটি ছিল মাহবুবা মোহাম্মদ বাবন বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন (ফৌজদারি রিভিশন নং ৬১৭৬/২০২৪)।
ওই মামলায় আদালত বলেন, মামলার পরিস্থিতিতে স্ত্রীর কাছে স্বামীর সরাসরি টাকা চাওয়া যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর ৪ ধারার অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।
এ সিদ্ধান্তে আদালত দুটি পুরোনো নজিরের ওপর নির্ভর করেন:
-
৩৭ ডিএলআর (১৯৮৫) ২২৭
-
২৮ বিএলসি (হাইকোর্ট বিভাগ) ৬৮৮
ফলে রুল খারিজ হয় এবং নিম্ন আদালতের দেওয়া খালাসের আদেশ বহাল থাকে।
এই রায়গুলো থেকে কী শিক্ষা নেওয়া যায়?
প্রতিটি টাকার দাবি যৌতুক নয়। কে টাকা চেয়েছে, কার কাছে চেয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে চেয়েছে—বিচারের ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক আইনে মামলা করা জরুরি। কোনো ঘটনা এক আইনের আওতায় পড়লেও মামলা যদি অন্য আইনে করা হয়, তাহলে অভিযোগ প্রমাণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। মামলার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাক্ষ্যের সঙ্গে ঘটনার বিবরণ ও চিকিৎসা প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য থাকা দরকার। সাক্ষীর সংখ্যা বেশি হলেই মামলা জেতা যায় না। আঘাতের স্থান, ঘটনার সময় ও অন্যান্য বিবরণে অসংগতি থাকলে মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নির্যাতিতার প্রতিকারের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। যৌতুকের অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও মারধর নিজেই অপরাধ হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দণ্ডবিধি এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর আওতায় প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই রায়গুলো স্ত্রীকে মারধরকে বৈধতা দেয়নি; বরং নির্দিষ্ট অভিযোগ সঠিক আইনে প্রমাণ করার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মনে রাখতে হবে, আবেগের বিচারে অন্যায় মনে হওয়া আর আইনের চোখে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো সঠিক আইন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য।
রেফারেন্স
- মো. রাশেল উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন, ফৌজদারি আপিল নং ১২০/২০২৪, হাইকোর্ট বিভাগ। বিচারপতি মো. সালিম; শুনানি: ২৬ ও ২৭ জুলাই ২০২৬; রায়: ৩ আগস্ট ২০২৬। নিম্ন আদালত: নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নং ১২/২০২০, ট্রাইব্যুনাল নং-১, কক্সবাজার; রায়: ১৫ নভেম্বর ২০২৩।
- মাহবুবা মোহাম্মদ বাবন বনাম রাষ্ট্র ও অন্য একজন, ফৌজদারি রিভিশন নং ৬১৭৬/২০২৪; রায়: ১৫ জুন ২০২৬।
- মিহির লাল সাহা পোদ্দার ওরফে মিহির কুমার পোদ্দার, মতিলাল সাহা বনাম ঝুনু রানী সাহা, ৩৭ ডিএলআর (১৯৮৫) ২২৭।
- আনামুল হক ফরাজী বনাম মাহবুবা বেগম ও অন্যান্য, ২৮ বিএলসি (হাইকোর্ট বিভাগ) ৬৮৮।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।

