মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী : কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠন করা হয়েছে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার।
মামলার আসামিদের নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ওসি। তবে উখিয়া থানা-পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলায় টুপটুপ রিসোর্টের মালিক ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা তানভীর সুলতান ও নিয়াজ মোর্শেদকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকেও আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে।
ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার মেরিন ড্রাইভের ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ১০ জন নিহত হন এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত হন আরও ছয়জন।
প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। মরদেহগুলোর অবস্থা এমন ছিল যে, সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন—রাজধানী ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) এবং আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৮)।
আরও পড়ুন : ডেঙ্গুকে জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা তদন্তের দাবি, সরকারকে আইনি নোটিশ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আলভী ও নাফিস তেহামি জেরিফ মালিহা ও নাবিলার কাজিন। ফারিহা কবির জেরিফের বড় বোন এবং ফায়িজান তাঁদের ভাগ্নে।
উদ্ধার অভিযানে দেখা যায়, রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষের বিছানা থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই কক্ষের ওয়াশরুমে পাওয়া যায় আরেকজনের মরদেহ। এ ছাড়া তিনতলার একটি ওয়াশরুমে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ আহতরা হলেন ঢাকা মুগধা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
আহতদের মধ্যে চারজনের শরীর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। অপর দুজনকে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, রিসোর্টটির বিভিন্ন অংশে কাঠ ও প্লাস্টিকের বোর্ড থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনিম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধতা নেয়নি বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ওই কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও ছিল না। সেখানে স্থানীয়দের প্রবেশাধিকার সীমিত ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

