সরকার ও চার পত্রিকাকে এস আলম গ্রুপের আইনি নোটিশ
আইনি নোটিশ

গরুর মাংসের দাম ২৫০ টাকায় নামানো, জীবিত গরু ও হালাল মাংস আমদানিতে আইনি নোটিশ

ঢাকা: গরুর মাংসের খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে জীবিত গরু ও প্যাকেটজাত হালাল মাংসের বাণিজ্যিক আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এ আইনি নোটিশ পাঠান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে নোটিশটি পাঠানো হয়েছে।

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৮ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলিম। গরুর মাংস এই জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান ও পছন্দের খাদ্য উপাদান। অথচ বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই উচ্চমূল্যের কারণে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো গরুর মাংস কেনা প্রায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রোটিনের ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির যুক্তি

নোটিশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তত্ত্বের ‘তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব’ (Theory of Comparative Advantage) ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, কোনো দেশ যে পণ্য কম খরচে ও সহজে উৎপাদন করতে পারে, সেই পণ্যের উৎপাদনে তার মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, যেসব পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, সেগুলো অন্য দেশ থেকে আমদানি করা কার্যকর অর্থনৈতিক কৌশল হতে পারে।

এর উদাহরণ হিসেবে নোটিশে তৈরি পোশাকশিল্পের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক আমদানি করে। তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে পোশাক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি, আধুনিক প্রযুক্তির বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ-ব্যয় (Opportunity Cost) এবং কারখানা পরিচালনার ব্যয় বেশি হওয়ায় আমদানি তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। এর ফলে সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক পাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভোক্তারাও উপকৃত হন।

নোটিশে একই নীতি বাংলাদেশের গবাদিপশু ও মাংসের বাজারে প্রয়োগের যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত চারণভূমি, বিস্তৃত কৃষিজমি এবং কম খরচে মানসম্মত পশুখাদ্য উৎপাদনের সুযোগ সীমিত। ফলে গবাদিপশু পালনে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং গরুর মাংসের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

অন্যদিকে, বিশ্বের যেসব দেশে গবাদিপশু উদ্বৃত্ত এবং সুবিশাল প্রাকৃতিক চারণভূমি রয়েছে, সেখানে বৃহৎ পরিসরে তুলনামূলক কম খরচে গবাদিপশু ও মাংস উৎপাদন সম্ভব বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দেশ থেকে উন্মুক্ত বাণিজ্যিক আমদানির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি প্রায় ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

এতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমবে, শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের উল্লেখ

আইনি নোটিশে খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুনের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে খাদ্যসহ মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার বিষয়টি এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকারের (Right to Life) ব্যাখ্যায় মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও দাবি করা হয়েছে, সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী মূল্যে গরুর মাংস কেনার সুযোগ সীমিত রেখে ক্ষুদ্র একটি খামারি ও পশুখাদ্য উৎপাদনকারী গোষ্ঠীকে একচেটিয়া মুনাফার সুযোগ দেওয়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

১৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

আইনি নোটিশে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জীবিত গরু এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদপ্রাপ্ত হালাল হিমায়িত (Frozen) বা শীতলীকৃত (Chilled) মাংস আমদানির ওপর থাকা সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শুল্ক যৌক্তিকীকরণের দাবি জানানো হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, গরুর মাংসের প্রতি কেজির দাম ২৫০ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনস্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (জনস্বার্থ মামলা বা PIL) দায়ের করা হবে।

তবে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় নামিয়ে আনার বিষয়টি নোটিশদাতার দাবি ও প্রত্যাশিত লক্ষ্য। আমদানি, শুল্ক, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রকৃত ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।