ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ যৌতুকের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি, স্ত্রীকে মারধরের অভিযোগে দেওয়া সাক্ষ্য ও চিকিৎসা সনদে আঘাতের স্থান নিয়ে অসংগতি থাকায় মামলার প্রমাণ নিয়েও গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এসব বিবেচনায় যৌতুকের অভিযোগে দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড পাওয়া এক ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
চলতি বছরের গত ৩ আগস্ট বিচারপতি মো. সেলিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ ফৌজদারি আপিল নং ১২০/২০২৪-এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া এ মামলার ১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। এই রায়ের ফলে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল হয়েছে।
মামলার অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, অভিযোগকারী ইসমত আরা বেগমের সঙ্গে আসামি মো. রাশেল উদ্দিনের ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। অভিযোগে বলা হয়, বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে আসামি তাঁর স্ত্রীর কাছে যৌতুক দাবি করেন।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার দিকে ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন তিনি। স্ত্রী ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ইসমত আরা বেগম কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন। অভিযোগ গ্রহণের পর ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফৌজদারি কার্যবিধির ২০০ ধারায় অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারায় অভিযোগ আমলে নেন। পরে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য কক্সবাজার মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
পরবর্তী সময়ে আসামির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। আসামি অভিযোগ অস্বীকার করে বিচার চান। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ছয়জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। তবে আসামিপক্ষ কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করেনি। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর আদালতে অনুপস্থিত থাকায় আসামিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ
২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ আসামিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
এই দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের শুনানি ২০২৬ সালের ২৬ ও ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়।
আসামিপক্ষের যুক্তি
হাইকোর্টে আসামিপক্ষের আইনজীবী আল রেজা মো. আমির যুক্তি দেন, ট্রাইব্যুনাল মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি এবং আসামিপক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নেননি।
তিনি বলেন, সাক্ষীরা আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য দিতে পারেননি। অভিযোগকারীর আঘাতের কারণ প্রমাণে গ্রহণযোগ্য চিকিৎসা সনদ উপস্থাপনের ঘাটতিও ছিল। এ ছাড়া চিকিৎসকের দেওয়া আঘাতের সনদে ভুল রয়েছে বলে আসামিপক্ষ দাবি করে। অভিযোগকারী ছাড়া অন্য সাক্ষীরা মূলত শোনা কথার ওপর নির্ভর করেছেন এবং তাঁদের বক্তব্যের মধ্যেও অসংগতি রয়েছে বলে যুক্তি দেওয়া হয়।
এসব কারণে আসামিকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানায় আসামিপক্ষ।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মঞ্জুরুল আলম সুজন আসামিপক্ষের যুক্তির বিরোধিতা করেন। তিনি আদালতে বলেন, মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর মতে, ট্রাইব্যুনাল যথাযথ ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছেন।
হাইকোর্ট উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং বিচারিক আদালতের রায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেন।
ব্যবসার জন্য টাকা দাবি যৌতুকের সংজ্ঞায় পড়ে না
মামলার সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযোগকারীসহ কয়েকজন সাক্ষীর বক্তব্যে আসামির বিরুদ্ধে ব্যবসার জন্য এক লাখ টাকা দাবি করার কথা উঠে এসেছে।
আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২ ধারায় যৌতুকের সংজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনায় নেন। ওই সংজ্ঞা অনুযায়ী, বিয়ের শর্ত হিসেবে বর বা বরপক্ষের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের দাবিকৃত অর্থ, সামগ্রী বা সম্পত্তি যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী আসামি তাঁর স্ত্রীর কাছে ব্যবসার প্রয়োজনে এক লাখ টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাসঙ্গিক ঘটনার ক্ষেত্রে তিনি যৌতুক দাবি করেছিলেন—রাষ্ট্রপক্ষ তা প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে ওই অর্থ দাবিকে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যৌতুক হিসেবে গণ্য করা যায় না বলে আদালত মত দেন।
আঘাতের স্থান নিয়ে সাক্ষ্য ও চিকিৎসা সনদে অসংগতি
মামলার সিদ্ধান্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অভিযোগকারীর আঘাতের স্থান নিয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের অসংগতি।
অভিযোগকারী তাঁর জবানবন্দিতে জানান, আসামি কাঠের লাঠি দিয়ে আঘাত করায় তাঁর ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাত লাগে। তাঁর বোন রমিজা বেগম কোমর ও পিঠে আঘাতের কথা বলেন। অন্যদিকে, চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান আদালতে জানান, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট অভিযোগকারীকে পরীক্ষা করে তাঁর বাঁ কাঁধে ফোলা আঘাত দেখতে পান। চিকিৎসা সনদেও বাঁ কাঁধে ফোলা আঘাতের উল্লেখ ছিল।
আদালত দেখতে পান, অভিযোগকারীর মৌখিক বক্তব্য, অন্য সাক্ষীদের বিবরণ এবং চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও চিকিৎসা সনদে আঘাতের স্থান নিয়ে অসংগতি রয়েছে। আদালতের মতে, এই পার্থক্য অভিযোগকারীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রমাণ নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মনে করেন, বিচারিক আদালত মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ না করেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
রায়ে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণে গুরুতর দুর্বলতা ছিল এবং সেগুলোর আইনগত বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অসংগতি বিবেচনায় না নিয়ে আসামির অপরাধ প্রথমে ধরে নিয়ে পরে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খোঁজার প্রবণতাকে আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুতর ত্রুটি হিসেবে দেখেছেন।
হাইকোর্টের মতে, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা ও বিচারিক আদালতের মূল্যায়নগত ভুলের কারণে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
আপিল মঞ্জুর, দণ্ডাদেশ বাতিল
সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট আসামির আপিল মঞ্জুর করেন। কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নং ১২/২০২০-এ ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর দেওয়া দোষী সাব্যস্তকরণ ও দণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়। মামলাটি ২০১৯ সালের সি.পি. মামলা নং ৩৮৬ থেকে উদ্ভূত।
একই সঙ্গে আসামিকে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয় এবং তাঁর জামিননামা অবমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়ের অনুলিপিসহ নিম্ন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশও দেন হাইকোর্ট।

