বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা ২০২১ সালের নতুন চাকরি প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগে ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন প্রবিধান পূর্বপ্রভাব দিয়ে প্রয়োগ করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে যোগ্যতাসম্পন্ন আবেদনকারীদের পুরোনো প্রবিধান অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শূন্য পদ থাকা এবং পদোন্নতির উপযুক্ততাসহ অন্যান্য আইনসম্মত শর্ত পূরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এক মাসের মধ্যে আবেদনকারীদের পদোন্নতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে।
২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম ও বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ এ রায় দেন। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০২১-এর পদোন্নতিসংক্রান্ত বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিট পিটিশন নং ৭০২২/২০২১-এর নিষ্পত্তি করে আদালত এ নির্দেশনা দেন।
২০১১ সালের প্রবিধানে পদোন্নতির সুযোগ
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, বারির ২০১১ সালের কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালায় উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদ থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির বিধান ছিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদে পাঁচ বছরের নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূরণ করতে হতো।
রিট আবেদনকারীরা ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে নিয়োগ পান। তাঁদের দাবি, ২০২১ সালের নতুন প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগেই তাঁরা ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় চাকরির মেয়াদ পূরণ করেছিলেন। ফলে পরবর্তী প্রবিধানের মাধ্যমে তাঁদের পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হওয়ার অর্জিত যোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা আইনসম্মত নয়।
আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ আদালতে যুক্তি দেন, নতুন প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগেই আবেদনকারীরা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে চাকরির শর্ত পরিবর্তন করে তাঁদের অসুবিধায় ফেলা যাবে না। একই বেতন স্কেল ও গ্রেডে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল) ও (মেকানিক্যাল) পদে পদোন্নতির বিধান অপরিবর্তিত রেখে সিভিল বিভাগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা করাও বৈষম্যমূলক বলে তিনি যুক্তি দেন।
২০২১ সালের প্রবিধানে পরিবর্তন
রায়ে বলা হয়, ২০১১ সালের প্রবিধান বাতিল করে ২০২১ সালে নতুন প্রবিধান প্রণয়ন করা হয়। নতুন প্রবিধানের ৩২ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদের ৩৩ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান করা হয়।
অন্যদিকে, আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, আগের প্রবিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদটি উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদ থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের বিধান ছিল। নতুন প্রবিধানের ফলে তাঁদের পদোন্নতির সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
বারির পক্ষে আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন আদালতে বলেন, চাকরির প্রবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। শুধু নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূরণ করলেই পদোন্নতির নিশ্চিত অধিকার সৃষ্টি হয় না; কর্মদক্ষতা ও কাজের সন্তুষ্টিও বিবেচ্য। এ ছাড়া সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল প্রকৌশলীর অনুমোদিত পদের সংখ্যা ভিন্ন হওয়ায় নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিও আলাদা হতে পারে। ২০২১ সালের প্রবিধান কার্যকর হওয়ার পর ২০১১ সালের প্রবিধান আর বলবৎ নেই বলেও তিনি যুক্তি দেন।
অর্জিত যোগ্যতা নতুন বিধানে বাতিল করা যাবে না
হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, কর্তৃপক্ষ সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী চাকরির বিধি সংশোধন বা প্রতিস্থাপন করতে পারে। তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে আগের বিধানের অধীনে ইতোমধ্যে অর্জিত অধিকার বা সুবিধা পূর্বপ্রভাব দিয়ে বাতিল করা যায় না।
এ বিষয়ে আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কয়েকটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করেন। এর মধ্যে রয়েছে Government of Bangladesh and another Vs. Md. Ruhul Amin Munshi and another, Giasuddin Bhuiyan (Md) and others Vs. Secretary, Security Services Division, Bakhrabad Gas System Limited Vs. Al Masud-ar-Noor and others, Bangladesh Bank Vs. Sukamal Sinha এবং Paschimanchol Gas Company Limited Vs. Md. Nuruzzaman and others মামলার সিদ্ধান্ত।
এসব সিদ্ধান্তের আলোকে আদালত বলেন, বিদ্যমান বিধানের অধীনে অর্জিত পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা পরবর্তী বিধি সংশোধন বা নতুন বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে পূর্বপ্রভাব দিয়ে কেড়ে নেওয়া যায় না।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, আবেদনকারীরা ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পূরণ করেছিলেন এবং ২০২১ সালের প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগেই পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। ফলে শুধু পুরোনো প্রবিধান বাতিল হওয়ার কারণে তাঁদের সেই অর্জিত যোগ্যতা বিলুপ্ত করা যাবে না।
রায়ে বলা হয়, নতুন প্রবিধানটি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পূর্বপ্রভাব দিয়ে প্রয়োগ করা যাবে না। যাঁরা ২০২১ সালের সংশোধিত প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় চাকরির মেয়াদ, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাঁদের ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করতে হবে। পরবর্তী সময়ে যুক্ত কোনো নতুন শর্ত তাঁদের আগে অর্জিত যোগ্যতার প্রতিকূলে প্রয়োগ করা যাবে না।
এক মাসের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ
আদালত রুল নিষ্পত্তি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, ২০২১ সালের প্রবিধান কার্যকর হওয়ার আগে যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিলেন, তাঁদের বারি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০১১-এর প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করতে হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে শূন্য পদ থাকা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপযুক্ততা এবং পদোন্নতির অন্যান্য আইনসম্মত শর্ত পূরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। আইন অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রায়ে আদালত কোনো খরচের আদেশ দেননি এবং অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার আদেশও রায় অনুযায়ী নিষ্পত্তি করেছেন।

