অ্যাডভোকেট শামস আর্ক
অ্যাডভোকেট শামস আর্ক

বিচারিক কর্মকর্তাদের নির্বাহী দায়িত্বে প্রেরণ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি শুধু একপাক্ষিক?

জুডিশিয়াল সার্ভিসের তিন সদস্যকে দুই মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়নের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। রিটে মূল প্রশ্ন তোলা হয়েছে—বিচারিক কর্মকর্তাদের এমন পদে নিয়োগ দেওয়া হলে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় কি না।

প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে ভাবনার খোরাক যোগায়। বিচার বিভাগের সদস্যদের নির্বাহী বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হলে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, চাকরির কাঠামো এবং বিচারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে মাসদার হোসেন মামলায় আপিল বিভাগ যে নীতিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন—জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রজাতন্ত্রের একটি সার্ভিস হলেও তা বেসামরিক নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে মৌলিক ও কাঠামোগতভাবে পৃথক—সেই নীতির আলোকে বিষয়টি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নীতিটি কি কেবল বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের বাইরে রাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নাকি নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য?

এই প্রশ্নটি আমাদের বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়।

নির্বাহী কর্মকর্তা যখন বিচার করেন, তখন কেন সবাই চুপ থাকে?

মাসদার হোসেন মামলার পর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেসিকে পৃথক করে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেসি কাঠামো তৈরি করা হয়। সেই বিচ্ছিন্নতার পেছনে মূল ধারণাই ছিল—যে ব্যক্তি প্রশাসনিক নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে বিচারিক ক্ষমতাও প্রয়োগ করবেন না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে এডিএম কোর্টগুলো এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এখনো বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি পরিচিত রূঢ় বাস্তবতা। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অপরাধের আমল নেওয়া, দোষ স্বীকারের ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া এবং শাস্তি আরোপের মতো ক্ষমতাও আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মোবাইল কোর্ট আইনকে হাইকোর্ট এক পর্যায়ে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল ঠিকই, কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাপে তৎকালীন আমলা নির্ভর ফ্যাসিস্ট সরকারের করা আপিলের পর আপিল বিভাগ সেই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেছিলেন। এখানে যেটা উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো, নির্বাহী আমলাগণ এখন শুধুমাত্র স্থগিতাদেশের মাধ্যমে এই প্রশ্নবিদ্ধ বিচারিক ক্ষমতা এখনো প্রয়োগ করছেন, হাইকোর্টের রায় কিন্তু এখনো বাতিল হয়নি। ফলে বিষয়টিকে সরলভাবে ‘বাতিল আইন’ হিসেবে উপস্থাপন করা আইনগতভাবে সঠিক নয়। সুপ্রিম কোর্টের নথিতেই এই অবস্থাটি উল্লেখ আছে।

কিন্তু বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি।

কারণ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে যখন একজন নাগরিককে তাৎক্ষণিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তখন আইনাঙ্গণে প্রশ্ন জাগে—এই ক্ষমতার প্রকৃতি কী—প্রশাসনিক, নাকি বিচারিক?

অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ, দায় নির্ধারণ এবং শাস্তি আরোপ নিঃসন্দেহে বিচারিক প্রকৃতির কাজ।

তাহলে প্রশ্ন হলো—একজন বিচারক যদি নির্বাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক পদে বসেন, সেটি যদি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সাংবিধানিক উদ্বেগের কারণ হয়, একজন নির্বাহী কর্মকর্তা যখন বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, সেটিও কি একই সাংবিধানিক পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়?

স্বাধীনতার মাপকাঠি কি দুই রকম হবে?

এখানে দ্বৈত মানদণ্ডের ঝুঁকি আছে।

একদিকে বলা হবে, জুডিশিয়াল সার্ভিসকে নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখতে হবে। অন্যদিকে সেই নির্বাহী ও প্রশাসনিক কাঠামোর কর্মকর্তারাই যদি নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার করে শাস্তি দেন, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধরে নেওয়ার যুক্তি কী?

প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা কোনো ক্যাডারের বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি ক্ষমতার প্রকৃতি এবং সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্ন।

একজন জেলা প্রশাসক বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যখন ভূমি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বা নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি নির্বাহী বিভাগের অংশ। কিন্তু একই ব্যক্তি যখন কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ নিয়ে বসেন, শুনানি করেন এবং দণ্ড দেন, তখন তিনি কার্যত বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।

এই দুই ভূমিকাকে একই ব্যক্তির হাতে দেওয়ার সাংবিধানিক যুক্তি তাই নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

মাসদার হোসেনের শিক্ষা কি কেবল বিচারকদের জন্য?

মাসদার হোসেন মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল ক্ষমতার পৃথকীকরণ। আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, জুডিশিয়াল সার্ভিস বেসামরিক নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে মৌলিক ও কাঠামোগতভাবে পৃথক। জুডিশিয়াল সার্ভিসকে সেই সার্ভিসগুলোর সঙ্গে একীভূত বা মিশিয়ে দেওয়া যাবে না।

পরবর্তী সাংবিধানিক আলোচনাতেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারিক কর্মকর্তাদের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলোতে বিচারিক কার্যক্রমের স্বাধীনতার সঙ্গে নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কিন্তু এই নীতিকে যদি আমরা সত্যিই গুরুত্ব দিই, তাহলে এর প্রয়োগ হতে হবে দুই দিকেই।

বিচারিক কর্মকর্তাকে এমন নির্বাহী পদে পাঠানো যাবে কি না—এ প্রশ্ন যেমন সাংবিধানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে, তেমনি নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হলে সেটিও একই সাংবিধানিক মানদণ্ডে পরীক্ষা করতে হবে।

প্রশাসনিক দক্ষতা বনাম বিচারিক স্বাধীনতা

মোবাইল কোর্ট বা অনুরূপ ব্যবস্থার পক্ষে একটি বাস্তব যুক্তি আছে। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেন, অপরাধ প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারেন।

কিন্তু দ্রুততা আর বিচার এক জিনিস নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের ফাস্টফুড স্টাইল বিচার জুডিশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধির সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে আরও আইনানুগভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব।

একজন নাগরিকের স্বাধীনতা, সম্পত্তি, সুনাম বা অন্যান্য অধিকার যখন কোনো আদেশের মাধ্যমে সীমিত হয়, তখন সেই আদেশ দেওয়ার ব্যক্তির প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, প্রশিক্ষণ, এখতিয়ার এবং জবাবদিহি—সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তাই অস্বীকার করার বিষয় নয়। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য বিচারিক ক্ষমতা নির্বাহী কাঠামোর হাতে কতদূর দেওয়া যায়—সেটি সাংবিধানিক সীমার মধ্যেই নির্ধারণ করতে হবে।

তাহলে তিন বিচারকের পদায়নের প্রশ্নটি কী হবে?

এই প্রশ্নের উত্তরও একপাক্ষিক হওয়া উচিত নয়।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন বৈধ কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে ২০২৫ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন, সংবিধানের প্রাসঙ্গিক বিধান এবং মাসদার হোসেন মামলার নীতির আলোকে। রিটে মূলত এই পদগুলো জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালার তফসিলে নেই—এই যুক্তিও তোলা হয়েছে।

কিন্তু আদালতের সামনে আরেকটি বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্নও আসতে পারে:

যদি নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচারিক সার্ভিসের প্রশাসনিক মিশ্রণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সমস্যা হয়, তাহলে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতার মিশ্রণ কতটা গ্রহণযোগ্য?

এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বিচারকদের নির্বাহী পদে যাওয়ার বিরোধিতা করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কারণ স্বাধীন বিচার বিভাগ মানে শুধু বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধীন না রাখা নয়। স্বাধীন বিচার বিভাগ মানে কে বিচার করবেন, কোন ক্ষমতাবলে বিচার করবেন এবং বিচার করার সময় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কতটা স্বাধীন থাকবে—সেই প্রশ্নগুলোরও সুস্পষ্ট সাংবিধানিক উত্তর থাকা।

আজ যে প্রশ্নটি তিনজন বিচারিক কর্মকর্তার পদায়নকে কেন্দ্র করে উঠেছে, সেটিকে তাই তিনজন কর্মকর্তার চাকরির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দরকার।

বিচারিক ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর যদি সংবিধান নির্ধারণ করে থাকে, তাহলে সেই উত্তর নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো এক পক্ষের জন্য সংরক্ষিত সুবিধা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার রক্ষার একটি সাংবিধানিক কাঠামো। সেই কাঠামোর মাপকাঠি তাই একই হতে হবে—বিচারিক কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও, নির্বাহী কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও।

লেখক: শামস আর্ক, আইনজীবী ও কলামিস্ট।