নিজস্ব প্রতিবেদক : লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সা আত্মসাতের অভিযোগে দণ্ডিত ডাক বিভাগের কর্মচারী মো. ওমর ফারুককে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। সরকারি অর্থের হিসাবে ঘাটতি পাওয়া গেলেও সেই অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় ছিল এবং তিনি তা অসৎ উদ্দেশ্যে আত্মসাৎ করেছেন—এমন বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। তাই শুধু অর্থের ঘাটতি, দায়িত্ব হস্তান্তর না করে কর্মস্থল ত্যাগ এবং অভিযুক্তের অনুপস্থিতিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট মনে করেননি আদালত।
একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, সরকারি অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলেই ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণিত হয় না। অভিযুক্তের কাছে অর্থ ন্যস্ত করা হয়েছিল অথবা তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল—এটি প্রমাণের পাশাপাশি অর্থটি অসৎভাবে আত্মসাৎ বা নিজের ব্যবহারে রূপান্তর করার বিষয়টিও প্রমাণ করতে হবে। সন্দেহ যত প্রবলই হোক, তা প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর লালমনিরহাটের বিশেষ জজ আদালতের দেওয়া দণ্ড ও সাজা বাতিল করে ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী। ফৌজদারি আপিল নম্বর ৭৭১২/২০১৪-তে আপিলকারী ছিলেন দণ্ডিত মো. ওমর ফারুক। রাষ্ট্র ও অন্যান্য পক্ষ মামলায় বিবাদী ছিলেন। সম্প্রতি এই রায়ের পুর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
কী অভিযোগ ছিল ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওমর ফারুক ডাক বিভাগের কর্মচারী হিসেবে আদিতমারী উপজেলা ডাকঘরের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা পোস্টমাস্টার ছিলেন। নিয়মিত উপজেলা পোস্টমাস্টার মো. ইকরামুল হক চিকিৎসার জন্য ছুটিতে থাকাকালে ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি ইকরামুল হক কর্মস্থলে ফিরে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বললে ওমর ফারুক পরে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা জানান। এরপর দুপুরে খাবারের কথা বলে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেননি।
পরবর্তী সময়ে ডাকঘরে নগদ অর্থ, ডাকটিকিট ও অন্যান্য সামগ্রীর হিসাব যাচাই করে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করা হয়। এ অর্থ সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় অসৎভাবে আত্মসাৎ করে ওমর ফারুক পালিয়ে গেছেন বলে দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ।
এ ঘটনায় ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারি আদিতমারী থানায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
বিশেষ জজ আদালতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড
মামলাটি লালমনিরহাটের বিশেষ জজ আদালতে বিশেষ মামলা নম্বর ২/২০১২ হিসেবে বিচার হয়। বিচারিক আদালত ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর ওমর ফারুককে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫ ধারায় তাঁকে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। উভয় সাজা একসঙ্গে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৪ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এই দণ্ড ও সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন ওমর ফারুক।
আপিলকারীর বক্তব্য: অর্থ আত্মসাতের প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই
আপিলকারীর পক্ষে আইনজীবীরা যুক্তি দেন, ফৌজদারি বিশ্বাসভঙ্গের অপরাধ প্রমাণ করতে অসৎ উদ্দেশ্য বা অর্থ আত্মসাতের অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু ওমর ফারুক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন কিংবা নিজের ব্যবহারে নিয়েছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।
তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিচারিক আদালতের দণ্ড মূলত নগদ হিসাবের খাতায় স্বাক্ষর, কর্মস্থল ত্যাগ এবং পরে হিসাব যাচাইয়ে অর্থের ঘাটতি পাওয়ার ওপর নির্ভর করেছে। এসব পরিস্থিতি একা অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।
আপিলকারীর পক্ষ আরও যুক্তি দেয়, লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা ডাকঘরের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ লিখিত অনুমোদনের মাধ্যমে হয়নি। ওই অর্থ আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল—এমন প্রমাণও নেই। ফলে অর্থটি তাঁর জিম্মায় ন্যস্ত হয়েছিল বলে ধরে নিয়ে তাঁকে দায়ী করা যায় না।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে আইনজীবী যুক্তি দেন, ঘটনার সময় ওমর ফারুক ওই ডাকঘরের দায়িত্বে ছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও নথিপত্রের ভিত্তিতে দণ্ড বহাল রাখার পক্ষে বক্তব্য দেওয়া হয়।
৯ লাখ টাকা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই
হাইকোর্ট মামলার ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। আদালত দেখতে পান, ডাকঘরে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা ৯৪ পয়সার ঘাটতি পাওয়ার বিষয়টি কয়েকজন সাক্ষীর বক্তব্য ও হিসাব যাচাইয়ের নথিতে সমর্থিত হয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন ছিল, ওই অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তের জিম্মা ও অসৎ আত্মসাতের সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণিত হয়েছে কি না।
রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি ওমর ফারুক লালমনিরহাট প্রধান ডাকঘর থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে স্বীকার করেন, ওই টাকা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছানোর কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব এন্ট্রি নেই। অর্থটি পাঠানোর দলিলও পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এমনকি ওই টাকা প্রকৃতপক্ষে পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, প্রধান ডাকঘর থেকে অর্থ গ্রহণের বক্তব্য থাকলেও তা আদিতমারী ডাকঘরে পৌঁছেছিল এবং পরে অভিযুক্তের নিয়ন্ত্রণে থেকে আত্মসাৎ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তা একা যথেষ্ট নয়।
তিন লাখ টাকার লেনদেনও আত্মসাৎ প্রমাণ করে না
মামলায় কামিনী কান্ত রায় নামের এক গ্রাহকের তিন লাখ টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট গ্রাহক জমার বইয়ে অর্থ জমার তথ্য থাকার কথা বলেন। তবে তাঁর সাক্ষ্য থেকে ওমর ফারুক ব্যক্তিগতভাবে ওই টাকা গ্রহণ করেছেন বা আত্মসাৎ করেছেন—এটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেন, কোনো আর্থিক লেনদেনের অস্তিত্ব এবং পরবর্তী সময়ে হিসাবের ঘাটতি পাওয়া—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে যোগসূত্র থাকলেও নির্দিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের জিম্মায় ছিল এবং তিনি তা অসৎভাবে আত্মসাৎ করেছেন, সেটি আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে।
হিসাব ও অর্থ স্থানান্তরে একাধিক ঘাটতি
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে, ডাকঘরের অনুমোদিত নগদ স্থিতি, অর্থ পাঠানোর পদ্ধতি, অর্থের চাহিদাপত্র, অনুমোদন এবং নগদ অর্থের হেফাজত ও স্থানান্তরসংক্রান্ত প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি ছিল।
সাক্ষ্য থেকে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলেছেন। কিন্তু মামলায় ৯ লাখ টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে লিখিত অনুমোদন ছিল না বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বীকার করেন। অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের প্রয়োজনীয় নথিও উপস্থাপিত হয়নি।
এ ছাড়া জব্দতালিকা ও জব্দ করা সামগ্রীসংক্রান্ত সাক্ষ্যেও অসংগতি ছিল। একজন সাক্ষী জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করলেও জব্দের ঘটনা নিজের সামনে ঘটেছে—এমন প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাঁর ছিল না বলে সাক্ষ্যে উঠে আসে। হাইকোর্টের মতে, তদন্ত ও প্রক্রিয়াগত নথি থাকলেও সেগুলো প্রকৃত আত্মসাতের প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।
শুধু অর্থের ঘাটতি দিয়ে ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ হয় না
রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেন, দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় অপরাধ প্রমাণের জন্য শুধু সরকারি অর্থের ঘাটতি দেখানো যথেষ্ট নয়। প্রথমে প্রমাণ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট অর্থ অভিযুক্তের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছিল অথবা তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর প্রমাণ করতে হবে, তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বা নিজের ব্যবহারে রূপান্তর করেছেন।
আদালতের মতে, ওমর ফারুক দায়িত্ব হস্তান্তর না করে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন এবং পরে অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেছে—এগুলো সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট অর্থের সঙ্গে তাঁর অসৎ আত্মসাতের নির্ভরযোগ্য যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা না হলে এসব পরিস্থিতি দিয়ে অপরাধের অপরিহার্য উপাদান প্রমাণিত হয় না।
রাষ্ট্রপক্ষ অভিযুক্তের জিম্মা বা নিয়ন্ত্রণে অর্থ থাকার বিষয়টি এবং তাঁর অসৎ আত্মসাতের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দেন আদালত।
দণ্ড ও সাজা বাতিল, আপিলকারী খালাস
সবশেষে হাইকোর্ট ফৌজদারি আপিলটি মঞ্জুর করেন। লালমনিরহাটের বিশেষ জজ আদালতের ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর দেওয়া দণ্ড ও সাজা বাতিল করে মো. ওমর ফারুককে অভিযোগ থেকে খালাস দেন। তাঁর জামিননামাও অবমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত নিম্ন আদালতের নথি দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আদালতে অবিলম্বে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

